শামীম, সাখাওয়াতের পর তৈমুরের হার— না.গঞ্জে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আইভী

92


ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

নারায়ণগঞ্জ: সিটি করপোরেশন গঠন হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে এটি তৃতীয় নির্বাচন। তিন নির্বাচনেই শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। বাকিরা বদলেছেন। একবার শামীম ওসমান, একবার অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত, একবার তৈমুর আলম খন্দকার। প্রতিদ্বন্দ্বী বদলালেও ভোটের চূড়ান্ত ফল বদলানো সম্ভব হয়নি। তিন নির্বাচনেই বড় ব্যবধানেই জয়ী নাম একটিই— আইভী।

রোববার (১৬ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) তৃতীয় নির্বাচন। তাতে ৬৯ হাজারেরও বেশি ব্যবধানে জয় পেয়েছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ নিয়ে এই সিটি করপোরেশনে তিনটি নির্বাচনের তিনটিতেই জয় পেলেন আওয়ামী লীগের এই প্রার্থী।

প্রাচ্যের ড্যান্ডি হলো সিটি করপোরেশন

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জ একসময় ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ নামে খ্যাত ছিল। প্রায় দেড় শতাব্দী আগে ১৮৭৬ সালেই পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করে এই শহর। ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা ও কদমরসূল পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে ২৭টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠন করা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। এটি বাংলাদেশের সপ্তম সিটি করপোরেশন। আয়তন ৭২ দশমিক ৪৩ বর্গ কিলোমিটার। এই সিটিতে প্রথম প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয় শাহ কামালকে। ওই বছরেরই ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জে প্রথম বারের মতো সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আরও পড়ুন-

শামীম, সাখাওয়াতের পর তৈমুরের হার— না.গঞ্জে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আইভী

বিদ্রোহী হয়েও জয়ী আইভী

পৌরসভা থাকাকালে নারায়ণগঞ্জের দুই মেয়াদের চেয়ারম্যান ছিলেন আলী আহম্মদ চুনকা। তার মেয়ে আইভীও বাবার পথ ধরে আসেন রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগকেই দল হিসেবে বেছে নেন তিনি। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচন ছিল নির্দলীয়। সেবারে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী দাবি করলেও ভোটে দলীয় সমর্থন পাননি আইভী। সেবারে আওয়ামী লীগের সমর্থন ছিল শামীম ওসমানের পক্ষে। ওই নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তৈমুর আলম খন্দকার। বিএনপি তাকেই সমর্থন দিয়েছিল।

২০১১ সালের আলোচিত সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকায় শামীম ওসমানকেই সম্ভাব্য বিজয়ী ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। তৈমুর আলম খন্দকারও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারবেন বলে ধারণা করেন অনেকে। কিন্তু সেনা মোতায়েন না হওয়াকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে ভোট শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে নির্বাচন বর্জন করেন তৈমুর। তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত হয়ে পড়ে আইভী ও শামীম ওসমানের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত শামীম ওসমান সেবার ৭৮ হাজার ৭০৫ ভোট পান। অন্যদিকে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে আইভী ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়ে ১ লাখ ১ হাজার ৩৪৩ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে নারায়ণগঞ্জের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন আইভী।

দ্বিতীয় জয় নৌকা নিয়ে

২০১৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ভোট হয় নারায়ণগঞ্জ সিটিতে। এর আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধি বদলে যাওয়ায় এবারে নির্বাচন হয় দলীয় প্রতীকে। সম্ভাব্য অনেকেই মনোনয়ন পেতে মুখিয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগ এবারে মনোনয়ন তুলে দেয় এই সিটির প্রথম মেয়র আইভীর হাতে।

এই নির্বাচনে বিএনপি তৈমুর আলম খন্দকারকে মনোনয়ন দিতে আগ্রহী হলেও তিনি ভোট করতে রাজি হননি। পরে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেয় বিএনপি।

প্রার্থী বদলালেও ফল বদলায়নি। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে সাখাওয়াত পান ৯৬ হাজার ৪৪ ভোট। অন্যদিকে নৌকা নিয়ে আইভী পান ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬১১ ভোট। তাকে ৭৯ হাজার ৫৬৭ ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র নির্বাচিত হন আইভী।

কাকা তৈমুরকে হারিয়ে হ্যাটট্রিক জয়

২০২১ সালের শেষ দিকে এসে ফের দেশব্যাপী আলোচনায় উঠে আসে নারায়ণগঞ্জ সিটির নির্বাচন। তৃতীয় এই নির্বাচন ঘিরেও দলীয় প্রার্থিতা নিয়ে ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। তবে আগের দুইবারে ভোটে জয় পাওয়া আইভীর ওপরেই ভরসা রাখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপি গত বছরই এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সব ধরনের নির্বাচন বর্জন করায় কোনো প্রার্থী দেয়নি। ফলে নাসিকে ভোট একপেশে হওয়ার সম্ভাবনাই তৈরি হচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত তা হয়নি তৈমুর আলম খন্দকারের কারণে। বিএনপি প্রার্থী না দিলেও দলটির চেয়ারপারসনের এই উপদেষ্টা নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। তৈমুর নাসিকের প্রথম নির্বাচনে ভোট থেকে সরে না দাঁড়ালে জিততেন বলেই এখনো দাবি করেন। এর সঙ্গে এবারের নির্বাচনে শামীম ওসমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। সব মিলিয়ে তৈমুর আলমের সঙ্গে আইভীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রত্যাশায় ছিলেন অনেকেই।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য লড়াই আর হাড্ডাহাড্ডি হয়নি। আগের দুই নির্বাচনের তুলনায় ব্যবধান কমলেও বলতে গেলে সহজ জয়ই পেয়েছেন আইভী। তার ঝুলিতে গেছে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৩ ভোট। আর আইভীর বাবা চুনকার সঙ্গে রাজনীতি করার কারণে যে তৈমুরকে ‘কাকা’ হিসেবেই সম্বোধন করেন আইভী, সেই তৈমুর এবার পুরোটা সময় নির্বাচনে থেকে পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৭১ ভোট। ‘ভাভিজি’ আইভীর কাছে তিনি হেরে গেছেন ৬৯ হাজার ১০২ ভোটের ব্যবধানে।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বেসরকারি ফলঘোষণার পর তৈমুর তার পরাজয়ের জন্য দায়ী করেন ‘ইভিমের কারচুপি’ আর ‘প্রশাসনের ইঞ্জিনিয়ারিং’কে। অন্যদিকে আইভী জয়ের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘কাকা’ তৈমুর নির্বাচনে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেগুলোও বাস্তবায়ন করবেন তিনি।

সিটির আগেও নারায়ণগঞ্জেরনগরপিতা ছিলেন আইভীই

বাবা আলী আহম্মেদ চুনকা নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মেয়ে আইভী রাজনীতিতে নাম লেখানোর পর ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হন। সেই নির্বাচনে জিতে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন আইভী। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন ঘোষণার আগ পর্যন্ত সেই পদেই ছিলেন তিনি। সে হিসাবে টানা ১৮ বছর নারায়ণগঞ্জ সিটির দায়িত্বে রয়েছেন আইভী। ফের পাঁচ বছরের জন্য পেলেন একই দায়িত্ব। আইভীকে তাহলে নারায়ণগঞ্জ নগরের অপ্রতিদ্বন্দ্বী জননেতা বলা যেতেই পারে।

সারাবাংলা/টিআর





Source link