স্বাধীনতার ৫০ বছর: বিদেশ থেকে প্রথম পদক জয়ী সুলতানা কামাল

0
89

বিদেশের মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে প্রথম পদক জয়ী বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকী। ছবি: সুলতানা কামালের পারিবারিক অ্যালবাম থেকে।

বঙ্গবন্ধু: খুকু, তুই বাঙালির মান রাখতে পারবি তো?

সুলতানা আহমেদ খুকী: পারবো।

১৯৭৩ সালে অল ইন্ডিয়া রুরাল গেইমসে (নিখিল ভারত গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা) অংশ নেওয়ার দিনকয়েক আগে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা দলটি গিয়েছিল ৩২ নম্বরে। ওই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন সুলতানা আহমেদ খুকী। ওই সময় দেশের মান রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যদের কাছে খুকী আর বঙ্গবন্ধুর আদরের খুকু।

ওই আসরে লংজাম্পে রৌপ্য পদক জেতেন সুলতানা। এটাই ছিল বিদেশের মাটিতে স্বাধীন দেশের হয়ে বাংলাদেশের কোনও অ্যাথলিটের প্রথম পদক জয়ের গল্প, কীর্তি। ওই একই আসরে বাংলাদেশের হয়ে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন শামীম আরা টলি। প্রথম বিদেশ সফরে এ পদক প্রাপ্তিতে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সুলতানাকে বলেছিলেন, “পদক তো জিতেছিস। এখন বল কী চাস?” খুকীর ঝটপট উত্তর ছিল , “মেয়েদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স চাই।”

বিদেশ থেকে প্রথম পদক জেতাই নয়, দেশের অনেক প্রথমের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সুলতানার নামটি। ১৯৬৬ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়শিপে লংজাম্পে রেকর্ড করে জেতেন স্বর্ণপদক । ১৪ বছরের খুকী তখন স্কুলপড়ুয়া।

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অলিম্পিক গেমসে লংজাম্পে নতুন রেকর্ড গড়ে স্বর্ণপদক পান। ১৯৭০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হার্ডলসে নিজের রেকর্ড ভেঙে জেতেন স্বর্ণপদক। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ টানা তিন বছর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা। খুকী প্রতিবারই অংশ নেন; ফিরেন যথারীতি সোনা জয়ের হাসি নিয়ে।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ১০০ মিটার হার্ডলস , লং জাম্প ও হাই জাম্প-তিন বিভাগেই সেরা খুকী; ১০০ মিটার স্প্রিন্টে দ্বিতীয়; ওই বছরই অর্জন করেন জাতীয় ক্রীড়া লেখক সমিতির (বিএসপিএ) বর্ষসেরা অ্যাথলিট হওয়ার গৌরব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী ‘ব্লু’ও তিনি। ১৯৭৪-তে স্বর্ণপদক জেতেন লং জাম্পে। ১৯৭৫ সালে ১০০ মিটার হার্ডলসে ১৭ দশমিক ৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি নতুন রেকর্ড গড়ে প্রথম হন। একই আসরে সেরা হন লং জাম্পেও।

বিয়ের সাজে সুলতানা কামাল খুকী। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে।

সুলতানা আহমেদ থেকে সুলতানা কামাল হয়ে ওঠাটাও কম ঘটনাবহুল নয়! দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার ‘ম্যাচ মেকার’ মূলত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা।

দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। খুকীর বাবা দবিরউদ্দীন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার। পরিবার নিয়ে থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বকশী বাজারের কোয়ার্টারে। এ বাসায় হাসিনা ও রেহানা এই দুই সহোদরার যাতায়াত ছিল নিয়মিত। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ তনয় শেখ কামালের সঙ্গে ছিল খুকীর তিন নম্বর ভাই বাবুলের (ফারুক মোহাম্মদ ইকবাল) বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর বেলা ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে বাবুলকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। দেশ স্বাধীন হল, কিন্তু ফিরে আসেননি বাবুল। এর দুই দিন পর শেখ কামাল আসেন খুকীদের বাসায়। মা জেবুন্নেচ্ছাকে বলেন, “আমি বাবুলের শুন্যতা পূরণ করব।”

দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা অনুধাবনের জন্য খুব বেশিদূর যাওযার দরকার নাই। শেখ জামাল লল্ডন থাকাকালীন, খুকীর জন্য ট্র্যাক সু পাঠিয়েছিলেন। তবে খুকীকে ভাতৃবধু করার ক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগী হন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। আত্মজাদের চাওয়াকে শিরোধার্য মেনে নিয়ে, মাতুয়াইলের এক স্থানীয় রাজনীতিবিদকে দিয়ে বড় ছেলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। আনুষ্ঠানকিভাবে বিয়ে হয় ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই।

কিন্তু, কেন বিয়ের দিন ১৪ জুলাই? এ নিয়ে খুকীর মেজভাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ জসিমের ভাষ্য, “ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) সময় বাস্তিল দুর্গের পতন হয়েছিল ১৪ জুলাই। দিনটি ঠিক করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে আমার মনে হয়েছে, বড় ছেলের বিয়ের দিন হিসাবে বঙ্গবন্ধু এই বিশেষ দিনটিকেই বেছে নিয়েছিলেন। যদিও বিষয়টা নিশ্চিত কি-না আমি জানি না। তবে আমার বিশ্বাস এমনি এমনি ১৪ জুলাই তারিখটি বেছে নেননি রাজনীতির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু।”

বাস্তিল দুর্গের পতনের দিনটিকে বঙ্গবন্ধু বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা অ্যাথলিট খুকীর সঙ্গে নিজের বড় ছেলের বিয়ের দিন হিসেবে। ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন জাহাঙ্গীর। খেলাধুলার সঙ্গে সংশিষ্ট ছিলেন। ঢাবির আন্তঃহল প্রতিযোগিতায় জিতেছেন অনেক পুরস্কার।

খুকী নয় ভাই বোনের মধ্যে অষ্টম। আর বোনদের মধ্যে সবার ছোট। পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকের পথে। পরিবারের জীবিতদের কাছে খুকী এখনও জীবন্ত, সব সময়ের চ্যাম্পিয়ন। একান্নবর্তী এই পরিবারটির সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েকের কিছু বেশি সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা চেষ্টা করলেও হয়ত ভুলতে পারব না।

প্রথমে কথা বলছিলাম, পরিবারের ছোট ছেলে গেলাম আহমেদ টিটোর সঙ্গে। ৩০-৩৫ মিনিট পর আসলেন মেজ ভাই জাহাঙ্গীর। ড্রইংরুমে সোফায় বসার আগেই সত্তোর্ধ এই ভদ্রলোক বললেন, “জার্নালিস্ট সাহেব পি বি শেলির Our sweetest songs are those that tell of saddest thought… এমন একটা কবিতার লাইন আছে না? কবিতার এ ভাষা আমাদের কাছে Our sweetest songs are those when we used to see sultana’s cheerful face winning gold medal…”

এরপর নিজেই বাংলা করে বললেন, “পদক জয়ের পর খুকীর আনন্দময় মুখটিই আমাদের মধুরতম সঙ্গীত।”

খুকীর সঙ্গে ছোট ভাই টিটোর স্মৃতি এখনও টাটকা। দুই জনের বয়সের পার্থক্য ১০ বছরের। তারপরও দুষ্টুমি, খুনসুটি কম হতো না দুজনের মধ্যে। খুকী কখনো ২০০ মিটারে অংশ নিতেন না। এদিকে মাঝে মধ্যেই পা ম্যাসাজ করে দেওয়ার জন্য ছোট ভাইকে এটা-ওটার লোভ দেখিয়ে ডাকতেন। টিটোর কথায়, “প্রথম দিকে বলতাম , চ্যাম্পিযন হতে পারলে পা ম্যাসাজ করে দিব। কিন্তু আপু তো চ্যম্পিয়ন সব সময়ই হয়। তাই বুদ্ধি করে বললাম, ২০০ মিটারে অংশ নিলে ম্যাসাজ করে দিব। আপু বলত, ঠিক আছে ম্যাসাজ কর। ২০০ মিটারে অংশ নেব। কিন্তু কখনোই খুকী আপু ২০০ মিটারে অংশ নেয়নি।”

খুকীর ছেলেমানুষী নিয়ে একটা মজার ঘটনা জানালেন টিটো, “খোকন (পাঁচ নম্বর ভাই) ভাইয়ের জ্বর হয়েছে। ভাইয়ের জন্য বাসায় আঙুর আনা হয়েছে। খুকী ভাইয়ের কাছে আবদার করে বলল, আমি তোমার আঙুরগুলো খাই। আমার যখন জ্বর হবে, তখন তুমি আমার আঙুরগুলো খেয়ো।”

খুকীর মুখে কেবল বোল ফুটেছে। বড় শব্দগুলো তখনো রপ্ত করতে শেখেনি। বাড়ির বড়দের কোলে চড়েই , ‘বাংলা চাই’, ‘বাংলা চাই’ শ্লোগান দেওয়ার চেষ্টা করত খুকী, জানালেন জাহাঙ্গীর সাহেব।

বাংলাদেশ রাজনীতির প্রতিটি বাঁকের সঙ্গেই যে বাসাটির প্রত্যক্ষ যোগ, তার একটা প্রভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। এই পরিবারের পাঁচ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের ছাত্র। এদের একজন খুকী। সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্সের ছাত্রী ছিলেন। লিখিত পরীক্ষাও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাইভা আর দেওয়া হয়নি। তার আগেই ১৫ অগাস্ট ট্র্যাজেডির শিকার হন। ৩২ নম্বর বাড়িটির ইতিহাসের অংশ হয়ে যান খুকী।

১৫ অগাস্ট ট্র্যাজেডির দুই দিন আগে কামালকে নিয়ে বকশি বাজারের বাসায় এসছিলেন খুকী। তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি কামাল। ভার্সিটিতে প্রোগ্রাম আয়োজন উপলক্ষে দ্রুতই চলে যান। আবার বিকালের দিকে এসে স্ত্রীকে নিয়ে যান। যাওয়ার আগে মা জেবুন্নেচ্ছা বেগমকে খুকী বলে যান, ১৫ অগাস্ট আসবেন। ভাল রান্না করে রাখার কথাও বলেন। তার শ্বশুরও (বঙ্গবন্ধু) আসতে পারেন এমনটাও জানিয়ে গিয়েছিলেন।

১৫ অগাস্ট সকাল। খুকীর বড় দুই ভাই ছুটলেন ৩২ নম্বরের দিকে। কিন্তু কোন লাভ হলো না। যে বাড়িটির দরজা কখনো বন্ধ হতে পারে, এমনটা স্বপ্নেও কখনো ভাবা সম্ভব ছিল না। দূর থেকে সেই বাড়িটির দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকতে হল দুই ভাইকে।

১৫ অগাস্ট ট্র্যাজেডির শিকার মারাত্মকভাবে আহতদের কয়েকজনকে আনা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজে। বকশি বাজারের বাসা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বেশ কাছাকাছি। একটু পর পর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন জেবুন্নেচ্ছা। সেজো ছেলে বাবুলের জন্য দিনের পর দিন টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখেছেন, কিন্তু ছেলে ফেরেনি। অতি আদরের খুকীও কি, ভাবতে পারেন না কিংবা ভাবতে চাননি জেবুন্নেচ্ছা।

কাজলা দিদির মায়ের মত খুকীর কথায় বুকে পাথর বেধেঁ আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাটিয়ে গেছেন আড়াই দশক। ভাই বোনদের কাছে খুকী চিরজীবন্ত। স্বর্ণজয়ী মুখখানাই ভেসে ওঠে সবার চোখে। কাজলা দিদি আর খুকী যেন সমার্থক। কেউ গল্প বলে, স্বপ্ন দেখায় আর কেউ গল্পের বিষয়বস্তু হয়ে স্বপ্ন দেখায়। কোন কাজলা দিদি সত্যি? হারিয়ে যাওয়া, নাকি যুগ যুগ ধরে গল্প বলে যাওযা কাজলা দিদি কিংবা খুকী?

১৫ অগাস্টের কথাবার্তা বলার একটা সময়ে মা জেবুন্নেচ্ছার কথাও উঠল। এরপর হঠাৎ বুঝতে পারলাম, সবাই নির্বাক। নীরবতা ভেঙে বিদায় নিলাম। বিদায় নেয়ার আগে মনে হল খ্যাতনামা কবি জন ডান-এর বিখ্যাত কবিতা ডেথ’র ওই লাইনটা-Death, thou shalt die. (মরণ তোরও মৃত্যু)

সুলতানা কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্স হয়েছে। আন্তর্জাতিক আসর থেকে বাংলাদেশের মেয়েরা পদক জিতছে। জাহাঙ্গীরও অনুভব করেন অন্যরকম আনন্দ। আদরের খুকী নেই কিন্তু কেউ পদক জিতলে তার কাছে, “খুকীর আনন্দমাখা মুখখানা এভাবেই বারবার ঘুরে ফিরে আসে।”

Source link