সাংবাদিকতায় সহায়ক হিসেবে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

0
103

হীরেন পণ্ডিত:: প্রথমে কয়েকটি মিডিয়া এবং সংবাদ সংস্থা খেলাধুলা, আবহাওয়া, শেয়ারবাজারের গতিবিধি এবং করপোরেট পারফরম্যান্সের মতো খবরাখবর তৈরির ভার কম্পিউটারের হাতে ছেড়ে দেয়। এরপর যথার্থতা ও ব্যাপকতার বিচারে মেশিন, কিছু ক্ষেত্রে ভালো কাজ করেছে। অনেক সাংবাদিক যেসব ক্ষেত্রে প্রায়ই একটি মাত্র উৎসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করেন, সেখানে সফটওয়্যার বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য খুঁজে এনে, সেই তথ্যের ধরন ও প্রবণতা বুঝে, প্রসেসিং ব্যবহার করে সেই প্রবণতাকে প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে মিলিয়ে – বিশ্লেষণ, উপাধি ও রূপকসহ আধুনিক বাক্য গঠন করতে পেরেছে। রোবট এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি ফুটবল ম্যাচে গ্যালারি ভরা দর্শকের আবেগ নিয়ে প্রাণবন্ত রিপোর্ট করতে সক্ষম।

এ কারণে অনেকে মনে করেন, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিন অনেকের চাকরির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তবে, এআইকে আলিঙ্গন করে, ক্রমশ জটিল, বৈশ্বিক এবং তথ্য-ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠা এই বিশ্বকে আরো ভালোভাবে কভার করার ক্ষেত্রে, এটি তাদের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। রিপোর্টিং, সৃজনশীলতা এবং পাঠক টানার ক্ষমতায় বাড়তি শক্তি জোগাতে পারে বুদ্ধিমান মেশিন। আর এই ক্ষমতা অভাবনীয় গতিতে কনটেন্ট তৈরি, সাজানো এবং বাছাইয়ে সহায়তা করতে পারে সাংবাদিকদের। এআই যেমন সহজে তথ্যের ট্রেন্ড শনাক্ত করে, তেমনি লাখ লাখ ডেটা থেকে চিহ্নিত করতে পারে ঠিক আসল জায়গাটিকে। গণিত এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে, সুনির্দিষ্ট কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সসীম সংখ্যক অনুক্রমিক নির্দেশেরসেটকে অ্যালগরিদম বলা হয়।

সেই অ্যালগরিদম সংশ্লিষ্ট তথ্যের সঙ্গে সরকারি হিসাব মিলিয়ে দেখতে পারে, তাহলে যে-কোনো দেশের সাংবাদিকই সরকারি ক্রয়ে কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে সে সম্পর্কে অনেক সূত্র পেতে পারবেন। অ্যালগরিদম এভাবেই জন্ম দিতে পারে দুর্দান্ত একটি স্কুপ।

বুদ্ধিমান কম্পিউটার যে শুধু প্রচুর ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে, তা নয়। এটি অনেক মানুষের ভিড় থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং তার সত্যতাও যাচাই করতে পরে। মার্কিন বেশ কয়েকটি মিডিয়া আউটলেট ইতিমধ্যেই এআইয়ের মাধ্যমে ফ্যাক্ট চেক বা সত্যতা যাচাই করছে। যেমন, রয়টার্স। সামাজিক মাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ ট্র্যাক করতে এবং টুইটের সত্যতা যাচাই করতে তারা নিউজ ট্রেসার ব্যবহার করছে। ব্রাজিলের সংসদ সদস্যরা খরচের বিপরীতে পাওনা দাবি করে কত টাকা তুলে নিচ্ছেন, তা ট্র্যাক করা হয় একটি রোবটের মাধ্যমে। কোন খরচ সন্দেহজনক এবং কেন, এমন বিষয়ও তুলে আনছে রোবট।

অ্যালগরিদম সাংবাদিকদের কাজে আসে ভিডিওর রাফ-কাট, কণ্ঠ এবং ভিড় থেকে মানুষের চেহারা শনাক্ত করার জন্য। একইভাবে পাঠকদের সঙ্গে আলাপ বা তাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্যও প্রোগ্রাম চ্যাটবট ব্যবহার করা যায়। এই প্রক্রিয়াটি ডেটাকে প্রশ্ন করতে পারে, তাই রিপোর্টার এবং সম্পাদকদের দ্রুত জানতে হবে এই সিস্টেমগুলো কীভাবে চলে এবং এদেরকে সাংবাদিকতার মান বাড়ানোয় কীভাবে কাজে লাগানো যাবে।

সাংবাদিক ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলা খুব সহজ নয়। উভয় পক্ষেরই একে অপর থেকে শেখা প্রয়োজন। চলমান প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে সাংবাদিকদের হাতে এখন এমন অনেক উপকরণ এসেছে, যা দিয়ে তাঁরা ক্ষমতাধরদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়। আর বাড়তে থাকা এই ক্ষমতাকে ঠিকমতো ব্যবহার না করার মানে সুযোগের বড় ধরনের অপচয় ।

সাংবাদিকতার পরিধি বাড়াতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার সময় ভেবে দেখতে হবে, আপনার নৈতিকতার মানদণ্ডের সঙ্গে সেটি কতটা খাপ খায়। সাংবাদিকদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ অ্যালগরিদম মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকরও হতে পারে। কারণ তারা মানুষের তৈরি প্রোগ্রাম, আর মানুষের মধ্যে পক্ষপাত আছে। অনেক সময় লজিক্যাল প্যাটার্নও ভুল উপসংহারে পৌঁছাতে পারে। এর মানে, সাংবাদিকদেরকে সব সময় এআই থেকে আসা ফলাফল পরীক্ষা করে দেখতে হবে – সন্দেহ করা, ক্রস চেক এবং এক নথির সঙ্গে আরেকটি মেলানোর মতো শতাব্দী-পুরোনো যাচাই-কৌশলের মাধ্যমে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা দিয়েছে সাংবাদিকদের। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, অনেকসময় অ্যালগরিদমেরও পক্ষপাত থাকে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই নতুন যুগে সাংবাদিকতার জন্য আরেকটি আবশ্যক জায়গা হলো – স্বচ্ছতা। বার্তাকক্ষে এআই ব্যবহারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, স্বচ্ছতা। এটি সাংবাদিকতার সেই মৌলিক মূল্যবোধ, যার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরোধ আছে, কারণ এআই সাধারণত কাজ করে পর্দার আড়াল থেকে। এরপরেই আছে বিশ্বাসযোগ্যতা। যদিও শক্তিশালী প্রযুক্তির কল্যাণে এখন পাঠকের চাহিদা নিখুঁতভাবে জানা যাচ্ছে, তারপরও বিশ্বাসযোগ্যতার স্বার্থে গণমাধ্যমকে জানাতে হবে, তারা গ্রাহকের কোন ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে আর কোনটি করছে না। কারণ এখনো সংবাদ মাধ্যমের ব্যবসা এবং এর বেঁচে থাকার চাবিকাঠি হলো জনস্বার্থ ।

বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য যারা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে, তাদের চেয়ে আলাদা হবার একমাত্র উপায় এটাই। তদুপরি, ভালো সাংবাদিকতার কাজই হলো চাপা পড়ে যাওয়া সেইসব কণ্ঠস্বর এবং অজানা বিষয়কে সামনে নিয়ে আসা।

শেষ পর্যন্ত, এআই সাংবাদিকতার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এটা যেমন সত্য, তেমনি মানুষকে জানা এবং তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এটি নতুন চ্যালেঞ্জ জন্ম দিচ্ছে। সাংবাদিকসুলভ স্পষ্টতা না থাকলে এই প্রযুক্তি দিয়ে তথ্যনির্ভর সমাজ গড়া অধরাই থেকে যাবে। এই বুদ্ধিমান প্রযুক্তি সাংবাদিকতার হজন্য সমস্যা হতে পারে, যদি তার ব্যবহারে নৈতিকতা না থাকে।

ডেটাকে প্রতিবেদনে রূপান্তরিত করতে  ওয়ার্ডস্মিথ নামের প্রযুক্তি এবং নির্বাচনী রিপোর্টিং-এর জন্য প্রযুক্তি হেলিওগ্রাফ ব্যবহার করা যায়। ব্রেকিং নিউজ ট্র্যাকিং, ট্যাগ এবং লিংক ব্যবহার করে খবর সংগ্রহ ও সাজানো, মন্তব্যগুলো মডারেট করা এবং কণ্ঠ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুলিপি তৈরি করা। হালনাগাদ এবং ঐতিহাসিক ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রভাবিত করতে পারে এমন বিষয় শনাক্ত করা এবং দর্শকদের যুক্ত করা।

চ্যাটবট অ্যাপ্লিকেশনটি তার ব্যবহারকারীদেরকে ঘটনা, ব্যক্তি, বা স্থান সম্পর্কে প্রশ্ন পাঠানোর সুযোগ দেয় এবং সেটি প্রাসঙ্গিক কনটেন্টসহ জবাবও পাঠায় প্রশ্নকর্তাকে। অনেকেই ফেসবুক মেসেঞ্জারের জন্য বট ব্যবহার করে। আবার সংবাদ প্রদান এবং মেসেজিং প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে পাঠকদের সঙ্গে আরো কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়ার’ সুযোগ করে দিতে একটি ওপেন সোর্স নিউজবট তৈরি করার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে যাচাই হয়ে যাওয়া দাবি চিহ্নিত করতে এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ও সুবিন্যস্ত ডেটা ব্যবহার করে যেসব দাবি এখনো যাচাই হয়নি সেগুলো শনাক্ত ও যাচাই করবে ।

তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে কোনো পরিবর্তন, প্যাটার্ন বা অস্বাভাবিকতা অনুসন্ধান করে সফটওয়্যার।  ক্রাইম প্যাটার্ন রিকগনিশন দলিলপত্রের বড় ডেটাবেস থেকে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের দুর্নীতির তথ্য এবং এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের মধ্যকার সংযোগও বিশ্লেষণ করতে পারে।

অনেকে গুগলের প্রযুক্তি ছবি থেকে বস্তু, এলাকা, মানুষের মুখ, এমনকি অনুভূতিকেও শনাক্ত করতে পারে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে খবর থেকে স্ক্রিপ্ট এবং ফুটেজ থেকে ছোট ছোট টুকরো কেটে ধারাবর্ণনাসহ ভিডিওর রাফ-কাট তৈরি করার জন্য উইববিটজ সফটওয়্যার এবং একটি স্বয়ংক্রিয় ভিডিও সম্পাদনা টুল তৈরি করা হচ্ছে। বলাই যায় সাংবাদিকতায় সহায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
লেখক: রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

Print Friendly, PDF & Email

Source link