হাসপাতালের ‘আইসোলেশন’ কীভাবে কাটছে, অভিজ্ঞতা জানালেন পুলিশ সদস্য

0
796

স্বাধীন হোসেন বিপ্লব। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি শাখায় কর্মরত এই পুলিশ কনস্টেবলের কোনো উপসর্গ ছিল না। তবুও পরীক্ষায় করোনাভাইরাস পজিটিভ এসেছে। তাই এখন আইসোলেশনে রয়েছেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার নিজের আইসোলেশেনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এই পুলিশ সদস্য।

স্বাধীন হোসেন বিপ্লব বলেন, ‘আইসোলেশন রুমে করোনা পজিটিভ পুলিশ সদস্য রয়েছে তিনজন, এসআই মোস্তাফিজুর, এএসআই সোহাগ ও আমি। গত কয়েকটা দিন খুবই ভালো কাটতেছিল আমাদের। এসআই মোস্তাফিজুর স্যার, উনার সার্ভিস জীবনের মজার মজার ঘটনাগুলো ও বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের দুজনের কাছে যখন বলতো, তখন আমরা দুজন অবাক হয়ে শুনতে থাকি। গত সন্ধায় খবর আসল, স্যারের পরিবারের বাকি তিন সদস্যের (স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে) করোনা পজিটিভ হয়েছে। সংবাদটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মানুষটির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আমরা দুজন অনেক চেষ্টা করলাম স্যারকে সাহস দিতে কিন্তু ব্যর্থ হলাম।’

এই পুলিশ সদস্য আরও বলেন, ‘এরপর এশার নামাজ শেষে রাতের খাবার খেয়ে ১১টার দিকে ঘুমাতে গেলাম তিনজন। ঠিক ফজরের আজানের কিছুক্ষণ আগে রুমের ভেতর হঠাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের বিকট শব্দ পেলাম। ঘুম ভেঙে গেল আমাদের। দেখি, মুস্তাফিজুর স্যারের ভীষণ শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তাড়াহুড়া করে আমরা দুজন মাস্ক লাগিয়ে হাতে গ্লাভস পরে স্যারকে ধরে বসালাম। নার্সকে ফোন করলাম। নার্স দ্রুত একটি পোর্টেবল অক্সিজেন স্যারের মুখে লাগিয়ে দিলেন। আজ (মঙ্গলবার) সকালে স্যারকে আইসিইউ ইউনিটে রেফার্ড করা হয়েছে। যাওয়ার সময় স্যারের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। হয়তোবা অতিরিক্ত টেনশনে তার এমন অবস্থা। তাই টেনশন ফ্রি থাকার চেষ্টা করছি।’

কীভাবে করোনায় আক্রান্ত হলেন, এ প্রশ্নের উত্তরে স্বাধীন বলেন, ‘আমি হেডকোয়ার্টারে যে শাখায় কাজ করি, সেই শাখার একজন পুলিশের প্রথমে করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। এরপর ওই সেকশনে থাকা আরও পাঁচজনের করোনা টেস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে আমারসহ আরও দুজনের করোনা পজিটিভ এসেছে। তবে কীভাবে কার মাধ্যমে আমি বা আমরা আক্রান্ত হয়েছি, এটা বলা মুশকিল। যেহেতু পুলিশের চাকরি করি, তাই অনেকের সাথেই মিশতে হয়।’

পুলিশ সদস্য স্বাধীন বলেন, ‘আমি ছুটি পেয়ে বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ব্যাগও গুছিয়ে ছিলাম। কিন্তু ভাবলাম বাড়িতে যাওয়ার আগে একবার করোনা টেস্ট করে যাই। আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম যে, আমার রেজাল্ট নেগেটিভ আসবে। তাই বাড়িতে বলেছিলাম যে, ছুটি পেয়ে গ্রামে আসছি৷ কিন্তু যেদিন ফলাফল পজেটিভ এসেছে সেদিন প্রথমে একটু খারাপ লাগলেও পরে মানসিক অবস্থা শক্ত করেছি।’

স্বাধীন বলেন, ‘আমি বাবার একমাত্র ছেলে। আমার দুটা ছোট বোন আছে গ্রামের বাড়িতে। এরপরও আবার ঘরে নতুন বউ। তারা সবাই গ্রামের বাড়িতে। পরিবারের কেউ আমাকে ফোন করে, আমিই তাদের সাহস যোগাই। তারা যেন ভেঙে না পড়ে।’

সাধারণ মানুষের উদ্দেশে

পুলিশ সদস্য স্বাধীন বলেন, ‘আইসোলেশনে থেকেও এত কিছু বলছি শুধুই আপনাদের জন্য। আপনারা যারা বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন, প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে। তারা কি একবারো বোঝার চেষ্টা করছেন, আপনার অসতর্কতার জন্য আপনাদের প্রাণপ্রিয় পরিবারের সদস্যরা কতটা হুমকির মুখে?’

পুলিশের এই কনস্টেবল আরও বলেন, ‘জ্বর, সর্দি, কাশি নেই তাই ভাইরাস আক্রান্ত নয় ভেবে যাদের সঙ্গে মিশতেছেন, আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন সেই মানুষটি করোনাভাইরাস পজিটিভ নয়?’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্বাধীন বলেন, ‘আমি নিজে কোনো লক্ষণ ছাড়াই করোনা পজেটিভ হয়ে আছি। এখন পর্যন্ত কোনো রকম লক্ষণ দেখা দেয়নি। তাই সাবধান হোন, বাইরে ঘোরাফেরা থেকে বিরত থাকুন। আর যদি বাইরে আসতেই হয়, আমাদের আইসোলেশন সেন্টারগুলোতে আসুন, তাহলেই বুঝবেন করোনার ভয় কাকে বলে। দয়া করে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে হলেও আপনি বাড়িতেই অবস্থান করুন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে