সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নামের খতনা | Unitednews24.com

0
78

রহিমা আক্তার মৌ

রহিমা আক্তার মৌ :: ১৭ মার্চ থেকে শরীর ভালো না, রাতে জ্বর ও আসে। উপসর্গ প্রায় সবই। করোনা টেস্ট করাবো কিন্তু কোথায়? পিজি হাসপাতাল এর কথা মনে হলে বুক কাঁপে। একটা আশ্বাস পেয়েছি তাও দুদিন পরে। পরিবারের লোকজন আছে, টেস্টটা করানো জরুরী। একজন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কথা বললেন, কাছাকাছি বলে নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে বের হলাম। যাত্রার পরিবহন ১৫০/ টাকায় সিএনজি। আগষ্ট ২০২০ প্রাইভেট ভাবে মেয়ে আর জামাতার টেস্ট করিয়েছি জনপতি ৫০০০/ করে, তাই সরকারি ভাবে করার একটু চেষ্টা।

আহসান গেল অফিসে, আমি একাই বের হয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করে করে বুঝলাম ১০/ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়, সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে টিকিট নিলাম। ১৩২ নং রুমে যেতে বলল, গিয়ে দেখি ১৩২ রুম বন্ধ। মানুষের স্রোত কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? তা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছি।
চিল্লাচিল্লি, ক্যা ক্যা আর হাসপাতালের খালা মামুদের বকা আর বাশির শব্দ। সামনে এগিয়ে গিয়ে বকা খাওয়ার আগেই এক মামুকে বলি,
— টিকিটে লেখা ১৩২ নং রুম, কিন্তু রুম তো বন্ধ।
— ১৩৩ এর সিরিয়ালে দাঁড়ান।
দেখলাম শদুয়েক মানুষ এই লাইনে, এদের টপটিয়ে আমি ১৩৩ নং রুমের সামনেই দাঁড়িয়ে মামুর সাথে কথা বলছি। মনে মনে ভাবছিও রহিমা তোর সাহস বটে।
১৩৩ এর লাইনে দাঁড়ানো আমার সম্ভব নয়, ভাবলাম মামুকে করোনার কথা বলে দেখি। সমস্যা বললাম, মামু আমাকে কাঁচের দেয়ালের রুম দেখালেন। যাক এক ধাক্কা পার হলাম। কাঁচের দেয়ালের রুমে এসে আপাকে সব বললাম, করোনা টেস্ট করাবো বললাম। উনি কিছু ওষুধ দিলেন। রক্ত টেস্ট, এক্সরে আর করোনা টেস্ট করতে দিলেন। দেয়ালে নাম্বার দেখিয়ে বললেন,
— এই নাম্বারে কল করে করোনা টেস্টের সিরিয়াল নিবেন। আর ওই রুমে টাকা জমা দিয়ে বাকি টেস্ট।

নাম্বারে কল দিচ্ছি, মোবাইল বন্ধ।
— আপা, নাম্বার তো বন্ধ।
— কল করতেই থাকেন, এক সময় ধরবে। ( অবশ্য বন্ধ না হয়ে গানের রিং টোন হলেও ভালো লাগতো)

৩০০/ টাকা জমা দিয়ে রক্ত দিতে আর এক্সরে করতে ছুটলাম। উঁকিঝুঁকি দিয়ে কয়েকজনের আগেই ঢুকে পড়লাম। আসলে এত লম্বা মানুষ তার উপরে যে ভাবে নিজেকে পেঁচিয়েছি কেউ কিছু বলতে মনে হয় ভয়ও পাচ্ছে। আর কথা বলার ভাব এমন যেন আমি ডা. কুদরতের শালিকা বা ডা. মারুফার ননদ লাগি।

এই রুম ওই রুম করতে করতে পেছনে যেতে যেতে কই যে যাচ্ছি আর জানিনা। শরীর তো খারাপ, লম্বা মানুষ বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনা। কৌসলে কৌসলে সব ধাপ পার হলাম। বারান্দা হয়ে গেছে ওয়ার্ড, ফ্লোরে শুয়ে আছে রোগী, ও আল্লাহ্‌ আমায় রক্ষা করো। সিরিয়াল ক্রস করে রক্ত দিতে বসলাম, যিনি নিবেন তিনি বললেন,
— টিউব কই।
— জানিনা।
যাক ভদ্র লোক আমায় দয়া করে নিজেই টিউব এর ব্যবস্থা করলেন, কপাল আমার।

আবার এই রুম ওই রুম করে এক্সরে রুমে। এই রুমের ইতিহাস লিখতে গেলে এক দিস্তা কাগজ লাগবে। থাক সেই কাহিনী। এক্সরে রুমে খালা মামু দুজনেই আছেন, মামুকে বললাম,
— আমার সাথে কিন্তু কেউ নেই, যদি পড়ে যাই নিয়ে যাবারও কেউ নাই। তাই দ্রুত যদি করতেন।
৩০ মিনিট পর ডাক আসলো,
— রহিমা আক্তার আছেন।
— হ্যাঁ আমি রহিমা আক্তার।
পাশ থেকে ছোট খাটো এক মহিলা দাঁড়িয়ে বলেন,
— আমি রহিমা আক্তার।
মামুতো বিপদে।
— আচ্ছা কার বয়স ৪৫ বছর, আমরা দুজনেই বলি,
— আমার।
মামু তো মহা বিপদে। মামু উনার হাতের কাগজ আমাদের হাতের কাগজের সাথে মিলাতে এসে আমায় বলেন,
— আপনি হলেন গিয়ে মাহিমা আক্তার, টোকেন নং ৩৩৭, উনি রহিমা আক্তার টোকেন নং ৩৩৪।

আমি তো পুরাই কেবলা, আমার আকিকা দেয়া নামটা এই ভাবে সুন্নতে খাতনা করিয়ে দিলো।
যাক এক্সরে হলো। মামু বলেন,
— রিপোর্ট নেয়ার সময় আপনার নাম মাহিমা আক্তার মনে রাখবেন কিন্তু।

১৫০/ টাকা সিএনজি ভাড়া দিয়ে বাসায় এসেই অন্দরমহলে প্রবেশ। রাতে প্রাইভেট ভাবে লোক এনে সেম্পল দিই, পরের দিন রিপোর্ট পজেটিভ। আলহামদুলিল্লাহ ১৫ দিন পর ২ এপ্রিল শুক্রবার ২য় টেস্টে নেগেটিভ আসে। বেদনার বিষয় আমার ছোট মেয়ে অভ্র’র পজেটিভ আসে।

আসা যাওয়া ১৫০+১৫০= ৩০০/, টেস্ট ৩০০/ মোট ৬০০/ জলেই গেলো, একদিনের জন্যে নামটাকেও খাতনা করাইলো। রিপোর্ট আনতে গিয়ে আবার গিয়ে নামই হারাই।

 

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।

Print Friendly, PDF & Email

Source link