হেফাজতে জুনায়েদ বাবুনগরীর পদে মামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী

90


স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো : জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুতে হেফাজতে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কমিটি ও শূরা কমিটির এক নম্বর সদস্য। সম্পর্কে তিনি জুনায়েদ বাবুনগরীর মামা।

৬৮ বছর বয়সী জুনায়েদ বাবুনগরী বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসায় নিজ কক্ষে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। হাটহাজারী মাদরাসা হিসেবে পরিচিত ওই প্রতিষ্ঠানের তিনি শিক্ষা পরিচালক ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় বেলা সোয়া ১২টার দিকে তাকে নগরীর প্রবর্তক মোড়ে সিএসসিআর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সাড়ে ১২টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।

বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টায় হাটহাজারী মাদরাসা প্রাঙ্গণে জুনায়েদ বাবুনগরীর নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। সেখানে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, হেফাজতের নেতাকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক লোক অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী। এরপর তার লাশ ফটিকছড়ির বাবুনগর গ্রামে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্রদের বাধায় সেখানে নেওয়া যায়নি। রাতে হাটহাজারী মাদরাসা অভ্যন্তরে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আহমদ শফীর কবরের পাশে বাবুনগরীর দাফন সম্পন্ন হয়।

হেফাজতে জুনায়েদ বাবুনগরীর পদে মামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির শেখ সালাহউদ্দিন নানুপুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদি সাহেব টেলিফোনে কমিটির প্রায় সব নেতার সঙ্গে কথা বলেন। প্রায় সবাই একমত হন যে, উপদেষ্টা কমিটি ও শূরা কমিটির এক নম্বর সদস্য মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সাহেবকে হেফাজতের ভারপ্রাপ্ত আমির করা হোক। এরপর জিহাদি সাহেব সেটা জানাজার আগে মাইকে ঘোষণা দেন।’

প্রবীণ ধর্মীয় নেতা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসার পরিচালক পদে আছেন বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন নানুপুরী।

আরও পড়ুন: হেফাজতের উত্থান ও পতনে বিতর্কের মূলে ছিলেন বাবুনগরী

২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা আমীর ছিলেন প্রবীণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শাহ আহমদ শফী এবং মহাসচিব ছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী। ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ বন্ধের দাবি তুলে ২০১৩ সালের ৫ মে সারাদেশ থেকে লংমার্চ নিয়ে ঢাকার শাপলা চত্বরে গিয়ে অবস্থান নেওয়া এবং ব্যাপক সহিংতার পর সংগঠনটির ব্যাপক পরিচিতি মেলে।

তবে পরবর্তীতে দুই শীর্ষ নেতার অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। কওমি মাদরাসার ডিগ্রির সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে শফীপন্থীরা সরকারের প্রতি নমনীয় হন। আর বাবুনগরী ও তার অনুসারীরা তীব্রভাবে সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিতি পান। বক্তব্য-বিবৃতিতেও তারা সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন।

বিরোধের জেরে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তিনদিন আহমদ শফীর বিরুদ্ধে হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্র বিক্ষোভ হয়। মাদরাসার অভ্যন্তরে ভাঙচুর হয়। বেশ কয়েকজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা হয়, যারা ছিলেন শফীর অনুসারী। এমনকি শফীর কক্ষও ভাঙচুর করা হয়। বিক্ষোভের মধ্যে একপর্যায়ে ১৭ সেপ্টেম্বর মাদরাসার পরিচালক শাহ আহমদ শফী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। বিক্ষোভের মধ্যেই ১৮ সেপ্টেম্বর প্রায় শতবর্ষী শাহ আহমদ শফী মারা যান।

বিক্ষোভ এবং শফীর মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের হটিয়ে পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে হেফাজতের দৃশ্যপটে হাজির হন বাবুনগরী। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর হাটহাজারী মাদরাসায় প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে বাবুনগরী আমীর নির্বাচিত হন। গঠন করা হয় ১৫১ সদস্যের কমিটি। তবে শফীপন্থীরা এই সম্মেলন প্রত্যাখান করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পাল্টা কাউন্সিল করার ঘোষণা দেন। তাদের অভিযোগ, হেফাজতে ইসলামকে বিএনপি-জামায়াতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর শাহ আহমদ শফীর শ্যালক মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন বাদী হয়ে চট্টগ্রামের তৃতীয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শিপলু কুমার দে’র আদালতে ‘মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে শফীর মৃত্যু ঘটানোর’ অভিযোগে একটি মামলা করেন। মামলায় মামুনুল হকসহ ৩৬ জনকে আসামি করা হয়। আদালত পিবিআইকে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেন।

চলতি বছরের (২০২১) ১২ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের আমীর জুনায়েদ বাবুনগরীসহ ৪৩ জনকে আসামি করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। এতে আসামি হিসেবে ছিলেন ‍জুনায়েদ বাবুনগরীও। এরপর ভাস্কর্য ইস্যু, ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে গ্রেফতার হন মামুনুল হক, আজিজুল হক ইসলামাবাদীসহ হেফাজতে ইসলামের অর্ধশতাধিক নেতা, যাদের সবাই বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এ প্রেক্ষিতে বাবুনগরী বারবার গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে ‘হেফাজতে ইসলাম সরকারবিরোধী নয়’ বলে প্রচার করতে থাকেন। হেফাজত নেতাদের একটি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে দেখাও করেন। তবে হেফাজতের বিরুদ্ধে সরকারের অনড় অবস্থানে থাকে।

একপর্যায়ে ২৫ এপ্রিল রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বাবুনগরী হেফাজতে ইসলামের কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। তবে ৭ জুন বাবুনগরীকে আমীর করে আবারও ৩৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর থেকে ‘আগের তেজ হারিয়ে’ শুধু বাবুনগরীর নামে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল হেফাজতে ইসলামের কর্মকাণ্ড।

সারাবাংলা/আরডি





Source link