মাংস খান, তবে নিয়ম মেনে

333


ডা. ঐন্দ্রিলা আক্তার

কুরবানির ঈদ মানেই মাংস খাওয়ার আয়োজন। গরু, খাসি, উট কুরবানি করে মাংস বিলিয়ে নিজেরাও ঈদের দিন থেকে শুরু করে প্রায় সাতদিন ধরে চলতে থাকে নানান রকম রান্না করে মাংস খাওয়ার মহা উৎসব। গরু, খাসি, উট এ ধরনের প্রাণীর মাংসগুলোকে রেড মিট বলে। রেড মিটে জমাট বাঁধা অবস্থায় অনেক চর্বি থাকে। স্বাস্থ্যের জন্য এই চর্বির ভালো দিক যেমন আছে তেমনি রয়েছে নানা রকম স্বাস্থ্য ঝুঁকি। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য, সুস্থভাবে দৈনন্দিন শারীরিক এবং মানসিক কাজগুলো করার জন্য খাবার খেতে হয়। কারণ খাবার থেকেই আমরা প্রয়োজনীয় শক্তি পেয়ে থাকি। খাদ্যবিজ্ঞানে এই শক্তিকে ক্যালোরি বা কিলোক্যালরি বলা হয়। সবার প্রতিদিন একই পরিমাণ ক্যালরী বা শক্তি দরকার হয় না। আমাদের প্রতিদিন কতটুকু ক্যালরী বা শক্তি খাবার থেকে প্রয়োজন তা নির্ভর করে বয়স, উচ্চতা, পেশা, নারী-পুরুষ-শিশু, শারীরিক অবস্থা এবং লাইফস্টাইলের উপর।

জীবনযাপনের ধরণের উপর নির্ভর করে সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রতিদিন ১৬০০-২৪০০ ক্যালরি প্রয়োজন হয়। আর পুরুষদের ২০০০-৩০০০ ক্যালরি দরকার হয়। একটি বাচ্চার প্রতিদিন ১০০০ ক্যালরি, আর বয়সন্ধিকালের বাচ্চাদের প্রয়োজন হয় ৩২০০ ক্যালরি এবং যুবকদের জন্য ২০০০-২২০০ ক্যালরি দরকার। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে পুষ্টির চাহিদা এবং মেটাবলিজম কমতে থাকে এবং কাজের চাপও কমে যায় তাই ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ এবং প্রয়োজনও কমতে থাকে।

যারা প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে কাজ করেন তারা সাধারণত যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করেন সে অনুপাতে তা খরচও করেন। কিন্তু যারা সারাদিন চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করে বা শুয়ে বসে জীবন কাটায় তাদের ক্যালরি গ্রহণ এবং খরচের মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। অর্থ্যাৎ এ ধরনের জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষের শরীরে বাড়তি ক্যালরি চর্বি হিসেবে জমতে থাকে যা ওজন বাড়ানো থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, হার্টের অসুখসহ নানা ধরনের জটিল রোগ সৃষ্টি করে। তাই ঈদের সময় যতই মাংস খাওয়ার উৎসবে মাতি না কেন স্বাস্থ্যের কথাও মাথায় রাখতে হবে। আসুন জেনে নেই কোরবানির ঈদে কোন নিয়ম মেনে মাংস খেলে মাংস খাওয়ার তৃপ্তিও মিটবে আবার শরীরও খারাপ হবে না।

গরুর মাংস এবং অন্যান্য রেড মিট রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও জিঙ্ক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য উপাদানে ভরপুর রেড মিট পরিমিত খেলে স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যাবে কিন্তু শুধু মুখের স্বাদ মেটানোর জন্য পরিমাণের এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেলে অসুস্থ হয়ে ঈদের আনন্দ নষ্ট যাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে।

ঈদে যে নিয়মে মাংস খেলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো যাবে আসুন জানি সে উপায়গুলো-

১. চর্বি বাদ দিয়ে মাংস খাবেন যেভাবে
মাংস থেকে চর্বি কেটে আলাদা করে ভালো করে ধুয়ে নিয়ে তারপর কিছুক্ষণ সিদ্ধ করে জ্বাল করা পানি ফেলে দিলে পানির সঙ্গে মাংসের ভাজে ভাজে জমে থাকা ঘন চর্বি বের হয়ে যায়। এতে করে জমাট বাঁধা চর্বি অনেকখানি কমে যায়। এবার পেঁপে বা জালি কুমড়া দিয়ে ঝোল করে বা ভূনা করে একটি সুস্বাদু মাংসের রেসিপি রান্না করা যেতে পারে। এইভাবে প্রসেস করে রান্না করা মাংস ঈদের দিনে গ্যাস্ট্রিক, আলসার, উচ্চ-রক্তচাপের রোগিরা পরিমাণ মত খেতে পারেন।

২. সুস্বাদু মাংস রাধুন অতিরিক্ত তেল ছাড়াই
মাংস রান্নার সময় বাড়তি তেল না দিয়ে বরং মাংসের ভেতরে থাকা চর্বি দিয়েই খুব সুস্বাদু উপায়ে মাংস রান্না করা যায়। টক দই, লেবুর রস বা ভিনেগার দিয়ে মাংস মেখে দশ থেকে বিশ মিনিট রেখে তারপর রান্না করলে মাংস নরম হয়। আবার সুস্বাদুও হয়। রেড মিটে প্রচুর চর্বি থাকার কারণে বাড়তি তেল দেয়ার প্রয়োজন হয় না। আগুনের তাপে মাংসের ভেতরে জমাট বাঁধা চর্বি গলতে শুরু করে এবং সেই চর্বিই রান্নার সময় তেলের কাজ করে।

৩. মাংসের সঙ্গে ভাত/রুটি বাদ, যোগ করুন সালাদ
যাদের ডায়াবেটিস এবং হার্টের অসুখ আছে তারা মাংসের সঙ্গে ভাত বা রুটি কম খাবেন। আমাদের খাবার প্লেটে সাধারণত ভাতের পরিমাণ বেশি থাকে। এক কাপ পরিমাণ ভাত বা দুইটি রুটির সাথে মাংস খাওয়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই সাথে সালাদ খাবেন। সালাদে থাকা ফাইবার মাংসের মধ্যে থাকা অতিরিক্ত ফ্যাট শরীরে জমাট বাঁধতে দিবে না।

৪. দুপুরের পর অতিরিক্ত মাংস না খাওয়াই ভালো
মাংস দিয়ে বানানো বিভিন্ন মজাদার মেন্যুগুলো সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে খেয়ে নিবেন। কেননা এসময় আমরা হাঁটাচলা করি। ফলে শরীর থেকে ক্যালরি খরচ হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে কুরবানির দিন অনেকসময়ই মাংস আসতে আসতে ও রান্না হতে হতে দেরি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে রাতে অত মাংস না খেয়ে পরদিন খান।

৫. রাতে মাংস খাওয়ার জন্য যেসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি
রাতে মাংস খেলে তার সঙ্গে শাক-সবজি দিয়ে বানানো বিভিন্ন খাবার যেমন ভাপে সেদ্ধ সালাদ, সবজির স্যুপ, ফার্মেন্টেড সব্জী (যেমন, কিমচি) ইত্যাদি খেতে পারেন। এবং শর্করা জাতীয় খাবার যেমন ভাত, রুটি, পরোটা এসব খাবার না খেতে পারলে ভালো হয়। কেননা রাতে খাবার পর আমরা শুয়ে বসে সময় কাটাই। এতে করে ক্যালরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে থাকে। তবে সালাদ এবং ভেজিটেবল আইটেমের সঙ্গে মাংস খেলে ফাইবার বা আঁশ শরীরে চর্বি জমতে দেয় না।

৬. একদিন বেশি খেলে কিছু হয় না কথাটা ভুল
অনেকের যুক্তি হচ্ছে একদিন বা দুদিন একটু বেশি খেলে কিছু হবে না। বিশেষ করে ঈদের সময় তো খেতেই হবে। ঠিক আছে বেশি খান তবে বেশি ক্যালরি ঝরাতেও হবে। যারা ঈদের আনন্দে পরিমাণ মতো মাংস না খেয়ে বেশি খেয়ে ফেলবেন তাদেরকে অবশ্যই নিয়ম করে প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে ব্যয়াম করে শরীরে জমা অতিরিক্ত ক্যালরি পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

ঈদের সময় সকালে কমপক্ষে ত্রিশ থেকে চল্লিশি মিনিট ইয়োগা এবং প্রাণায়াম করতে হবে। আবার বিকেলেও নিয়ম করে হাঁটতে হবে। করোনার সময় বাইরে না হেঁটে ঘরের মধ্যেই হাত ঝুলিয়ে জোরে জোরে বিশ মিনিট হাঁটুন দেখবেন শরীর থেকে ঘাম বের হচ্ছে। যারা সুস্থ থাকতে চান তাদের এই নিয়মগুলো মেনে ঈদে মাংস খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে কোন বাঁধা নেই।

৭. ঠাণ্ডা পানীয়ের পরিবর্তে ঘোল
মাংস খাওয়ার পর কোল্ড ড্রিঙ্কস্ না খেয়ে পুদিনা পাতা দিয়ে ব্লেন্ড করা এক গ্লাস ঘোল খেলে হজম ভালো হবে। এই ঘোল রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে খুবই উপকারি।

৮. যে খাবারে চর্বি কাটে
এছাড়াও চিনি এবং লবণ ছাড়া এক গ্লাস লেবু পানি সকাল এবং বিকালে খেলে শরীর থেকে চর্বি কাটতে সাহায্য করবে।

৯. মাংস হজম করার উপায়
প্রতিবার মাংস খাবার পর কয়েক টুকরা কাঁচা পেঁপে চিবিয়ে খাবেন অবশ্যই। তবে যারা গর্ভবতী তারা পেঁপে খাবেন না।

শুধু ঈদেই নয়, আমাদের সুস্থ থাকার জন্য ব্যালান্সড ডায়েট বা নিয়ম মেনে খাবার খেতে হয়। এতে শর্করা, আমিষ, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেলস্ থাকতে হবে। এই সব ধরনের ফুড গ্রুপ যখন সারাদিনের খাবারে থাকে তখনই তাকে ব্যালেন্সড ডায়েট বলে যা শরীর সুস্থ থাকার জন্য জরুরি। তাই ঈদে পরিমিত মাংস খাওয়ার পাশাপাশি পরিমিত ভাত এবং রুটি খেয়ে সঙ্গে প্রতিদিন নানারকম ঋতুভিত্তিক সবজি, সালাদ ও দেশি ফল খেতে হবে যাতে করে ব্যালেন্সড ডায়েট খাওয়া হয় আবার ক্যালরির পরিমাণও ঠিক থাকে।

বয়স, পেশা এবং জীবনযাপনের ধরনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মাংস এবং অন্যান্য খাদ্য উপাদান কি পরিমাণ মতো খেলে অতিরিক্ত ক্যালরি খাওয়ার চাপমুক্ত রাখা যাবে শরীরকে সেটা বোঝার জন্য নীচে গরু এবং খাসির মাংসে থাকা ক্যালরির পরিমাণ তুলে দিলাম।

মাংস খান, তবে নিয়ম মেনে

এই চার্ট থেকে বোঝা যাবে গরু খাসির মাংসে কি পরিমাণে কতটুকু ক্যালরি থাকে। এবার এর সঙ্গে মিলিয়ে বাকি ক্যালরি খেতে হবে। করোনার সময়ে এই ঘরবন্দী জীবনে সঠিক নিয়মে খাওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরচর্চা করলে ঈদে অসুস্থ হবার ঝুঁকি এড়ানো সহজ হবে। পবিত্র ঈদ-উল-আযহা আযহার আনন্দ সবাই সুস্থ এবং সুন্দরভাবে উপভোগ করুন। ঈদ মোবারক।

সারাবাংলা/আরএফ





Source link