ভয়ংকর ‘পাটাও’

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশীয় পরিবহন কোম্পানি পাঠাও। দেশজুড়ে পরিবহন খাতে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই যার সূচনা। দেশের প্রধান তিন শহর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রামের কিছু উপশহর ছাড়িয়ে ইতোমধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নেপালেও রাইড শেয়ারিং সেবার কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে পাঠাও কর্তৃপক্ষ। রাইড শেয়ারিং সেবার পরিধি থেকেও বেরিয়ে ই-বাণিজ্য, কুরিয়ার ও খাদ্য সরবরাহ সেবাও চালু করেছে তারা।
পাঠাওয়ের কল্যাণেই যেমন সংশ্লিষ্ট শহরগুলোর জনসাধারণ পরিবহন খাতের অস্থিরতার মধ্যে পেয়েছে স্বাচ্ছন্দ্যের ছোঁয়া, তেমনি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বিরাট ভূমিকা রাখছে এ প্রতিষ্ঠান। মাঠ-পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল কাজের সুবাদেও রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়েছিল ৫০০ কর্মীর।

অথচ ২০১৬ সালের মাঝামাঝি আত্মপ্রকাশের পর থেকেই সুনাম-যশ-খ্যাতির সঙ্গে তালমিলিয়ে চলা এ প্রতিষ্ঠান বর্তমান সময় পার করছে যেন রহস্যে ঘেরা কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। যার চিত্র ফুটে ওঠে বিশাল কর্মযজ্ঞেও হঠাৎ প্রায় তিনশ কর্মীকে বাধ্যতামূলক অব্যাহতি দেয়ার ঘটনায়।

!-- Composite Start -->
Loading...

এ ঘটনায় টক অব দ্য টাউনেও পরিণত হয় প্রতিষ্ঠানটি, পাশাপাশি চলছে বিভিন্ন মহলের ব্যাপক সমালোচনাও। পাঠাওয়ের কর্মী ছাঁটাইয়ের এমন প্রক্রিয়াকে অমানবিক বলেও বিভিন্ন মহলের সমালোচনায় উঠে এসেছে ইতোমধ্যে। শুধু তাই নয়, অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মীদের বর্ণনাতেও ওঠে আসে অমানবিকতার কথা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চলছে সমালোচনা, করা হচ্ছে পাঠাও বয়কটের দাবি। তবে হঠাৎ কেন এতটা অমানবিক পাঠাও এবং অস্থিরতার কারণ কি- তার উত্তরও মিলছে না কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বরং যৌক্তিক উত্তর না দিয়েই বিবৃতি পাঠিয়েই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে পাঠাও।

যদিও বিবৃতিতে পাঠাও বলছে, তাদের ব্যবসার মূল শাখাগুলোকে শক্তিশালী করতেই কৌশলগত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে। যা পাঠাওকে শক্তিশালী ও দক্ষতা বৃদ্ধি করবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয়ও রোধ করবে। তবে কি অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় রোধে এবং দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই প্রায় ৩০০ কর্মীর ভাগ্যের বিষয়ে এতটা অমানবিক ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়েছে পাঠাও? এ প্রশ্নের উত্তরও মিলছে না পাঠাও থেকে।

পাঠাও থেকে বাধ্যতামূলক অব্যাহতি পাওয়া কর্মীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চেয়ে গত রোববার বনানীর অপারেশনাল বিভাগ ও গুলশানস্থ হেড অফিসে গেলেও তারা কেউই কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

তবে তারা বলছেন, কোনো প্রশ্ন যদি থেকে থাকে তাহলে পাঠাও কর্তৃপক্ষের দেয়া ই-মেইলের মাধ্যমেই পাঠাতে হবে এবং কর্তৃপক্ষ সেটা বিবেচনা করে উত্তর জানাবে। পাঠাওয়ের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ ওসমান সালেহ এমনটাই জানিয়ে তিনটি ই-মেইল আইডি এ প্রতিবেদকের নোটপেডে লিখে দিয়ে পুনরায় ভেতরের কক্ষে চলে যান।

এর আগে পাঠাওয়ের গুলশান অফিসের রিসিপশনিস্টের কাছে সিইও হুসেইন এম ইলিয়াস কিংবা সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার নাবিলা মাহবুবের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা বলেন, স্যার ও ম্যাডাম অফিসে নেই। তাছাড়া তারা কথা বলবেন না।

তারপরও রিসিপশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলেন এবং সাংবাদিক আসছে বলে কর্মকর্তাদের জানালে কিছুক্ষণ পরই বেরিয়ে আসেন ওসমান সালেহ নামের মার্কেটিং বিভাগের ওই কর্মকর্তা। ই-মেইলে যোগাযোগের অনুরোধ করে ওসমান সালেহ বলেন, (সিইও-হুসেইন এম ইলিয়াস ও নাবিলা মাহবুব) তারা কথা বলবেন না। কেন তারা কথা বলতে নারাজ- এমন প্রশ্নেরও উত্তর না দিয়েই স্থান ত্যাগ করেন তিনি।

এদিকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারাও নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেই গণমাধ্যমে কথা বলছেন। পাঠাও কর্তৃপক্ষের মতো কেন তারাও নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে বাধ্যতামূলক অব্যাহতি পাওয়া কর্মকর্তাদের একজন জানান, পাঠাওয়ের কাছ থেকে যাবতীয় পাওনাদি ও গত মাসের (জুলাই) বেতন-ভাতা না পাওয়ার ভয়েই কেউ আইনি পদক্ষেপসহ গণমাধ্যমের কাছে নিজের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছেন না।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিনের ন্যায় চলমান অফিস টাইমে হঠাৎ করেই প্রতি বিভাগকে দুই ভাগে ভাগ করে একটি ভাগকে উপরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা- হুসেইন এম ইলিয়াস), সিএফও (চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার-ফাহিম আহমেদ), কয়েকটি বিভাগের প্রধান এবং প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের প্রায় সব কর্মকর্তা আমদের সামনে আসেন।

ওই সময় তারা সরাসরি বলে দিলেন আমাদের পদত্যাগ করতে হবে। যে যে অবস্থায় আছে, পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে তাকে সেই অবস্থায়ই অফিস ত্যাগ করতে হবে এবং তা করতে নির্দেশই দিলেন তারা। এছাড়াও কর্তৃপক্ষের টাইপ করে আনা অব্যাহতি পত্রেই স্বাক্ষর দিতেও বলেন।

তিনি বলেন, পাঠাও কর্তৃপক্ষের মধ্যে শঙ্কা বিরাজ করছিল আমরা হয়তো ইউনিয়ন করবো বা প্রতিবাদ করবো, যেখানে আমাদের একে অপরের থেকে আলাদা করা হয়েছিল।

আমরা যেন তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিবাদ করতে না পারি বা কেউ যেন মোবাইলে কিছু ধারণ করতে না পারে সেজন্য প্রচুর সংখ্যক নিরাপত্তা প্রহরী অফিসের ভেতরে মোতায়েন করা হয়েছিল। নিজেদের অফিসে নিজেরাই যেন চোর। এমন একটা অনুভূতি হচ্ছিল। কর্মী ছাঁটাই করলেও তার ধরন ও প্রক্রিয়া ছিল খুবই বাজে।

পাঠাওয়ের এমন সিদ্ধান্তে চাকরি হারানো প্রায় সবাই বিপাকে পড়েছেন বলে জানিয়ে সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, চাকরিচ্যুতদের কেউ কেউ ঋণ পরিশোধের বোঝা মাথায় নিয়ে পরিবার চালানোর দায়িত্বও পালন করছে। আবার এমনও সদস্য আছেন যারা হয়তো মাত্রই বিয়ে করেছেন এবং নতুন একটি জীবন শুরুর একদম দ্বারপ্রান্তে আছেন।

প্রায় অনেকের পাঠাওতে চাকরির বয়স এক বছর পেরিয়েছে যেখানে পাঠাওয়ের বয়সই প্রায় চার বছর। স্থায়ী চাকরির সুবাদে কেউ বিয়ে করেছেন বা ঋণ নিয়েছেন। তারা রীতিমত মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

এ ঘটনার পর গুঞ্জন চলছে পাঠাও কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে পারে- এমনটা জানিয়ে পাঠাওয়ের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ ওসমান সালেহর কাছে জানতে চাইলে তিনি হাসি দিয়েই বিষয়টি এড়িয়ে যান।

পাঠাওয়ের কর্মী ছাঁটাইয়ের পর সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের অভ্যন্তরীণ জঠিলতা নিয়ে সিইও হুসেইন এম ইলিয়াসের সঙ্গে কথা বলতে চেয়ে না পেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার নাবিলা মাহবুবের সঙ্গে।

সেখানে ভিন্ন ভিন্ন আটটি প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ এজেন্সি মাস্টহেডকে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবেন বলে জানান। কিন্তু এর আগে মাস্টহেডকে একই প্রশ্ন করা হয়েছে এবং তারা প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দেননি বলেই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এমনটা জানালে তিনি বলেন, ভাইয়া যা দেয়ার ওনারা দিয়ে দিয়েছেন।

এর আগে পাঠাও থেকে দেয়া তিনটি ইমেইলে প্রশ্ন করতে বলা হলেও আমার সংবাদ থেকে করা প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দিয়েই প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ বিভাগ মাস্টহেড পিআর একটি পাঠায়। যাতে উল্লেখ রয়েছে- দেশের বৃহত্তম অন-ডিমান্ড ডিজিটাল প্লাটফরম পাঠাও ব্যবসায়িক বিকাশের নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

এর অংশ হিসেবে আমরা কতিপয় কৌশলগত নীতি অবলম্বন করছি- যা আমাদের ব্যবসার মূল শাখাগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে, দক্ষতা বৃদ্ধি করবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয়বৃদ্ধি রোধে সহায়তা করবে। পরিবর্তনের এই প্রভাব পাঠাও এর সাংগঠনিক অবকাঠামোসহ এর ব্যবসার সর্বস্তরে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ঘটাবে।

আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছি যেখানে আমাদের প্রতিটি সেবা হবে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, অনায়াসলব্ধ, বিরতিহীন ও গ্রাহকবান্ধব। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস হলো- এসব নতুন ও মৌলিক পরিবর্তন পাঠাওকে বর্তমান প্রতিযোগিতা নির্ভর বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য এনে দেবে।

আমার সংবাদ থেকে করা সবকটি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর আসেনি উল্লেখ করে পুনরায় মেইল পাঠানো হলে মাস্টহেড পিআরের কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বলেন, পাঠাও কর্তৃপক্ষ তাদের হোল্ডিং স্টেটমেন্ট থেকে কোনো তথ্য শেয়ার করতে চায় না। যে কারণে আমি এর চেয়ে বেশি আর কোনো সাহায্য করতে পারবো না বলে জানান।

মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.