হিন্দু প্রতিবেশীর মৃত্যুতে, মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে শবদাহ ক্রিয়া

প্রতিবেশী ডেস্ক: সোমবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গণেশ রবিদাস (৪৫)। নুন আনতে পান্তা ফুরনো পরিবারে মৃতদেহ সৎকারের খরচ জোগানো মুশকিল ছিল। কিন্তু মুশকিল আসান খোদ মসজিদের ইমাম।

★★★ মাত্র দু’ঘর হিন্দুর বাস ৫০০ পরিবারের এই গাঁয়ে। অথচ এখানে ধর্ম একটাই – মানবধর্ম। সোমবার তারই নজির দেখা গেল সুতির মোমিনপুরে।★★★

সোমবার সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গণেশ রবিদাস (৪৫)। নুন আনতে পান্তা ফুরনো পরিবারে মৃতদেহ সৎকারের খরচ জোগানো মুশকিল ছিল। কিন্তু মুশকিল আসান খোদ মসজিদের ইমাম। গাঁয়ের ছেলেপুলেদের জুটিয়ে পৌঁছে যান গণেশের বাড়ির দোরগোড়ায়। জাকির-নুরুলরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অন্তিম যাত্রায় সঙ্গী হলেন হিন্দু প্রতিবেশীর। কেউ বাঁশ কেটে আনলেন, কেউ খই ছিটোলেন, কেউ আবার ঘাটকাজের জন্য নতুন কাপড় কিনে আনলেন এক দৌড়ে।

সুতির মোমিনপাড়ায় প্রায় ৫০০ পরিবারের বাস। তার মধ্যে মাত্র দুই ঘর হিন্দু। দীর্ঘ দিন ধরে মুসলিম মহল্লায় নিশ্চিন্তে রয়েছেন তাঁরা। সোমবার গণেশ রবিদাস মারা যাওয়ার পর ধর্মের কচকচানিতে না গিয়ে প্রতিবেশীর কর্তব্য পালন করলেন সকলে।

মোমিনপাড়ায় যে মসজিদ রয়েছে, তারই ইমাম নুরুল হক। গ্রামের এক পঞ্চায়েত সদস্য এবং তরুণদের জুটিয়ে এ দিন সকাল সকাল তিনি পৌঁছে যান গণেশের বাড়িতে। পারলৌকিক ক্রিয়ার কেনাকাটা থেকে দেহ নিয়ে যাওয়া সব কিছুই করলেন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা। ঠিক যেন পরিবারের সদস্য।

এ দিন নুরুল হক বলেন, ‘আমরা জাতি ধর্মে বিশ্বাসী নই। এত দিন ধরে আমরা একসঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করছি। খুবই গরিব পরিবার। সেই কারণেই সকলের সাহায্য নিয়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।’

এ দিন গণেশ রবিদাসের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল বিলাপ করছেন সদ্য বিধবা সনকা রবিদাস। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে কী ভাবে চলবেন, ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। পাশে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন শাদিকা বিবি-মাহফুজা বিবিরা। বলে উঠলেন, ‘আমাদের যদি দু’টো ভাত জোটে, তোমারও জুটবে। চিন্তা কর না।’

গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য মাসাদুল মোমেন নিজেও ছুটে গিয়েছিলেন এ দিন। বললেন, ‘বিপদের দিনে মানুষের পাশে থাকাটাই তো কর্তব্য। আমরা এখানে একই পরিবারের মতো। তাই যেখানে শ্মশান রয়েছে, সেখানে দাহ করার পর ৯০ জনকে খাওয়ানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন গ্রামের সকলে মিলে।’

জেলার পুলিশ সুপার শ্রী মুকেশ বলেন, ‘মুর্শিদাবাদ জেলা বরাবরই সম্প্রীতির মেলবন্ধনের জায়গা। সুতির মোমিনপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, তার উদাহরণ সব জায়গায় তুলে ধরা হবে। সহিষ্ণুতাই পরম ধর্ম।’

গত কয়েক দিন ধরেই মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু জায়গায় অশান্তির খবর পাওয়া গিয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফেরাতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলো যখন জেলার বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি মিছিলে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় নিজেদের কর্তব্যে অবিচল থেকে বার্তা দিল প্রত্যন্ত এক গ্রামের বাসিন্দারা।

অসহিষ্ণুতার আবহে সহিষ্ণুতার জয়গান গাইল মোমিনপুর।

মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.