মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের আঁচ লাগবে বাংলাদেশেও : বিশ্লেষকদের শঙ্কা

0
469

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে স্পষ্টতই পরস্পরবিরোধী দুটি বলয় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। একটি বলয় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলপন্থী। এ বলয়ে রয়েছে সৌদি আরবও। অন্যদিকে পশ্চিমা স্বার্থান্বেষী এ বলয়ের প্রধান প্রতিপক্ষ ইরান। ইরানের সঙ্গে রয়েছে চীন, রাশিয়া এসব রাষ্ট্রের নাম। কার্যত, এ বলয়ের হয়ে মাঠপর্যায়ে সর্বাধিক তৎপর ইরান।

এক্ষেত্রে ইরানের হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলেইমানি। ইরাক থেকে সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে আফগানিস্তান, লেবানন থেকে গাজা পর্যন্ত ইরানপন্থী বলয়ের যে প্রভাব বিস্তারিত হয়েছে, তাতে অমোচনীয় অবদান রেখেছেন এ জেনারেল। ইরানের বিপ্লবী প্রতিরক্ষা বাহিনী আল কুদসের প্রধান এ জেনারেলকে গত শুক্রবার হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে ৪০ বছর ধরে চলা সংঘাতময় সম্পর্কের আগুনে নতুন বারুদ ঢেলে দেওয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ইরানও একবিন্দু ছাড় দেবে না, সর্বোচ্চ শক্তি নিয়েই এর মোকাবিলা করবে। তাতে করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও বেধে যেতে পারে। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এক ধরনের চাপা অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এমন যুদ্ধোন্মুখ পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বেই জ্বালানি তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে যাবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিশ্বের প্রতিটি দেশে, পড়বে বাংলাদেশেও। ফলে এ নিয়ে চিন্তার কারণ থাকা স্বাভাবিক।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর চেয়েও বড় ভাবনার বিষয়, রেমিটেন্সে তথা পুরো অর্থনীতিতেই আঘাত আসার শঙ্কা। কারণ দেশের অর্থনীতির একটি বড় ভিত গড়ে ওঠেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশির পাঠানো রেমিটেন্স থেকে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার সর্বাধিক বিস্তৃত। ওই অঞ্চলে যুদ্ধ-সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দেশে ফিরে আসতে হবে বিপুলসংখ্যক প্রবাসকর্মীকে।

এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই বর্তমানে কর্মরত আছেন প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, ইরাক, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। তাদের দেশে ফিরে আসা আমাদের অর্থনীতিতে বড় আঘাত হানবে; বেকারত্বের হার বেড়ে যাবে উদ্বেগজনকভাবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরফে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানানো উচিত, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে যেন দৃঢ় ও কার্যকর ভূমিকা রাখে প্রতিষ্ঠানটি। এমনটিই মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কাসেম সোলেইমানি ইরানের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। পশ্চিমারা মনে করে, একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সমরবিদও ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে যে অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেটি আরও অশান্ত হবে। ইরান হয়তো এ মুহূর্তে কোনো প্রতিশোধ নেবে না। কিন্তু আগামী বেশ কিছু বছর এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত থাকবে। ইরান হয়তো পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের মূল কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। এ ঘটনায় তেলের দামের ওপরও প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যেই তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এই উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্যও চিন্তার। কারণ সৌদি আরব ও ইরাকে আমাদের প্রচুর শ্রমিক আছে। স্বাভাবিকভাবে পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠলে তারা দেশে ফিরে আসবে। বাংলাদেশের উচিত হবে এ ঘটনায় কোনো পক্ষে না গিয়ে নিরপেক্ষ থাকা।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার ঘটনায় অনেকগুলো ডাইমেনশন আছে। এ ঘটনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে আরেক ফ্রন্ট ওপেন করল যুক্তরাষ্ট্র। এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ যদি এ উত্তেজনা নিরসনে ব্যর্থ হয়, তা হলে সামনে যুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটতে পারে। যেটা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশেরও এই উত্তেজনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশে আমদানি ব্যয় বাড়বে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যে প্রচুর বাংলাদেশি আছেন প্রভাব পড়বে তাদের ওপরও। বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়। তা ছাড়া কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না বাংলাদেশ। তাই আমাদের উচিত হবে, উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব) আবদুর রশীদ বলেন, ‘কোন একটি স্বাধীন দেশের সরকারি চাকরিজীবীকে অন্য দেশের মাটিতে হত্যার যৌক্তিকতা কতটুকু। এ হামলার ন্যায্যতা বিশ্ব শান্তির পরিপন্থী। মধ্যপ্রাচ্যে এ ঘটনা যুদ্ধাবস্থা তৈরি করেছে। অবশ্য সংঘাতের বিস্তার কতটুকু হবে সেটি ইরানের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। আশা করি যুদ্ধ বাধবে না। তবে বাংলাদেশের মতো মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর দেশগুলো এ উত্তেজনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তেলের মূল্য বাড়লে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ।

তা ছাড়া পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা থাকলে সেখানকার বাংলাদেশি শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে ফিরে আসতে চাইবেন। এতে রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়বে। সে জন্য বিশ্ব শান্তির পক্ষেই বাংলাদেশের অবস্থান থাকা উচিত।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে