সীমান্ত হত্যার শেষ কোথায় ?

0
104

।। মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার ।।
নির্বিচারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী ( বিএসএফ-) গুলিতে প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশী নিহত হচ্ছেন । অথচ ভারতের অন্য প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান কিংবা চীনের সীমান্তে এমন ঘটনা ঘটে না। এমনকি ভারতীয় সীমান্তবর্তী দেশ নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, সীমান্তে সাধারণ নাগরিক শান্তিতে বসবাস করতে পারলে আমরা বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশ কেন ভারতের বিএসএফের গুলি খেয়ে মরছি?

ভারতের সীমান্তবর্তী সন্রাসীরা কেন মরেন না। এ যাবৎ কালে বিএসএফের গুলিতে যত বাংলাদেশী নাগরিক মারা গেছেন প্রকৃতপক্ষে তারা বাংলাদেশ সাধারণ কৃষক কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তা হলে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে, কেন বাংলাদেশী নাগরিকদের সন্রাসী বলছে । আমরা যদি ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র হই তা ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের বন্ধু । কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তার বিপরীত। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের নাগরিকদের গুলি তারাই প্রমাণ করছে আমরা তাদের শত্রু । আমরা তাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভাবলেও তাদের ব্যাবহার শত্রুরাষ্ট্রের চেয়েও আরো ভয়ানক অবস্থা।

মানবাধিকার সংগঠক আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ( আসক) হিসেবে ২০১৯ সালে সীমান্তে ৪৩ জন বাংলাদেশী নিহত হন। তাদের মধ্যে গুলিতে ৩৭ জন এবং নির্যাতনে ঘটনায় ছয়জন। আর তাতে আহত হয়েছেন ৪৮ জন। অপহরণ হয়েছেন ৩৪ জন। ২০১৮ সালে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। আর ২০১৭ সালে ২৪ জন। সরকারি হিসেবে এক বছরে সীমান্ত হত্যা ১২ গুণ বেড়েছে বাংলাদেশ । নানা প্রতিশ্রুতির পরও সীমান্ত হত্যা কমছে না। আর গত তিন বছরের হিসেবে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যা হয়েছে গত বছর ( ২০১৯-)। চলমান ২০২০ সালের ঠিক একই রকম অবস্থা চলছে ।

পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন, মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের ( মাসুম) প্রধান কিরিটি রায়,বলেন – আগে বিএসএফ বলতে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে এলে আমরা আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছি। লাশ ফেরত দিত। এখন আর তাও করে না। গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়। ফেরত ও দেয়না। তিনি বলেন ” ভারত ” তো একটা হিন্দুরাষ্ট্র পরিণত হয়েছে । তারা তো সীমান্ত হত্যা কখনও বন্ধ করবে না। সীমান্তে মুসলমানদেরও মারছে । আর ঠেলে তা বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। আমরা প্রতিটি ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করে আসছি। কিন্তু তাতে ভারত হত্যা করবেই থাকবে না। তারা মারছে তো মারছেই। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঠিক মতো শক্ত প্রয়োগ করে বাংলাদেশ সরকার এর প্রতিবাদ করতে পারচ্ছে না। তাতে মেরে দিচ্ছে প্রতিদিন কিন্তু এতে কোনো বিচার নাই।

বিগত ১০ বছরে প্রায় এক হাজার মানুষ ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কতৃক নিহত হয়,। যার বেশি – ভাগই বাংলাদেশী। সীমান্ত এলাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি হত্যার ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে । অনেক ক্ষেত্রে নিরস্ত্র ও অসহায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে ঠান্ডা মাথায় এ হত্যাকান্ডের পরিস্কার প্রমাণ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কাউকেই হত্যাকান্ডের জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি ।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রেকর্ড অনুযায়ী ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক হাজার ৬৪ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে ( বিএসএফ)। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই ছয়,বছরে ( বিএসএফ ) গুলি ও শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে ৪২ জন বাংলাদেশীকে। অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সীমান্তে ৩১২ বার হামলা চালানো হয়। এতে ১২৪ জন বাংলাদেশী নিহত হন । এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ১৩০ টি হামলায় ১৩ জন নিহত, ১৯৯৭ সালে ৩৯ টি ঘটনায় ১১ জন, ১৯৯৮ সালে ৫৬ টি ঘটনায়,২৩ জন, ১৯৯৯ সালে ৪৩ টি ঘটনায় ৩৩ জন, ২০০০ সালে ৪২ জন টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত হয়।

এতে ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলেও তার প্রতিফলন মেলে না সীমান্তে, এমনকি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেও । দুই দেশের আলোচনায় সিদ্ধান্ত, হয় যে, বিএসএফ নন লেথাল ( প্রাণঘাতী নয়-) অস্ত্র ব্যবহার করবে, যাতে সীমান্তে হত্যা শুন্যতে নামিয়ে আনা যায় । কিন্তু তারপরও কেন এত হুজ্জতি করে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার? সীমান্ত হত্যা এভাবে চলতে পারেনা। বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের এখনি উচিত সঠিক সমাধান খুঁজে বের করে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা। তা না হলে অতিদ্রুত দুই দেশ,মধ্যে বন্ধুত্বের ফাটল ধরতে পারে খুব শিঘ্রই।

[ লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক আপন আলো, বিশেষ প্রতিবেদক শ্যামল বাংলা টিভি, সাবেক কাউন্সিলর; বিএফইউজে-বাংলাদেশ ও সদস্য; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ]