৩০৩ কলেজ সরকারি হওয়ার অপেক্ষার শেষ কবে?

86


তুহিন সাইফুল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ৩০৩টি বেসরকারি কলেজকে সরকারি করতে ২০১৮ সালে জিও বা সরকারি আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এসব কলেজ সরকারি হওয়ার কোন খোঁজ নেই। ফাইল আটকে আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। ফলে সরকারি-বেসরকারির আধাআধি জীবন নিয়ে এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা রয়েছেন হতাশায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলেজ সরকারিকরণের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে আগেই। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফরের (মাউশি) গণ্ডি পেরিয়ে সেই ফাইল এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের টেবিলে। এখানে কাজ শেষ হলে ফাইল যাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সেখানেও কাজ শেষ হতে লাগবে অনেক দিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কলেজ সরকারিকরণের কাজ আগামী বছরেও শেষ হবে না।

মাউশির কলেজ ও প্রশাসন বিভাগের পরিচালক শাহেদুল খবীরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল এই কাজের অগ্রগতি প্রসঙ্গে। তাদের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে বলে সারাবাংলাকে জানিয়েছেন তিনি। এরপর সারাবাংলার এই প্রতিবেদক কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রণালয়ের যুগ্ন সচিব মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস (কলেজ ১), উপসচিব ড. শ্রীকান্ত কুমার চন্দ্র (সরকারি কলেজ ২) এবং এবং একই মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ন সচিব জাকিয়া খানমের (কলেজ ৩) সঙ্গে। কিন্তু তাদের কেউই জানাতে পারেননি, ঠিক কবে নাগাদ সরকারিকরণের ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যাবে।

জাকিয়া খানম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এখন আর নেই বলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকারিকরণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।’ ড. শ্রীকান্ত কুমার চন্দ্র বলেন, ‘এই মাসের মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে সরকারিকরণের ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যাবে। এজন্য মন্ত্রণালয়ের অনেকগুলো কমিটি একযোগে কাজ করছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কাজটি করছি। কাজটি দীর্ঘসময় নিয়ে না করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে কাজ এখন শেষের দিকে প্রায়। আশা করা যায়, এই অক্টোবরের মধ্যেই জনপ্রশাসনকে ফাইল পাঠিয়ে দিতে পারব। আর না হলে হয়তো নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ লাগতে পারে। এরপর ওই মন্ত্রণালয় সরকারিকরণ চূড়ান্ত করবে।’

এদিকে সরকারিকরণের অফিস আদেশ হওয়ার পর অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যেই অবসরে চলে গেছেন। আইন অনুযায়ী তারা সরকারি কলেজের সকল সুবিধাদি পাবেন। কিন্তু কাজ আটকে থাকায় তারা হতাশায় ভুগছেন। অবসরে যাওয়া এমন কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন সারাবাংলার এই প্রতিবেদক। তারা তাদের পেনশন ও অন্যান্য সুবিধাপ্রাপ্তি নিয়ে বেশ শঙ্কার ভেতরে রয়েছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবহেলার কারণেই সরকারিকরণ দেরি হচ্ছে। মাউশি দীর্ঘ সময় নিয়ে যাচাই-যাচাই করার পরও এখন মন্ত্রণালয়কে ফের কেন যাচাই-বাছাই করতে হবে? এটি সময়ক্ষেপণ মাত্র। আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। কেবল আমরাই নই, এই দেরির কারণে শিক্ষার্থীরাও কোনো উপকার পাচ্ছে না। তাদেরকেও আগের মতোই টিউশন ফি দিয়ে পড়তে হচ্ছে। নিয়োগ বন্ধ থাকায় নতুন শিক্ষক পাচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব শিক্ষক বলছেন, সরকারিকরণের জন্য দীর্ঘ সময় চলে গেছে। এরপর দেখা যাবে আমাদের আত্তীকরণের কাগজপত্রে ভুল রয়েছে। তখন কি হবে? আরও কত বছর ঘুরতে হবে। এই বয়সে এসে আমাদের পক্ষে ঘোরাঘুরি করা কি সম্ভব?

শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য এমনটা হবে না বলে আশ্বস্ত করতে চাইছে শিক্ষকদের। ড. শ্রীকান্ত কুমার চন্দ্র বলেন, ‘তেমনটা যেন না হয়, সেজন্যই সময় নিয়ে ভালোভাবে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সরকারিকরণের কাজ করা হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, সরকারি কলেজশিক্ষক সমিতির তথ্যনুযায়ী, এই কলেজগুলো সরকারিকরণ ঘোষণার পর এই কয় বছরে বছরে প্রায় দুই হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে গেছেন।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এটি নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। একসঙ্গে এতগুলো কলেজ সরকারিকরণ করতে সময় লাগছে। কাজের চাপ বাড়ায় কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে কাজ দ্রুত শেষের পথে।’

এ বিষয়ে গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল। অনেক আগে শিক্ষকরা নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের নিয়োগের সঠিক কাগজপত্র অনেক জায়গায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারিকরণ ঘোষণার পর অনেক জায়গায় অনিয়ময়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এটি সঠিকভাবে করার জন্য আমরা জনবল নিয়োগ করে তা দ্রুততার সঙ্গে শেষ করতে চাচ্ছি।’ তবে এ বিষয়ে নতুন করে আর কোনো মন্ত্যব্য করেননি শিক্ষামন্ত্রী।

উল্লেখ্য, দেশের যেসব উপজেলায় কোনো সরকারি কলেজ ছিল না, সেইসব উপজেলায় একটি করে বেসরকারি কলেজ সরকারিকরণ করা হয়েছে। এই কলেজগুলো সরকারিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। এ জন্য ওই বছরের ৩০ জুন কলেজগুলোতে নতুন করে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট দেশের ২৭১টি বেসরকারি কলেজকে সরকারি করে আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে-পরে আরও ৩২টি কলেজ জাতীয়করণ হয়। সব মিলিয়ে সরকারি হওয়া কলেজের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৩টি।

সারাবাংলা/টিএস/পিটিএম





Source link