শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

0
65


বর্তমান যুগে পড়াশোনা করে সফল হওয়া বলতে যেন সবাই বিসিএস কিংবা মাল্টিন্যশনাল কোম্পানীতে বেশ বড় ডিজিটের স্যালারিকেই বোঝে। যার ফলে প্রতি বছর স্নাতকোত্তর শেষে দেখা যায় বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী বেকার হয়ে হতশায় ভুগছে অথচ হতাশায় না ভুগে নিজের চেষ্টা ও সৃজনশীলতাকে খাটিয়ে একজন সফল মানুষ হওয়া যায় অনায়াসে। এমনি এক চিন্তা থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনমি এন্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী শাম্মী আকতার মিম নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন ও প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে ব্যতিক্রমী  একটি উদ্যোগ। তার বাড়ি নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলায়। করোনাকালীন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় গড়ে তুলেছেন অনলাইন বিজনেস প্লাটফরম ‘রংধনু-Rangdhanu’। যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ধরনের ফুল, সবজি, ঔষধি গাছের বীজ পৌঁছে দেন দেশের বিভিন্ন কোণায়। 

 

 

 

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ যে দেশে কৃষির গুরুত্ব আজ অবধি কখনো কমে তো নি বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভর করে এই কৃষিকাজ ও কৃষি কাজের ফলে উৎপাদিত ফসলের উপর। আর এই ফসলের উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে বীজ ও বীজের গুণগত মানের প্রতি। আর এই বীজের গুরুত্ব উপলব্ধি করে কৃষকদের হাতে ভালো বীজ পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন আমাদের আজকের সফল উদ্যোক্তা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাম্মী আকতার মিম।  

 

শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

 

শুধু ফসলই নয় ফসলের পাশাপাশি বিভিন্ন ফুলের বীজও সরবারহ করছেন শাম্মী আকতার মিম।  এক সময় গ্রামের পুকুর, জলাশয় কিংবা বিলে প্রচুর পরিমাণ শাপলা, শালুক, পদ্ম দেখা যেতো। শহুরে জীবনে সেইসব শাপলা, পদ্ম, শালুক ফুল দেখতে পাওয়া তো দুঃসাধ্য ব্যাপার বটেই বরং গ্রামের পুকুর, জলশায় ও বিলগুলোতেই এখন এইগুলো প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে।  একবার  ভেবে দেখুন তো, যে ফুলগুলো একসময় আপনি বা আপনার মা-বাবা,দাদা-দাদী দেখে বড় হয়েছেন সে ফুলগুলো সকালে ঘুম থেকে উঠার পর যদি দেখেন আপনার বাসার ছাদ বা বেলকনিতে ফুটে আছে তাহলে আপনার অনুভূতিটা কেমন হতো? আমার আপনার  এই অনুভূতির কথা চিন্তা করেই শাপলা, শালুকের বীজ সংগ্রহ করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করেন শাম্মী আকতার মিম। পরে সেগুলো নিজের ফেসবুক পেইজ ‘রংধনু’ এর মাধ্যমে অনলাইনে বিক্রি করেন।

 

শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

   

 

শুধুমাত্র শাপলাই নয় বিভিন্ন ধরনের ফুল, সবজি, ঔষধি গাছেরও বীজ বিক্রি করেন তিনি। চাইলে আপনিও সেই বীজ কিনে নিয়ে আপনার বারান্দায় বা ছাদে ফুটাতে পারেন শাপলা, পদ্মফুল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শৌখিন মানুষজন তার থেকে এসব বীজ সংগ্রহ করছেন। অনেকেই তাদের ছাদে ফুল ফুটাতেও সক্ষম হয়েছেন।

 

 

 

 

তার এই উদ্যোগটির পিছনে তার ছোটবেলার বেশ বড় ভূমিকা রয়েছে। খুব ছোটবেলায়  বাবা-মায়ের এলবামে বাংলা চিত্রনায়ক-নাইকা জুটির একটি বড় ডালিয়া ফুলের বাগানের ছবি যখন দেখতে পান তখন তিনি বোধহয় ৫-৬ বছরের পিচ্চি। সেই সৃষ্টি হওয়া ভালোবাসা যেন বহুগুণে বেড়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠার পর। শুধু তা নয় বাবার ফটোগ্রাফিক এলবামের রঙ্গিন ফুল গুলো  দেখতে দেখতে জন্ম হয় ফুলের প্রতি অগাধ ভালোবাসার। আর সেই ভালোবাসা থেকেই র‍্যাগ ডে তে টি শার্টে ফুল দাগিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে যে কোন ফুল পেলেই যেন তার বান্ধুবীদের মনে হয় তার কথা। আর শেষমেশ পড়াশোনার মাধ্যমেই শুরু হয় পাতা কাটা বর্ণ দেখে গাছ চেনা থেকে গাছের সাথে নতুন বন্ধুত্ব।

 

  

শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

 

গাছ নিয়ে ব্যবসায়িক চিন্তা কখনোই তার ছিল না কিংবা কোন পুঁজি  বা উদ্দেশ্য নিয়েও শুরু করেন নি। তার কাছে থাকা বিলুপ্ত প্রায় অত্যন্ত সুন্দর  কিছু উলট কম্বল নামক ঔষধি গাছের বীজ তার টাইম লাইনে পোস্ট করে সেখান থেকে রাজশাহীর এক আপুর হাত ধরেই শুরু হয় তার আজকের এই রংধনুর সফর। মূলত সবার মাঝে বিলুপ্ত প্রায় গাছগুলো  ছড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে থেকেই শুরু হয় তার এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগের। পরবর্তীতে ৫ মাসে প্রায় সকল প্রকার সবজি/ফলজ ও ঔষধী বীজ গ্রামের বাড়ি এবং কিছু স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করেন। এছাড়া আনকমন কিছু বীজ দেশের বাহির (চায়না/ইন্ডিয়া) থেকেও এনে থাকেন বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে যা নিজে আগে লাগিয়ে  পরীক্ষার পর বিক্রয় করেন। 

 

 

 

মিম বলেন, তার কাছে দেশি তিন ধরনের শাপলার বীজ পাওয়া যায়। একটা আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা যেটা সাদা রংয়ের। বাকি দুটোর মধ্যে একটা নীল যেটা শালুক বলে পরিচিত আর অন্যটা লাল যা রক্তকমল নামে পরিচিত। এসব বীজ স্থানীয় চলনবিল থেকে সংগ্রহ করা যার জার্মিনেশন রেট প্রায় ৯৯%। বাসার ছাদ বা বেলকনিতে খুব সহজেই এই শাপলা ফুল ফুটানো সম্ভব। শাপলা সাধারণত অভিযোজিত শ্রেণির উদ্ভিদ। এরা পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্টেম বৃদ্ধি করে আকার বাড়ায়। আবার পানি কমলে আকারও কমে। ৫ লিটার পানির টবেও এদের রোপন করা যায়। তবে ফুল হবে ছোট। আর এর স্বপক্ষে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ ডেইলি বাংলাদেশ অনলাইন পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে যুক্তি দেন যা একটি বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ও অদ্বিতীয় ভূমিকা পালন করে।  

 

শাম্মী আকতার মিম ও তার রংধনুর গল্প

 

  

 

আবার সবার প্রয়োজনে কিছু কীটনাশক, সার ও বাগান সামগ্রীও  তিনি বিক্রি করে থাকেন ।সবার ভালোবাসা,ভালো রিভিউ ও ব্যবসায়িক জীবনে ছোটদের ভালোবাসা তাকে অনুপ্রেরণা যোগায় ও  প্রশান্তি দেয়।সারা দেশের সকল শ্রেণীর মানুষসহ  বিভিন্ন উপজাতি এবং পার্শ্ববতী দেশ ভারত থেকেও আমাদের দেশি শাপলার জন্য অর্ডার পেয়ে থাকেন মিম।বীজ বিক্রি করেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেন না বরং বীজ বপন থেকে চারা তৈরিকরণ ও বিভিন্ন প্রয়োজন ক্রেতাদের সাথে তার যোগাযোগ রাখেন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। ভার্সিটির বন্ধুবান্ধব এবং টিচার্স কোয়ার্টার (শিক্ষক/শিক্ষাকা) থেকে যখন অর্ডার আসে তখন তার  নিজেকে সবচেয়ে সুখী মনে হয়।

 

 

 

 

ভবিষ্যতে পেজের অর্থের একটা অংশ দিয়ে গরিব-দুঃখী মানুষের আঙ্গিনায় ফলজ গাছ লাগানোর ইচ্ছেও রয়েছে তার।বাগান করা ও বাগানকে একটু ভিন্নধর্মীভাবে সুন্দর করে গড়ে তোলার উপর একটা বই প্রকাশেরও খুব ইচ্ছে আছে তার।পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের বেশি দামে বিক্রি করা বীজ থেকে কাঙ্খিত গাছ  না পাওয়ার ছবিটিও বদলে দিতে চান তিনি। সঠিক নিয়ম মেনে বীজ প্রক্রিয়াজাত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাই সেই গুনগত বীজ প্যাকেটজাত করে সেরা পণ্য সরবরাহ করার ইচ্ছেটা তো রয়েছেই। কিন্তু এই বিভিন্ন কালার গাছ তৈরি করতে তাকে মাঝে মাঝে পার্শ্ববতীদেশ চীন বা ভারত থেকে বীজ আমদানি করতে হয়। বীজ গুলো যদি দেশেই পাওয়া যেত তবে তার এই সুপ্ত ইচ্ছে গুলো যেন আরো প্রকটভাবে  বাস্তবেই রুপান্তরিত করা যেত।এভাবে যদি প্রতিটি তরুণ নিজেদের ছোট ছোট শখ গুলো নিয়ে সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারে তবে তারাও শাম্মী আকতার মিমের মত একদিন সফল উদ্যোক্তা হবেন আর বিভিন্ন ধরনের হতাশা থেকে পরিত্রাণ পাবেন।

 

 

You can check our other blogs here: https://ysseglobal.org/blog/nadir-on-the-go-দ্যা-ভ্রমণ-পিপাসু/

Author

Mahmuda Sultana 

Intern, Content Writing Department  

YSSE



Source link