মানবপাচারকারী জামিল হোসাইন গ্রেফতার – DesheBideshe

0
106

ঢাকা, ০৯ মার্চ – রাজধানীর বনানীতে মাস-বাংলা ওভারসিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সম্প্রতি র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) হাতে গ্রেফতার হন মো. জামিল হোসাইন (৫১) নামে এক মানবপাচারকারী। র‌্যাব বলছে, ভয়ানক রকমের প্রতারক ও মানবপাচারকারী জামিল। তিনি বিভিন্ন দেশে চাকরি দেয়ার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত ৪০০ লোকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এমনকি মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল বলেও জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন জামিল।

তার প্রতারণার ধরন সম্পর্কে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভুয়া ই-মেইল আইডি থেকে নিজের ই-মেইলে পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে চাকরির কথিত চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) পাঠাতেন জামিল। সেই ভুয়া চাহিদাপত্র দেখিয়ে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের ভারতে পাঠাতেন তিনি। এরপর ভুয়া কাগজপত্রের কারণে যখন ভারতে পোল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস আগ্রহীদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করতো, তখন উল্টো ভুক্তভোগীদের ওপর দোষ চাপিয়ে গ্রেফতার জামিল বলতেন, সেখানে গিয়ে তারা (আগ্রহীরা) নাইটক্লাবে মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করায় এবং মদ খাওয়ার কারণে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়েছে, ফলে গন্তব্য দেশের ভিসা পাননি তারা।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি র‍্যাবের বিশেষ অপারেশন টিমের হাতে পাকড়াও হওয়ার সময় জামিলের কাছ থেকে ১০টি পাসপোর্ট, বিভিন্ন দেশের ভুয়া চাহিদাপত্র ও ওয়ার্ক পারমিট ভিসার ফটোকপি এবং বিভিন্ন নামের সিল জব্দ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামিলের টার্গেট ছিল সাধারণ ও নিরীহ মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি তার ম্যানেজার পন্টু সাংমা পল এবং দেশি-বিদেশি দালালদের সহযোগিতায় বিভিন্ন দেশের ভুয়া চাহিদাপত্র ও ভুয়া বিজ্ঞাপন তৈরি করে সেসবের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারিত করছিলেন। পোল্যান্ড, জাপান, চীন, মাল্টা, ক্রোয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, রোমানিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নাম করে লোকজনের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এছাড়া অনেককে ভারতে নিয়ে আটকে রেখে তাদের পরিবারের লোকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করছিলেন জামিল। মাস-বাংলা ওভারসিজের বনানীর কার্যালয় ছিল এসব প্রতারণার মূল কেন্দ্র।

আরও পড়ুন : পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী গোলজারের যত সম্পদ

জামিলের কথায় ভুলে পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে মালয়েশিয়ায় যেতে চেয়েছিলেন মোহাম্মদ হোসেন বিপ্লব, মো. ফারুক হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান ও মো. রাব্বী। জনপ্রতি তিন লাখ টাকা করে দিলে জামিল তাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন বলে কথা হয়। কিন্তু দফায় দফায় টাকা দিলেও মালয়েশিয়ার বিমানে চড়া তো দূরের কথা, ভিসাই হাতে পাননি তারা।

ভুক্তভোগী মোহাম্মদ হোসেন বিপ্লব বলেন, ‘জামিল আমাকে জানায়, জনপ্রতি তিন লাখ টাকা দিলে মালয়েশিয়া যাওয়া যাবে। সঙ্গে পাসপোর্ট ও ভিসা বাবদ দিতে হবে আরও দেড় লাখ। সেই মোতাবেক ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জামিলের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দেই। এর কিছুদিন পর আরও টাকা দাবি করলে ওই বছরের এপ্রিলের ২৫ তারিখ এক লাখ এবং মে মাসের ১৫ তারিখে আরও এক লাখ টাকা দেই। দেড় বছর ধরে দফায় দফায় টাকা দেয়ার পরও ভিসার কথা জানতে চাইলে সে বলে, বাকি টাকা দিলে ভিসা দ্রুতই হয়ে যাবে। এরপর ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর দুই লাখ ২০ হাজার ও ৯ ডিসেম্বর আরও আরও ৮০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেই। কিন্তু এতেও ভিসার দেখা মেলে না।’

তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রলোভনে প্রতারক আমাদের পাঁচজনের কাছ থেকে মোট ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এমনকি সে আমাদের পাঁচজনের পাসপোর্ট হাতিয়ে নেয়। এরপর তার কাছে টাকা ফেরত চাইতে গেলে সে তা ফেরত না দিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। কিছুদিন পর নিরুপায় হয়ে র‍্যাব-৩-এ অভিযোগ দাখিল করি।’

আরেক ভুক্তভোগী মো. হাবিবুর রহমান শামীম। তিনি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বনানী থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে জামিলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় উল্লেখ করেন, তিনি একজন ছাত্র। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ঘোচাতে যেতে চেয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। এরপর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে জামিলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রতারক জামিল তার অফিসে যাওয়ার কথা বললে শামীম সেখানে যান। তখন জামিল বলেন, তার কাছে উচ্চ বেতনের চাকরি আছে। আট ঘণ্টা ডিউটি, ওভারটাইম দুই ঘণ্টা সপ্তাহে ছয়দিন। থাকা-খাওয়া ফ্রি।

জামিলের এমন প্রলোভনে মীম পোল্যান্ড যাওয়ার জন্য রাজি হন। সেজন্য ছয় লাখ ৯৫ হাজার টাকা চান জামিল। দফায় দফায় টাকা দেয়ার পর ভারতের কলকাতা হয়ে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয় শামীমকে। ভারতে অবস্থানরত ওই প্রতারকের সহযোগীরা কথিত সাক্ষাৎকারের জন্য তাকে নিয়ে যান সেখানে অবস্থিত পোল্যান্ডের দূতাবাসে। সাক্ষাৎকার দেয়ার এক সপ্তাহ পরে ভারতের দালালরা শামীমকে জানান, সাক্ষাৎকারে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।

পরে শামীম জানতে পারেন, ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে তাকে ভারতে নিয়েছেন প্রতারকেরা। তখন তাকে হোটেল থেকে বের হতে না দিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। তার কাছে থাকা ভারতীয় ৮৫ হাজার রুপি দালালেরা নিয়ে নেন। একপর্যায়ে তিনি হোটেল থেকে পালিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফিরে আসেন।

শামীম জানান, মানুষের অসহায়ত্ব ও বেকারত্বকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ, মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও ওয়ার্ক পারমিট দেখিয়ে উচ্চবেতনে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন জামিলের দালালেরা।

আরও পড়ুন : রেহেনাকে হত্যার পর ঘরের মধ্যেই ৩ টুকরা করেন স্বামী

এ বিষয়ে র‌্যাব-৩ সহকারী পরিচালক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বীণা রানী দাস বলেন, ‘রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে অফিস খুলে বিদেশে পাঠানোর নামে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতেন জামিল হোসাইন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জামিলকে গ্রেফতার করা হয়। ১০-১২ জন ভুক্তভোগীকে পোল্যান্ড পাঠানোর কথা বলে ভারতে নিয়ে যান তিনি। ওই ভুক্তভোগীরা মানবপাচার আইনে মামলা করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার জামিল পোল্যান্ডের একজন উদ্যোক্তা সেজে ভুয়া ইমেইল আইডি থেকে নিজেকে নিজের ইমেইলে ডিমান্ড লেটার দিতেন। সেই ভুয়া ডিমান্ড লেটার বের করে বিদেশ গমনেচ্ছুদের ভারতে পাঠান। এরপর যখন ভারতে তাদের ভুয়া ডিমান্ড লেটার বাতিল হয়ে যেতো, তখন ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো দোষ চাপিয়ে জামিল বলতেন- ভারতে গিয়ে তারা নাইটক্লাব, মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করা ও মদ খাওয়ায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিপোর্ট দিয়েছে, যার কারণে পোল্যান্ডে যাওয়ার ভিসা পাননি তারা।’

এলিট ফোর্সের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘জামিলের অফিসে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদসহ দেশি-বিদেশি অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ছবির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে গ্রেফতার প্রতারক জামিলের সম্পর্ক আছে এবং মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে তিনি ব্যবসা করেছেন বলেও র‍্যাবের কাছে দাবি করেন। এমনকি প্রতারিতরা তার বিরুদ্ধে মামলা করলে জামিল উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে হয়রানির মামলা করেন। তিনি প্রতারণার মাধ্যমে ৪০০ ভুক্তভোগীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।’

মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে র‍্যাব, জানতে চাইলে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে র‍্যাব। মানবপাচার প্রতিরোধে ঢাকাসহ সারাদেশে র‍্যাবের মনিটরিং টিম রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং মানবপাচারকারীরা আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও আধুনিকায়ন করেছে সরকার।’

মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে নেয়া ব্যবস্থার কথা জানতে চাইলে সিআইডি ঢাকা মেট্রোর অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, ‘সিআইডি মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা নেয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের সোর্স নিয়োগ করা আছে, তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনেক সময় অভিযান চালানো হয়। যারা ভুক্তভোগী তারাও অনেক সময় সরাসরি আমাদের কাছে এসে অভিযোগ দেয়। তাদের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিআইডি এতটুকু পর্যন্ত কাজ করতে পারে। এছাড়া ভুয়া ম্যানপাওয়ার মনিটরিং করার জন্য আলাদা সংস্থা রয়েছে।’

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ০৯ মার্চ

Source link