ভালোবাসা দিবসে তাহমিনা শিল্পীর গল্প ‘নীল পর্দার আড়ালে’

0
107

তাহমিনা শিল্পী :: শুনেছি প্রথমপ্রেম কখনও ভোলা যায় না।অথচ আমার বেলায় সবসময় উল্টোটাই ঘটে।আমি আমার তৃতীয় প্রেমটাকে ভুলতে পারিনি।

আরে! কি বলছেন? এমন আবার হয় নাকি? আপনি তাহলে বহুবার প্রেমে পড়েছেন?

অডিয়েন্সের এমন অনেক জিজ্ঞাসা উপেক্ষা করে সাহিত্যে প্রেমের ভূমিকা ও একটি লেখাকে সর্বজনীন করার কৌশল বিষয়ক সেমিনারে দ্বিধাহীন ভাবে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে লেখক সৌমিক রায়হান অনবরত বলে চলেছেন।

আমার প্রথম প্রেম হয়েছিল সাত বছর বয়সে। একটি বিড়ালছানার সাথে।

অডিয়েন্সের সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

বিড়াল ছানাটির সাথে ভীষণ সখ্য গড়ে উঠলো। এক মিনিটের জন্য চোখের আড়াল করতাম না।সারাক্ষণ কোলে কোলে রাখতাম।তারপর ছানাটা বড় হয়ে একদিন কোথায় যে চলে গেলো।আর ফিরে এলো না।প্রথম প্রথম আমার দিন কাটে তো রাত কাটে না অবস্থা হলেও ১৩বছর বয়সে দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়ে আমি প্রথম প্রেমকে বেমালুম ভুলে গেলাম।

সবাই নড়েচড়ে বসলো।ভাবলো এসময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক সৌমিক রায়হান হয়ত তার নিজের জীবনের গল্পবলছেন।

আমার দ্বিতীয়বার প্রেম হলো একটি গাছের সাথে।আমার শোবার ঘরের পড়ার টেবিল লাগোয়া জানালার বাইরে নিজ হাতে লাগানো হাস্নাহেনা গাছ।আমি রোজ জল দেই।আগাছা পরিষ্কার করি।মরা পাতা বেছে দেই।গাছটি তরতর করে বেড়ে ওঠে।ফুলেফুলে সুসজ্জিত হয়ে আমায় সুবাসিত করে।তুমুল প্রেম হয়েছিল আমার গাছটির সাথে।কিশোর বয়সের মনের যত গোপন কথা, দুঃখ-ব্যথা আমি গাছটির কাছেই বলতাম।গাছটিও যেন সব বুঝে ডালপালা নেড়ে আমায় সান্তনা দিতো।সমবেদনা জানাতো।

তারপর কি যে হলো! হঠাৎ-ই গাছটি শুকিয়ে যেতে থাকলো।আমার যত্ন ভালোবাসা কোন কাজেই লাগলো না।এক ভোরবেলায় জেগে দেখি গাছটা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছে।

গাছের শোকে আমিও নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে শয্যাশায়ী হলাম।অষ্টম শ্রেণীর প্রথম সাময়িক পরীক্ষা মিস করলাম।বাবা আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেলেন।পরপর তিনটি সেশন নেয়ার পর সে যাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে আমার সময় লেগেছিল প্রায় ছয় মাস।তারপর একসময় ভুলেই গেলাম হাস্নাহেনাকে।

খানিকক্ষণ থেমে সৌমিক রায়হান আবার বলতে শুরু করলেন।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি।তখনও হলে সিট পাইনি।গ্রামের বড় ভাইদের সাথে একটি বাড়ির চার তলার ভাড়া করা ফ্ল্যাটে থাকি।পড়াশুনা আর টিউশনি করেই দিন কাটে।রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে ব্যালকনিতে বসে রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের মৃদু আলোয় একটু আধটু লেখালেখি করি।দু চারটে লেখা পত্রিকায় ছাপা হলেও লেখক বিশেষণটি তখনও নামের সাথে যুক্ত হয়নি।

সেই সময়ে আমি তৃতীয়বার প্রেমে পড়েছিলাম।

অবশ্য এটাকে প্রেম বলা যায় কিনা ভেবে দেখার বিষয়।আবার পরকিয়া বলতেও মন সায় দেয় না।তারচেয়ে আমার মনে তার স্মৃতিরা না হয় থাক নামহীন কোন এক গভীর অনুভবে।

সে থাকতো বিপরীত দিকের বাড়ির চার তলার ফ্লাটে।আমার ব্যালকনি থেকে তার ব্যালকনির দূরত্ব বড়জোর দশ গজ হবে।মাঝে সরু গলিপথ।

প্রথমবার তাকে দেখেছিলাম নীল পর্দার আড়ালে।অলস দুপুরে সদ্য স্নান করে আয়নার সামনে বসে নিবিষ্টমনে প্রসাধনচর্চায় ব্যস্ত।লাল পেড়ে হলদে শাড়িতে মনে হয়েছিল যেন কোন শুদ্ধতার দেবীশ্রেষ্ঠা।তার দুধেআলতা মুখখানিতে উপচে পড়া লাবন্য।চোখ দু’টোতে ভীষণরকম মায়া।পিঠময় এলোমেলো ভিজে খোলা চুল।তখনও চুল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

মুহুর্তেই আমি তার মুগ্ধতায় ডুবে গেলাম।বোধকরি সেই মুহূর্ত থেকেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।কোনরকম দেরি না করে মনেমনে তাকে ঘিরেই রচনা করেছিলাম একটি দু’টিনয় সাত সাতটি জীবনের স্বপ্ন।

তারপর থেকে তাকে দেখার জন্য যখন তখন ব্যালকনিতে বসে থাকতাম।সে কাপড় শুকাতে আসতো।গাছে পানি দিতে আসতো।প্রায়শই শেষ বিকেলের দিকে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে উদাস নয়নে দীর্ঘক্ষণ আকাশ দেখতো।আর কি যেন কি ভাবতো।কেন জানি না তখন আমার ভারী মায়া হতো!

স্নানের পর বারান্দায় দাড়িয়ে তাওয়াল দিয়ে চুল ঝাড়ার সময় তাকে সবচেয়ে সুন্দর লাগতো।সাজহীন, প্রসাধনহীন কোন নারীকে যে এত মোহনিয়া লাগতে পারে তাকে দেখার আগে আমার জানা ছিল না।চুল ঝাড়তে ঝাড়তে গুনগুন করে গান গাইতো।

একবার বেসামাল বাতাসে আঁচল সরে গিয়ে শাড়ির আড়াল থেকে উঁকি দিলো তার সুডৌল কোমর, ফর্সা কোমল পেট ও নাভিমূল।চকিতে শাড়ি ঠিক করে এদিক ওদিক চাইতেই আমাদের দৃষ্টি বিনিময় হলো।বলা যায় সেটাই প্রথম, সেটাই শেষ শুভদৃষ্টি।

স্বলাজ ভীত চাহনি দিয়ে এক দৌড়ে ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে গিয়ে দ্বোর দিলো।জানালার ঝুলানো পর্দাটা আরও একটু টেনে ঠিকঠাক করে নিলো।তারপর থেকে তাকে আর ব্যালকনিতে দেখিনি।কাজের মেয়েটিই কাপড় শুকাতে দিতো।গাছে পানি দিতো।হঠাৎ কখনও সখনও বাতাসে নীল পর্দা সরে গেলে এক ঝলক তার দেখা মিলতো।ওইটুকুই তখন আমার তাকে দেখার তৃষ্ণা মিটাতো।

তারপর, তারপর কি হলো? অডিয়েন্সের উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন।একটি মৃদুমন্দ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৌমিক রায়হান আবার শুরু করলেন।

শেষবার তাকে দেখেছিলাম ডিম লাইটের কুসুমকোমল আলোয় স্বামী সোহাগে লতানো প্রতিমা রূপে!বসন্তের বাউরি বাতাসে জানালার পর্দা খানিকটা সরে গিয়েছিল।বোধকরি তা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল।

আমি আতকে উঠে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য থেকে।নিজেকে ধিক্কার দিলাম এই বলে, মুগ্ধতার ঘোরে তাকে নিয়ে কত কি-ই না ভেবেছি।অথচ তার সম্পর্কে কোন কিছু জানার প্রয়োজনই মনে করলাম না!

শ্রদ্ধায় মন ভরে উঠলো সতি বেহুলার সেই উত্তরসুরির প্রতি।মনেমনে তার সুখি সুন্দর দাম্পত্য জীবন কামনা করলাম।পরদিন সকালেই ফ্ল্যাট ছেড়ে প্রথমে বন্ধুর মেসে গিয়ে উঠলাম।মাস খানেক পরে হলে চলে গেলাম।আর কোনদিন ওমুখো হয়নি।

সৌমিক রায়হান থামলেন।অডিয়েন্সে তখন গুঞ্জন চলছে।কেউ কেউ উঠে দাড়িয়ে জানালো পরের অংশটাও তারা লেখকের মুখ থেকেই শুনতে চায়।

তারপর ৫০টি বসন্ত পেরিয়ে গেলো।আমি আজও ব্যাচেলর।গোপনে কতবার তার কাছে যাই। হাত ধরি।চুমু খাই কপালে,ঠোঁটে,চিবুকে।

শুধু সে কোনদিন তা জানতে পারবে না।

পুরো অডিয়েন্সে পিন পতন নিস্তব্ধতা নেমে এলো।সবাই প্রিয় লেখক চিরকুমার সৌমিক রায়হানের সমব্যথী হয় উঠলো।কারো কারো চোখের কোণে চিকচিক করছে জল।

সৌমিক রহমান স্টেজে দাড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ দেখলেন।তারপর বললেন, একজন লেখককে ঠিক এইভাবেই একটি গল্প বা উপন্যাস সবার করে দিতে হয়।

Print Friendly, PDF & Email

Source link