লোভের জিহ্বা কেটে ফেলা হবে বলে কঠোর হুশিয়ারী দুদকের

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ লোভের জিহ্বা কেটে ফেলবেন বলে দুর্নীতিবাজদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। দুর্নীতিবাজদের লজ্জা ফেরাতে সুশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষ এখন অর্থের পিছনে ছুটতে লজ্জা পায় না।

দুর্নীতি প্রতিরোধে নতুন প্রজন্মের ধারণা ও সৃজনশীল পরামর্শ জানতে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন দুদক চেয়ারম্যান।

!-- Composite Start -->
Loading...

আজ রবিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের কৌশলপত্র ২০১৯’-এর ওপর পরামর্শমূলক মতবিনিময় সভাটি হয়।

সূচনা বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ শিক্ষার্থীদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সবচেয়ে যোগ্য ও মেধাবী সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘কমিশনের কর্মকৌশল প্রণয়নে সর্বপ্রথম আপনাদের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে। আমরা আপনাদের কাছ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধে নতুন ধারণা, সৃজনশীল আইডিয়া এবং সর্বোপরি কর্মপন্থা গ্রহণ করতে চাই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধি তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়ার এ জাতীয় মতবিনিময় সভা এটাই প্রথম।’

দুদক চেয়ারম্যানের সূচনা বক্তব্যের পর কথা বলেন মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামান্না রিফাত আরা বলেন, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন কোনো পদ্ধতি নেই, যার সাহায্যে দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সাইদুর রহমান অপরাধীদের দ্রুত বিচার করা না গেলে অপরাধ দমন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন। তিনি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ারও সমালোচনা করেন।

খাদ্যে ভেজালসংক্রান্ত দুর্নীতির কথা বলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিরা রহমান। ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা এ দুর্নীতি করছে এবং তারাই নিরাপদ খাদ্যের জন্য হুমকি বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. ফারুক হোসেন বলেন, কৃষি ভর্তুকির অর্থ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পোঁছানোর আগেই বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি সংঘটিত হয়।

দুর্নীতিকে একটি চেইন অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেন আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান মিয়া। তিনি বলেন, ‘নিচের দিকের কর্মকর্তারা জানেন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও দুর্নীতিপরায়ণ, তাই দুর্নীতি করলে কিছু হবে না ভেবে উৎসাহিত হন তারা। আমরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি কি না এটি বড় প্রশ্ন।’

পদ্ধতিগত কারণেই দুর্নীতি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সম্পা গুহ।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামস আসিফ চৌধুরী স্কুল পর্যায়ে দুদকের সততা সংঘের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এথিকস ক্লাব গঠনের পরামর্শ দেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্পিতা মহাজন আইনি সংস্কার ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মত দিয়ে বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও তাৎক্ষণিক ফল চাই।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী টোটন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘দুর্নীতি যারা করেন তাদের ভয় ও লজ্জা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগে বলা হতো অর্থ সব অনর্থের মূল। এখন অর্থই সব। অনেক সময় মানুষ অর্থের পিছনে ছোটে। এটাতে তারা এখন আর লজ্জা পায় না।’

‘দুর্নীতিবাজদের লজ্জা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা। মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষা ও উন্নয়নের প্রয়োজন। দুদককে ভয় পায় না এমন লোক হয়তো সমাজে নেই। তবে ভয় দিয়ে সবকিছু জয় করা যায় না।’ বলেন দুদক চেয়ারম্যান।

দুর্নীতিবাজদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘লোভের জিহ্বা কেটে ফেলা হবে। এবার ৬৩ শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছে। তবে আমরা এখনো কাক্সিক্ষত মাত্রায় দুর্নীতি কমাতে পরিনি। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

সব ধরনের দুর্নীতি দুদকের ম্যান্ডেটভুক্ত নয় বলে জানান দুদক চেয়ারম্যান। দ-বিধির কতিপয় ধারা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জন দুদকের তফসিলভুক্ত। দুর্নীতির উৎস বন্ধে সরকারের কাছে সুপারিশ করার আইনি দায়িত্ব দুদকের রয়েছে। কমিশন স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধ ও যৌনহয়রানি রোধে বিভিন্ন সুপারিশ সরকারের কাছে পাঠিয়েছে বলে জানান তিনি।

রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া পুরোপুরি দুর্নীতি দমন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন দুদক চেয়ারম্যান। দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একদিন বা এক বছরে দুর্নীতি থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই। ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় দুর্নীতি অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।’

দুদক চেয়ারম্যান দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে শিক্ষাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন, ‘৭৫ শতাংশ ফেল করা শিক্ষার্থীদের প্রমোশন দিয়ে মানসম্মত শিক্ষাকে কলুষিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশকে ২০৩০ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পেতে হলে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, এটা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে।’

মতবিনিময় সভায় দুদক কমিশনার এ এফ এম আমিনুল ইসলাম জানান, দুর্নীতি দুটি পর্যায়ে বেশি হয়। একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপরটি ব্যক্তি পর্যায়ে। প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দুর্নীতি অবশ্যই কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে কিন্তু রোগেীদের তা দেওয়া হচ্ছে না। যথাযথ মনিটরিং থাকলে রাগীর কাছে ওষুধ পৌঁছাত।

দুর্নীতি ঠেকাতে পদ্ধতিগত সংস্কারের কার্যক্রম চলছে জানিয়ে দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, সিটিজেন চার্টার, ই-টেন্ডারিং পদ্ধতি, ক্রয় নীতিমালা সবই পদ্ধতিগত সংস্কারের অংশ।

মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.