২৩ নভেম্বর ১৯২২ রাজদ্রোহের অভিযোগে কবি নজরুল গ্রেফতার হন

0
85

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া ।।
“বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত”। না কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোনও দিন শান্ত হননি। তাঁর বিপ্লব চলেছে সারা জীবন। শেষ জীবনে হয়তো অনেক কিছুই বুঝতেন না, কিন্তু তাঁর জীবন সংগ্রামের জীবন শক্তি তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই বিপ্লবের জেরেই তাঁকে গ্রেফতার হতে হয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশের নিকট। ১৯২২ সালের ১২ই আগস্ট কবি কাজী নজরুল ইসলাম ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করে। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সশস্ত্র বিপ্লববাদের ক্ষেত্রেও ধূমকেতুর বিশেষ প্রভাব ছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে প্রকাশিত হয়। এই রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ৮ নভেম্বর পত্রিকার উক্ত সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর তাকে কুমিল্লা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি নজরুল বিচারাধীন বন্দী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এক জবানবন্দী প্রদান করেন। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে এই জবানবন্দী দিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এরপর ১৬ জানুয়ারি বিচারের পর কাজী নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কাজী নজরুলকে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে যখন বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন তখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। এতে নজরুল বিশেষ উল্লসিত হন। এই আনন্দে জেলে বসে আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কবিতাটি রচনা করেন ।

৭ জানুয়ারিতে কবির এই জবানবন্দী বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে বিখ্যাত। এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন: “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। … আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে।”

কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যজীবনের অধিকাংশ সময়ে ব্রিটিশ রাজরোষের শিকার হন। নয় বছরে (১৯২২-১৯৩১) তাঁর পাঁচটি বই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে তিনি দুবার কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। প্রথমবার এক বছরের জন্য জেল খাটেন ১৯২৩ সালে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লেখার জন্য। অন্যটি ১৯৩০ সালে প্রকাশিত ‘প্রলয় শিখা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য। শেষের বারে ছয় মাসের জন্য কারাদণ্ডের আদেশ হলেও তাঁকে জেল খাটতে হয়নি। হাইকোর্টে আপিল করলে তাঁর কারাদণ্ডের আদেশটি রহিত হয়ে যায়। একের পর এক বাজেয়াপ্ত ও কারাদণ্ডের আদেশে নজরুল ব্রিটিশ ভারতে পরিচিত হয়ে ওঠেন আপসহীন ও প্রতিবাদী কবিরূপে। স্বাধীনতাকামীদের কাছে তিনি পরিণত হন মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে।

পত্রিকার সম্পাদকীয় কলামে প্রকাশিত লেখা নিয়ে কাজী নজরুল বলেন, ‘স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথার মানে এক এক মহারথী এক এক করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশীর মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।…’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক প্রথম নজরুলের কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছিল। এমন জোরালো আহ্বান অন্য কোনো সাহিত্যিক বা নেতার মুখে শোনা যায়নি, যা ব্রিটিশ শাসকদের বিচলিত করে তোলে। কাজী নজরুল ইসলাম শিকার হন রাজরোষের।

বিশ্বের বহু সুপরিচিত কবির অনেক মহান সৃষ্টি সংশ্লিষ্ট দেশের শাসক কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছে। হোমারের কালজয়ী সৃষ্টি ওডিসীর পঠন নিষিদ্ধ ছিল। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের মতামত, তাঁর সময়ের তাঁর দেশের শাসকগোষ্ঠী আক্রমণ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে আমরা যদি আরেকজনের নাম এই তালিকায় যোগ না করি তা অসম্পূর্ণ থাকবে। তিনি আর কেউ নন, সকল রকম শোষণের বিরুদ্ধে অশেষ নির্ভীক কণ্ঠস্বর আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

ভারতীয় উপমহাদেশে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি লিখিত দলিলের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। নজরুল তাঁর ‘রুদ্রমঙ্গল’ (১৯২৬)-এ প্রকাশিত ধূমকেতুর পথ রচনায় লিখেছেন, “একটিমাত্র টুকরো ভারতীয় ভূমিও বিদেশীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। ভারতীয়দের পরিচালনার দায়িত্ব ভারতীয়দের হাতে থাকবে। এ বিষয়ে কোনও বিদেশির অধিকার নেই আমাদের নির্দেশ করার। যারা ভারতের রাজা বা স্বৈরশাসক হয়েছে এবং এই ভূমিকে শ্মশানে পরিণত করেছে, তাদের তল্পি-তল্পাসহ সাগর পাড়ি দেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। ”

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার নজরুলের স্বাধীন কণ্ঠস্বর, নির্ভীক মনোভাব এবং কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি চরমপন্থী তৎপরতা আখ্যা দেয়। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গণজাগরণের জন্য এত তীব্র ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আঘাত করার মতো কেউ ছিল না। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে নজরুলের মতো এমন বিদ্রোহীর আর কোনও দৃষ্টান্ত ছিল না। ফলে, তৎকালীন সরকার তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। অত্যাচার ও নির্যাতনের যে অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল, তাঁকে সহজেই বিশ্ব সাহিত্যে সবচেয়ে বিদ্রোহী কবি বলে আখ্যা দেয়া যায়।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং নাটকে নির্যাতন, দাসত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, সামন্তবাদ এবং ঔপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ছিল। যতক্ষণ না কবি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, কোনও অন্যায় নির্যাতন তাঁর বিদ্রোহী কণ্ঠরোধ করতে পারে নি। তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন।

আমাদের জাতীয় অহঙ্কার, জাতীয় অস্তিত্ব কাজী নজরুল ইসলামের অমর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

[মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় কৃষক-শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন]