৩ শতাধিক কলেজে শিক্ষক সংকট, কমছে শিক্ষার মান

82


তুহিন সাইফুল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সারাদেশে সরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা ৩০৩টি কলেজে দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষক-কর্মকর্তার পদ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। নিয়োগ বন্ধ থাকায় এইসব পদে নেওয়া যাচ্ছে না নতুন শিক্ষকও। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কমছে শিক্ষার মান ও ফলাফল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২০১৬ সাল থেকে সরকারিকরণের কাজ শুরু হয়েছে এমন অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে- এসব কলেজে শিক্ষক অনুপাতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিটি বিষয়ে দুজন করে শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও অনেক কলেজে কয়েকটি বিষয়ে দুজন শিক্ষকই নেই। এসব শিক্ষকরা চাকরিজীবন শেষ করে অবসরে চলে গেছেন, নিয়োগ বন্ধ থাকায় তাদের জায়গায় নতুন শিক্ষক নেওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে ধার করা শিক্ষকে, কোথাও আবার এক বিষয়ের শিক্ষককে পড়াতে হচ্ছে অন্য বিষয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর সরকারি কলেজে আগে থেকেই শিক্ষক সংকট ছিল। বেসরকারি থাকার সময় অর্থ সংকটের কারণে শিক্ষকের ঘাটতি থাকলেও শিক্ষার মান ছিল বেশ ভালো। উপজেলার প্রথম এই কলেজটি সরকারি হওয়ার পর থেকে কমপক্ষে ৭ জন শিক্ষককে হারিয়েছে। অবসরে গেছেন কয়েকজন কর্মকর্তাও। যাদের জায়গায় এখনও পূরণ হয়নি।

আরও পড়ুন: ৩০৩ কলেজ সরকারি হওয়ার অপেক্ষার শেষ কবে?

কলেজের শিক্ষক জামিল ফোরকানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষক ঘাটতি থাকায় তাদের প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমের ছন্দপতন হয়েছে। তবে করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষারপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই ছন্দপতনটি কারো চোখে পড়েনি। এখন নতুন করে ক্লাস শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম শেষ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে তাদের।

একই জেলায় আরেক স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফিরোজ মিয়া ডিগ্রি কলেজও এসেছে সরকারি করণের আওতায়। এই কলেজ থেকে গেল কয়বছরে চারজন শিক্ষক মারা গেছেন। মারা গেছেন কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ফিরোজ মিয়ার সন্তান কামাল হোসেনও। তিনি এই কলেজের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। এই সময়ে একজন শিক্ষক অবসরে গেছেন। কর্মকর্তাদের মধ্যে মারা গেছেন আরও ২ জন। যাদের শূন্যপদ এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে।

কলেজটির দর্শনের প্রভাষক এবং ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় সংবাদ প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন বলেছেন, বাণিজ্যনগরী আশুগঞ্জে এই কলেজটি শিক্ষার অগ্রদূত। কিন্তু শিক্ষক কমে যাওয়ায় তারা এখন স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমই চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষক যে কম সেটি করোনার কারণে এতদিন বোঝা যায়নি। এখন ক্লাস শুরু হয়েছে কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে ক্লাসে দেওয়ার মতো শিক্ষকের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে ঠিকই, তবে ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

এই দুইজন ছাড়াও যে কয়জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা সবাই বলেছেন, সরকারিকরণের কাজটি দ্রুত শেষ না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: ৩০৩ কলেজের সরকারিকরণ আটকে আছে নথি যাচাইয়ে

ক্লাসে ভালো শিক্ষক না পাওয়ায় পড়াশোনায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন, এ সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও। ফায়জুল চৌধুরী নামে দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী বলেছেন, তার প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানের ভালো শিক্ষক ছিল জেনে ভর্তি হয়েছিলেন। এখন তাদের অনেকেই নেই। সেখানে টিচারই পাওয়া যাচ্ছে না বলে অন্য কলেজের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে তাকে।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, ক্লাসে পড়ানো হলে আলাদা করে প্রাইভেট পড়তে হয় না। যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল নয় তাদেরকে ক্লাসের পড়েই পরীক্ষায় বসতে হতো। কিন্তু শিক্ষক না থাকায় এখন বাধ্যতামূলত ভাবে প্রাইভেট টিউটর খুঁজতে হচ্ছে তাদের।

কেবল এটিই নয়, সরকারি কলেজের সব সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীদের পড়তে হচ্ছে বেসরকারি কলেজ যুগের বেতন দিয়ে। এমনকি কলেজগুলোর অন্তর্বর্তী বিভিন্ন সুবিধাদির ফি-ও দিতে আগের নিয়মে। ফলে এখানেও শিক্ষার্থীরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি জহুরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেছেন, শিক্ষকদের ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে সবাই কথা বলছেন, শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সে বিষয়েও কথা বলতে হবে। সরকারি কলেজের আশ্বাস পেয়ে ভর্তি হয়ে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন বেসরকারি সুযোগ! এটা তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। দায়িত্বশীল যারা আছে, যারা একবছরের কাজকে পা বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখছেন আশা করি তারা বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

আরও পড়ুন: সরকারি হচ্ছে ১০ হাজার কলেজ শিক্ষকের চাকরি

উল্লেখ্য, দেশের যেসব উপজেলায় কোনো সরকারি কলেজ ছিল না, সেগুলোতে একটি করে বেসরকারি কলেজকে সরকারি করা হয়েছে। এই কলেজগুলো সরকারিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। এ জন্য ওই বছরের ৩০ জুন কলেজগুলোতে নতুন করে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট দেশের ২৭১টি বেসরকারি কলেজকে সরকারি করে আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে-পরে আরও ৩২টি কলেজ জাতীয়করণ হয়। সব মিলিয়ে সরকারি হওয়া কলেজের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৩টি।

এই সময়ে এই সব কলেজে অবসর মৃত্যুসহ বিভিন্ন কারণে ২ হাজার ১৫৬ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার পদ ফাঁকা হয়েছে। যার মধ্যে ১ হাজার ৩৬৮ শিক্ষক এবং বাকিরা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। এ সব প্রতিষ্ঠানে ২০১৬ সাল থেকে পদোন্নতিও বন্ধ রয়েছে।

সারাবাংলা/টিএস/একে





Source link