মাদ্রাসায় মুুক্তিযুদ্ধের গল্প ফেরি করেন জিনাত সোহানা

0
105

চট্টগ্রাম, ০৮ মার্চ – অনেক নারীই নিরিবিলি জীবনযাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতার অজুহাতে এবং কেউ নিরাপত্তার অজুহাতে নিজেকে গুটিয়ে রেখেই স্বস্তি পান।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে। যারা বাধাকে ডিঙিয়ে আনন্দ পান, প্রতিবন্ধকতা জয় করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে চান। কেউ যদি আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, সমাধান আছে- এমন ধারণা নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, তাহলে সে কাজটি পারবেই।

এমনই একজন অদম্য সাহসী নারী অ্যাডভোকেট জিনাত সোহানা চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে জাতীয় সংগীত ও জয় বাংলা শ্লোগানের প্রচলন সৃষ্টিতে অনেকটাই সফল হয়েছেন।

আরও পড়ুন : প্রবাসী তোতা হত্যা মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড

জিনাত সোহানা চৌধুরীর মতে, মফস্বলে কিংবা শহরে বসবাসরত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের অনেক শিশুরই পড়ালেখার শুরুটা হয় ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে৷ পরবর্তীতে এই শিশুদের এক অংশ চলে যায় স্কুলে, আরেক অংশের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শুরু হয় মাদ্রাসাতে৷ নিজেদের নয়, অভিভাবকের আকাঙ্ক্ষায় বদলে যায় তাদের চাওয়া-পাওয়া, সুযোগ সুবিধাগুলো৷ ফলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় সংগীত চর্চার প্রচলন যেমন নেই, তেমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে কোনও ধারণা নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করে না অভিভাবক, শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীদের কেউই।

‘বন্দি জীবনে আটকে যায় এসব শিশুর উড়ন্ত শৈশব৷ যে সময়টা পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার, আনন্দে কাটানোর, সেই সময়টায় কঠিন এক জীবন আবদ্ধ করে ফেলে এসব মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের। অন্য কোনও বিনোদন তো দূরে থাক, তার দৈনন্দিন রুটিন থেকে জাতীয় সংগীত বলে শব্দটিই নাই হয়ে যায়। চার দেওয়ালের বাইরে বের হওয়াও নিষিদ্ধ৷ মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যেখানে দৌড়াদৌড়ি, উচ্চ শব্দে হাসাহাসিও বারণ সেখানে জাতীয় সংগীত গাওয়া তো কল্পনার বাইরে। ফলে জাতীয় সংগীত, জয় বাংলা শ্লোগান, মুক্তিযুদ্ধের গল্প-ইতিহাসের চর্চা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে কল্পনার বাইরে’।

জিনাত সোহানা চৌধুরী আইন পেশার পাশাপাশি সুচিন্তা ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামের বিভাগীয় সমন্বয়ক। নির্যাতিত নারীদের অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ জানানোর মধ্যে তার কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। কাজ করেছেন চট্টগ্রামের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশপ্রেম জাগানোর মহান ব্রত নিয়ে।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মাঝে জাতীয় সংগীত প্রচলনের এমনই একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন জিনাত সোহানা চৌধুরী। তিনি বলেন, বাঙালি-বাঙালির জাতীয় সংগীত, বাংলাদেশের ইতিহাস, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের দিকদর্শন; এসব কিছু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো যতটা সহজ, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া ততটাই কঠিন। দেশপ্রেম ও জাতীয় সংগীতের অতিজাগরণে জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী পর্যায়ে সুনাগরিক হিসেবে সৃষ্টি হতে পারে বাঙালির এক দীপ্ত নতুন পরিচয়। তাই জঙ্গিবাদবিরোধী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীর সীমানায় বাঙালি জাতিসত্তার গৌরব ছড়াবে এমন স্বপ্ন দেখছেন জিনাত সোহানা।

তার মতে, দেশের নানা প্রান্তে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সব ধরনের নিপীড়ন ও বৈষম্য বিলোপের পাশাপাশি তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। এসব শিক্ষার্থীদের কাছে দেশপ্রেম তৈরির এ আন্দোলনের শুরুটা করেছি ব্যক্তিজীবন থেকে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক প্রতিরোধে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালিয়েছি প্রচারণা। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কখনও বাজেনি জাতীয় সংগীত সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমবেত করে বাজিয়েছি জাতীয় সংগীত। চট্টগ্রামের বিভিন্ন মাদ্রাসার মাঠে একঝাঁক শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছে জাতীয় সংগীত। তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে এ সময় কণ্ঠ মেলায় শিক্ষকরাও। একে একে শুনিয়েছে দেশের গান, হামদ ও নাত। চট্টগ্রামের মাদ্রাসাগুলোতে এমন বিরল দৃশ্যের পটভূমি রচনা করেছেন জিনাত সোহানা চৌধুরী।

সুচিন্তা ফাউন্ডেশন এর হয়ে তিনি লড়ছেন জঙ্গিবাদ নির্মূলে, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ এমন সুরে মেতে উঠেছেন কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও। তাদেরকে শপথ বাক্য পড়িয়েছেন জঙ্গিবাদে না জড়ানোর। চট্টগ্রামের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- যেখানে কখনো ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারিত হয়নি, জাতীয় সঙ্গীত যেখানে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ, ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে শিক্ষা নেওয়া যারা মেনে নিতে পারেন না, সেইসব কওমি মাদ্রাসায় জয় বাংলা ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প ফেরি করে বেড়িয়েছেন দুঃসাহসী এই নারী। শুধু কওমি মাদরাসা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মাদরাসায়ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের গল্পগাঁথা নিয়ে নিয়মিত হাজির হয়েছেন তিনি।

নারীত্বের বাধা জয় করে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের তিনি শোনান বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের গল্প। তার দীপ্ত পদচারণায় ‘আমার সোনার বাংলা’ গান আর জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয়েছে শত শত মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন সমাবেশের আয়োজন করে এসব সমাবেশে তিনি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের গল্প আলোচনা করেন, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় কুসংস্কার নিয়ে কথা বলেন। জাতীয় সঙ্গীত, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ভুল ধারণা ছিল সেসব তিনি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন আজও।

সূত্র : বাংলানিউজ
এন এইচ, ০৮ মার্চ

Source link