সড়ক ও নিরাপদ জীবন

101

।। মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার ।।
সড়ক দুর্ঘটনা কোন বয়স মানেনা,ধর্ম মানেনা,উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বা সাধারণ জনগণ কিছুই মানেনা।মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে যায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা,নীভে যায় জীবন প্রদীপ,থমকে যায় পরিবার। নিহত ব্যক্তি যদি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হয়ে থাকেন তাহলে তার মৃত্যুতে শুধু পরিবারের গভীর শোক, ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ওই পরিবারকে।আর যারা পঙ্গুত্ববরণ করে তাদের পরিবারের অবস্থা হয় আরো শোচনীয়।পঙ্গু ব্যক্তিকে পরিবারের,সমাজের তথা রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে জীবন কাটাতে হয়। বন্ধ হয়ে যায় সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা।

এবছর করোনাকালীন সময়ে দেশে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও সড়ক মহাসড়কে মালবাহী ট্রাক,মোটরসাইকেল,সিএনজি,ইজিবাইক চলেছে।কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা কমেনি।

গত ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস জাতীয় ভাবে পালন করা হয়েছে। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশে এ বছর সরকারিভাবে ৫ম বারের মতো দিবসটি পালিত হয়। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য “গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি”। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।

উক্ত দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রম টেকসই করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিষ্ঠার সাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এবং জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২১’ উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সাফল্য কামনা করেন। রাষ্ট্রপতি আশা করেন এ আয়োজন নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে জনগণের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।

আজ থেকে ২৮ বছর আগে ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এই দিনে বান্দরবানে শুটিংয়ে থাকা স্বামী ইলিয়াস কাঞ্চনের কাছে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন জাহানারা কাঞ্চন। সেই থেকে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে আসছেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ‘পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়’ এই স্লোগান নিয়ে গড়ে তুলেন সামাজিক সংগঠন- নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। এই আন্দোলেনের ধারাবাহিকতায় এ বছর ৫ম বারের মতো দিনটি জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে।

২০১৭ সালের ৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই দিনটিকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করা হয়।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে নিসচা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে সারাদেশ ব্যাপী নিসচার শাখা কমিটি মাসব্যাপী নানা সচেতনমুলক কর্মসূচি পালন করে আসছে। সেই সাথে উক্ত দিবস উপলক্ষে এক যোগে সারা দেশে দিবসটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)।

নিরাপদ সড়ক চাই ( নিসচা-) এবং বিভিন্ন সংগঠন সহ দেশের যে সমস্ত ব্যক্তি বিশেষ মহল থেকে সড়ক দুর্ঘটনারোধে যে সাজেশন দিয়ে আসা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন না হলে, আমরা সুফল পাবো না’

দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে চলছে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন। গত চার বছরে এ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে সরকারও। প্রতি বছর ২২ অক্টোবর পালন করা হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এর মধ্য দিয়ে আসলে সড়কের নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করা গেলো সেই বিষয়টি ভাবনার বিষয়-??

এখনো সড়ক নিরাপদ হয়নি। বরং অনিরাপদ হয়েছে বেশি। গ্যাপটা হলো- কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, কী করলে দুর্ঘটনা কমানো যেতে পারে- গত ২৮ বছরে যত সরকার এসেছে, প্রত্যেককেই আমরা সেটি জানিয়েছি। অসুখ ধরেছি, ডায়াগনোসিস করেছি, কী ওষুধ লাগবে সেটিও বলেছি। কিন্তু এ সড়কের অসুখ সারানোর দায়িত্ব যিনি নেবেন বা যারা ওষুধ দেবেন, খাওয়াবেন, তারা কাজটা করছেন না।

দীর্ঘ ২৮ বছর আমরা আন্দোলন করছি। ২০১৭ সাল থেকে সরকার দিবস পালন করছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য যে সাজেশন আমরা দিয়ে আসছি, সেগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবায়ন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সুফল পাবো না।

আগের যে সমস্যা ছিল, সেগুলো তো সমাধান হচ্ছেই না, বরং নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যেমন- নসিমন-করিমন ভটভটি আসছে, ব্যাটারিচালিত গাড়ি আসছে। আগের গাড়িগুলোই যেন সঠিক ফিটনেস নিয়ে চলে, চালকরা যেন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে গাড়ি চালান এবং জনগণও যেন নিয়ম মেনে রাস্তায় চলেন, পারাপারে নিয়ম মেনে হন- এসব সমস্যা তো সমাধান হচ্ছেই না, নতুন সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে। যে কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা।

“গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি” আসুন আমরা এই শ্লোগানকে সামনে রেখে অনুসরণ করে দূর্ঘটনা গতিপথ অতিক্রম করি। মূলত গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত গতি দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ। নিয়ন্ত্রিত গাড়ি চালালে সড়কে সিংহ ভাগ দুর্ঘটনা কমবে। তাই এখন গাড়ির গতি কমিয়ে জীবন বাঁচাতে হবে। গাড়ির গতিসীমা মেনে চলতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে। গাড়ির গতিসীমা মেনে চলতে হবে।

একটি সড়ক দুর্ঘটনায় নানাবিদ কারণ ও সম্পর্ক থাকে। এর মধ্যে চালক, যাত্রী, পথচারি অন্যতম। তাই প্রত্যেককেই সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। কেবল এক পক্ষ কে দোষারোপ করলে চলবে না। তিনি বলেন, পথচারিকে সচেতনভাবে রাস্তা পারাপার হতে হবে। কানে মোবাইল নিয়ে রাস্তা পার হলে দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই পথচারিকে অবশ্যই সচেতন হয়ে সড়ক ব্যবহার ও রাস্তা পারাপার হতে হবে। আমাদের দেশে চালকদের আট ঘণ্টা গাড়ি চালানোর নিয়ম করতে হবে। সক্ষমতার বেশি গাড়ি চালালে চালকেরও সমস্যা হওয়ার আশঙ্খা থাকে।

যানবাহন সব সময়ই নিয়ন্ত্রণ করে চালাতে হবে। নিয়ন্ত্রণহীন গতি মানুষের জীবনের গতিই থামিয়ে দিতে পারে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত গাড়ির গতি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমার আপনার সকলেরই দায়িত্ব আছে। কেবল এক পক্ষের ওপর দায় চাপালে হয় না। যাত্রী বা পথচারি হিসাবে আমার নিজেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আমি আমার দায়িত্ব পালন করলেও দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমবে। আমাদের সকলকে সব জায়গায় নৈতিকতার পরিচয় দিতে হবে। আমি আমার জায়গায় নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করলে অনেক সমস্যাই সমাধান হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনাও একটি সমস্যা। আমি নিজে সচেতন, দায়িত্বশীল ও নৈতিকতার পরিচয় দিলে দুর্ঘটনা কমবে।

[ লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশকঃ বাংলা পোস্ট বিডি নিউজ, প্রাবন্ধিক ও সদস্য ডিইউজে ]