২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা রয়েছে শুনানির চূড়ান্ত পর্যায়ে

34


ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডেস্ক :: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো হয় নারকীয় বোমা হামলা। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার করা ছিল ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য। ওই ঘটনায় আলাদা দুই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারিক (নিম্ন) আদালতে অভিন্ন রায় ঘোষণা করা হয়। এখন হাইকোর্টে রয়েছে চূড়ান্ত শুনানির পর্যায়ে।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেওয়ার পর এ মামলার ওপর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন। শুনানির জন্য হাইকোর্ট প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আসামিদের করা আপিল আবেদন গ্রহণ করা হয়। এখন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সংক্রান্ত মামলা দুটি দ্বিতীয় ধাপে হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায়। সরকারের বিজি প্রেস থেকে মামলার পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে হাইকোর্টে এসেছে। এখন নিয়ম অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন নির্ধারিত হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হবে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশ চলছিল। প্রধানমন্ত্রীসহ প্রথম সারির নেতারা ছিলেন ট্রাকের মঞ্চে। সেই সমাবেশে চালানো হয় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তবে হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি (প্রয়াত) জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন দলের তিন শতাধিক নেতাকর্মী। এই ঘটনায় আলাদা তিনটি মামলা হয়। যদিও পরে বিচার হয় দুটি মামলার।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই গ্রেনেড হামলা হয় বলে ধারণা করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইন্ধনে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশসহ (হুজি) তিনটি জঙ্গি সংগঠন ওই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঘটনার পর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল একটি মামলা করেন। সাবের হোসেন চৌধুরী করেন আরেকটি মামলা। অপর মামলাটি করে পুলিশ। ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার।

শুরু থেকেই নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্নখাতে নিতে নানা চেষ্টা করা হয়। জজ মিয়া নামে এক নিরপরাধ যুবককে দিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করানো হয়। এ মামলার তদন্তে নিয়োজিত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তিন পুলিশ কর্মকর্তা জজ মিয়ার নামে ‘আষাঢ়ে গল্প’ তৈরি করেন।

ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনার ১৪ বছর ১ মাস ২০ দিন পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর মামলা দু’টির রায় ঘোষণা হয়। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে স্থাপিত আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে ৪৯ আসামির সবারই সাজা হয়। যদিও মামলার আসামি ছিল ৫২ জন। এর মধ্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ৪৯ জন।

 

বিচারিক আদালতের রায়ে ১৯ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ, জঙ্গিনেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবু সাইদ, মুফতি মঈনউদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, হাফেজ আবু তাহের, মো. ইউসুফ ভাট ওরফে মাজেদ বাট, আবদুল মালেক, মফিজুর রহমান ওরফে মহিবুল্লাহ, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হোসাইন আহমেদ তামিম, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ও মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন।

বিচারিক আদালতের রায়ে ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, আরিফুল ইসলাম আরিফ, জঙ্গিনেতা মুফতি আবদুর রউফ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মুরসালিন, মুত্তাকিন, জাহাঙ্গীর বদর, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, আবু বকর সিদ্দিক ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মো. ইকবাল, রাতুল আহমেদ, মাওলানা লিটন, মো. খলিল ও শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল। যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া ১৯ আসামির মধ্যে ১৩ জনই পলাতক।

বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত ১১ জন হলেন- মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমীন, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ওরফে ডিউক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান, ডিএমপির সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, জোট সরকারের সময়ের তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ, সাবেক এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও সাবেক পুলিশ সুপার রুহুল আমীন।

ভয়াবহ এই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য পেপার বুক তৈরির কাজ শেষে তা ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসে পৌঁছায়। ওই দিন সকালে বিজি প্রেস থেকে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পেপারবুক আসে। বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও স্পেশাল অফিসার মুহাম্মদ সাইফুর রহমান। এর আগে বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুই মামলার রায়ের প্রায় ৩৭ হাজার ৩৮৫ পৃষ্ঠার নথি ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

চলতি বছরের (২০২১ সালের) ২৩ ফেব্রুয়ারি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। গ্রেফতার হওয়া আসামির নাম মো. ইকবাল।

 

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি আসামিদের ৪৪টি জেল আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য গৃহীত হয়। ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আবেদনগুলো গ্রহণ করেন।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আসামিদের আপিল আবেদনের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেওয়ার পরে এই মামলার ওপর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন। এদিকে রায়ে দণ্ড পাওয়া আসামিদের মধ্যে যারা দেশ-বিদেশে পালিয়ে আছেন তাদের গ্রেফতার ও বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান বিচারিক আদালতের রায়ের পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সংক্রান্ত মামলা দুটি এখন দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে। সেটা উচ্চ আদালত শুনানির উদ্যোগ নেবে বলে আশা করছি। আর ভয়াবহ ২১ আগস্ট হামলার ঘটনায় দণ্ড নিয়ে যেসব আসামি দেশে পালিয়ে আছেন তাদের গ্রেফতার ও যারা বিদেশে পালিয়ে আছেন তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

হাইকোর্টে পেন্ডিং থাকা ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন  জানান বিজি প্রেস থেকে পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে হাইকোর্টে এসেছে। এখন আমরা মামলার শুনানির জন্য প্রস্তুত। প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেওয়ার পরে আপিলের বিষয়ে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা চেষ্টা করবো দ্রুত শুনানি হোক।

এবছরই আপিলের শুনানি শেষ করা যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ২১ আগস্ট তো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। ঘাতকরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। একইভাবে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওরা তো দেশের বিরুদ্ধে, পাকিস্তান বানাতে চায়। তারই ধারাবাহিকতায় এই হত্যাচেষ্টা। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারে তাকে শেষ করতেই জঙ্গিরা এ হামলা চালায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রধানমন্ত্রী এ হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছেন। আজ তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা মামলায় কারাগারে কতজন আসামি আছেন জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে কে কে কারাগারে আছেন সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে পুলিশের কাছে তার হিসাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে মাত্র একজন আসামি রয়েছেন। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান বাবর। আর বাকি আসামিরা গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।

Print Friendly, PDF & Email



Source link