সব মেয়ে হয়ে যায়— ঢাবি নিয়োগে তাই বাদ পড়লেন নারী প্রার্থী

137


রাহাতুল ইসলাম রাফি, ঢাবি করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদের জন্য চলছিল নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর নিয়োগের সুপারিশ করার জন্য তৈরি করা হয় প্রার্থীদের তালিকা। সেখানে তিন জন নারী প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। আরও এক নারী প্রার্থীও নিয়োগের জন্য বিচিত ছিলেন তালিকায়। কিন্তু সেখানে নিয়োগ বোর্ডের সদস্য একজন অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষকের মন্তব্য— সব মেয়ে হয়ে যায়! অর্থাৎ এই নারী প্রার্থীকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দিলে চারটি পদের চারটিতেই নারী প্রার্থী নিয়োগ পাবেন— এমন বিবেচনা থেকেই তাকে নিয়োগ না দেওয়ার সুপারিশ করেন ওই ঢাবি অধ্যাপক!

একাডেমিক ফলাফল থেকে শুরু করে সবকিছুই ইতিবাচক থাকলেও শেষ পর্যন্ত মরিয়ম রহমান নামে ওই প্রার্থী নিয়োগ পাননি ঢাবি রসায়ন বিভাগে। বাকি তিন নারী প্রার্থীর সঙ্গে একজন পুরুষ প্রার্থী নিয়োগ পেয়েছেন ওই বিভাগে। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের আনুপাতিক হিসাব করা হয়নি এবং এ ধরনের কোনো বিবেচনা নিয়োগের ক্ষেত্রে সিদ্ধ নয়।

গত বছরের ৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে দুই জন এবং প্রভাষক পদে চার জনকে নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করে বিজ্ঞাপন দেয় কর্তৃপক্ষ। ওই বিজ্ঞাপনের বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক পদে ছয় জন ও প্রভাষক পদে ২১ জন প্রার্থী আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বছরের ১৪ জুন নেওয়া হয় সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারে সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদন করা ছয় জনের মধ্যে দুই জন এবং প্রভাষক পদে আবেদন করা ২১ জনের মধ্যে ১৯ জন উপস্থিত ছিলেন।

সব মেয়ে হয়ে যায়— ঢাবি নিয়োগে তাই বাদ পড়লেন নারী প্রার্থী

ঢাবি রসায়ন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকার বোর্ডে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী, বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আফতাব আলী শেখ ও অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন।

সাক্ষাৎকার শেষে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য তিন নারী প্রার্থী— মাকসুদা পারভীন, রায়হানা আফরোজ ও শতাব্দী রায় এবং একজন পুরুষ প্রার্থী মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসানকে সুপারিশ করে বোর্ড। তবে সারাবাংলার ডটনেটের হাতে আসা প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার শিটের তথ্য বলছে, মাকসুদা, রায়হানা ও শতাব্দীর সঙ্গে প্রভাষক পদে চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে নিয়োগ পেতে পারতেন মরিয়ম রহমান।

সাক্ষাৎকার শিটের তথ্য অনুযায়ী, মরিয়ম রহমান ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। সিজিপিএ ৩ দশমিক ৭৩ নিয়ে বিভাগটিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। ২০১৮ সালে একই বিভাগ থেকে সিজিপিএ ৩ দশমিক ৯৩ নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন মরিয়ম।

সাক্ষাৎকার শিটের ২১ নম্বর সিরিয়ালে থাকা মরিয়ম রহমানের নামের পাশেই সাক্ষাৎকার বোর্ডের একজন সদস্য মন্তব্য করেছেন— ‘সব মেয়ে হয়ে যায়’! এই মন্তব্য কার, সেটি জানা না গেলেও সাক্ষাৎকার বোর্ডের সব সদস্যই অধ্যাপক পদমর্যাদার হওয়ায় মন্তব্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একজন অধ্যাপকের— তা বলাই বাহুল্য।

এ বিষয়ে জানতে মরিয়ম রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। আমি মেনে নিয়েছি। যদি কোনো শিক্ষক এমন মন্তব্য করে থাকেন, কেবল নারী হওয়ার কারণেই যদি আমাকে নিয়োগ না দেওয়া হয়ে থাকে, তবে এটুকুই বলব— আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাবি’র একজন সিন্ডিকেট সদস্য সারাবাংলাকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নামের পাশে এ ধরনের মন্তব্য কোনোভাবেই কাম্য নয়, সমীচীন নয়। প্রার্থী নারী নাকি পুরুষ— নিয়োগের ক্ষেত্রে এটি কোনো বিবেচনাই হতে পারে না। যোগ্যতাই এখানে মুখ্য বিষয়। নিয়োগপ্রাপ্ত সবাই মেয়ে যাচ্ছে— এমন মন্তব্য কোনো অধ্যাপক করতে পারেন না।’

জানতে চাইলে নির্বাচনি বোর্ডের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সদ্য সাবেক ডিন অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, বোর্ডে চার জন সদস্য ছিলেন। প্রত্যেকের কাছেই মন্তব্য করার শিট ছিল। এখন কে কোথায় কী লিখে রেখেছেন, সেটি তো আমি বলতে পারি না। লিখে থাকলেও সে অনুযায়ী নিয়োগ হয়নি। নিয়োগ শতভাগ স্বচ্ছ হয়েছে। মেধাবীরাই নিয়োগ পেয়েছেন— এটি আমি বলতে পারি। আমার নিজের তিনটি মেয়ে আছে। সেদিকটিও যদি বিবেচনা করেন, কোনোভাবেই এ ধরনের মন্তব্য আমি করতে পারি না। বরং আমি এ ধরনের মন্তব্যের ঘোর বিরোধী। এরকম মন্তব্য কোনো নিয়ম-নীতির মধ্যেই পড়ে না।

এ বিষয়ে জানতে নিয়োগ-সংক্রান্ত নির্বাচনি বোর্ডের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (শিক্ষা) ড. এ এস এম মাকসুদ কামালকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে কোনো শিক্ষকের এমন মন্তব্য করার বিষয়ে কিছুই শোনেননি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘এমন সংবাদ তোমরা কোথায় থেকে পাও, সেটা বলতে পারি না! আমরা এমন কোনো সংবাদ শুনিনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক বিষয় কোনোভাবেই বিবেচ্য নয়।’

সারাবাংলা/আরআইআর/টিআর





Source link