সঙ্কট মোকাবেলায় প্রয়োজন পেঁয়াজ উৎপাদন স্বয়ংসম্পূর্ণতা

0
134

।। মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার ।।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে দিকে হঠাৎ করে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয় আর তখনই দেশে পেঁয়াজের বাজার প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হওয়ার আমাদের পেঁয়াজের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আর স্বাদ, চাহিদা, পরিবহন, ব্যয়স্বল্পতাসহ বিভিন্ন কারণে ঐতিহাসিকভাবে আমদানিকৃত পেঁয়াজের বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে। গতবছর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের পর মিসর, তূরস্ক, মিয়ানমার, পাকিস্তান থেকে আমদানি করে চাহিদা পূরণে মেটানো হয়।

গতবছরের মতো এবারো একই সময়ে কোনোরূপ পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। ফলে পেঁয়াজের বাজারে শুরু হয় অস্থিরতা, প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪০- ৫০ টাকা বেড়ে যায় । সাধারন মানুষ নানা সঙ্কটে পরে। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে আসলে পেয়াজ সঙ্কটের সমাধান কোথায় ?

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা ৩০ লাখ টন যার ২৩ লাখ টন উৎপাদন হয়ে থাকে দেশেই। কিন্তু অবব্যস্থাপনা ও সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে কম বেশী ৪/৫ লাখ টন পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। যার অধিকাংশটাই আমদানি করতে হয় ভারত তৈকে। ফলে প্রায় প্রতি বছরই একটা সময় ভারত পেয়াজ রপ্তানী বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশের পেয়াজের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে ।

দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের ৪/৫ লাখ টন পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। সেগুলো যাতে নষ্ট না হয় সেই জন্য যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য হওয়ায় এগুলোর সংরক্ষণের অভাবেই বিশাল একটা অংশ নষ্ট হয়ে যায়। আলু সংরক্ষণে যেভাবে হিমাগার আছে, পেঁয়াজ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত হিমাগার ব্যবস্থা করার বিষয়টা ভাবতে হবে।

নষ্ট হওয়ার হাত থেকে পেঁয়াজ রক্ষা করতে পারলেও, দেশে আরো অতিরিক্ত ৭-৮ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রয়োজন পড়বে । বর্তমানে যতটুকু জমিতে পেঁয়াজ চাষ করা হয়, কৃষকদের উন্নতমানের বীজ প্রদান, সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে এই অতিরিক্ত উৎপাদনে প্রণোদনা এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিতের মাধ্যমে চাষ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এগুলো সঠিকভাবে করতে পারলে কৃষকরাই আরো বেশী ফলন দিতে সক্ষম হবে।

যে কোনো কৃষি পণ্য উৎপাদন স্বয়ংসম্পূর্ণ নির্ভর করে বাজার দরের ওপর। পেঁয়াজের মৌসুমে প্রান্তিক কৃষকেরা পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন। তাই এমনিতেই তুলনামূলক দাম অনেক কম থাকে। তা সত্ত্বেও একই সময়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয়। ফলে দাম আরো কমে যায়।
ন্যায্যমুল্য থেকে বঞ্চিত হন কৃষক। পেঁয়াজ উৎপাদনের কৃষকদের উৎসাহিত করতে সবার আগে ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে হবে । এটি করতে হলে অবশ্যই মৌসুমে পেঁয়াজের আমদানির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা যেতে পারে। দেশে যদি মোট চাহিদার অর্থাৎ ৩০ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন স্বয়ংসম্পূর্ণ সম্ভব হয়, তাহলে আমদানির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করতে হবে। যর ফলশ্রুততে দেশের মানুষ যেমন সহনীয় দামে পেঁয়াজ পাবে, কৃষকরাও সঠিক দাম পাবে।

পেঁয়াজ আমদানি নির্ভরতা কমাতে একটা অনুপ্রেরণা হতে পারে গরু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। ২০১৪ সালে ভারতে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছু দিন পরই গরু রফতানি বন্ধ করে দেয়। ঐতিহাসিকভাবেই ভারত থেকে এ দেশে গরু রফতানি হয়ে আসছিল। এমনকি দেশের কোরবানির গরু বিশাল একটা অংশ আসত ভারত থেকে। হঠাৎ আমদানি বন্ধ হওয়ায় দেশে গরু গোশতের দাম ৫৫০- ৬০০ টাকা হয়ে যায়। কিন্তু বছর দুইয়ের মধ্যেই দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়। দেশে অসংখ্য গরু খামার প্রতিষ্ঠিত হয়, অসংখ্য যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এখন আমরা গরু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ।

ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়া মানেই দেশের মজুদকৃত সব পেঁয়াজ শেষ হয়ে যাওয়া না। ঠিক এ মূহুর্তে দাম বাড়ার প্রধান কারণ অসাধু ব্যবসায়ীদের কালোবাজারি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। দ্রুততম সময়ে বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে। স্থায়ীভাবে পেঁয়াজ উৎপাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে ।

[ লেখক : নির্বাহী সম্পাদক ; দৈনিক আপন আলো, বিশেষ প্রতিবেদক; শ্যামল বাংলা টিভি, সাবেক কাউন্সিলর; বিএফইউজে-বাংলাদেশ ও সদস্য ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ]