বিষন্নতা

97

বিষণ্ণতা কেন তৈরি হয়? কিংবা কেন দিন দিন বেড়েই চলে?

অনেক কারণই থাকতে পারে এর পেছনে। কয়েকটা বলছি:
হয়তো তার ব্যথাগুলি বোঝার মতো একটি মানুষও নেই এই পৃথিবীতে।
হয়তো তার দুঃখগুলিকে ভাগ করে নেবার মতো বিশ্বস্ত কাউকে সে পাচ্ছে না।
হয়তো তার ক্ষতবিক্ষত আবেগগুলিকে জমা রাখবার একমাত্র ভালোবাসার মানুষটি আজ তার পাশে নেই।
হয়তো সে তার একাকিত্বের সময়টাতে ভরসা করবার মতো কাউকে সে খুঁজে পায় না।
হয়তো তার বুকের মধ্যে বলতে-না-পারা যন্ত্রণাগুলি জমতে জমতে পাহাড়ের চেয়েও ভারী হয়ে আছে।
হয়তো তাকে তার মতো বুঝতে পারে, কিংবা গ্রহণ করতে পারে, এমন কেউ নেই এই পৃথিবীতে।
হয়তো তার সবচাইতে কাছের মানুষটি এমন একটা কাজ করেছে, যা সে শত চেষ্টা করেও কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
হয়তো তার এমন কেউ নেই, যার কাছে নিজের সমস্ত মানসিক টানাপোড়েন, কষ্ট, অনুযোগ প্রকাশ করে নিজেকে হালকা করে নেওয়া যায়।
হয়তো তার জীবনে এমন একজন মানুষও নেই, যাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে করে অঝোরে কাঁদা যায়।
…এবং, এরকম আরও অনেক কিছুই!

আর তখন? এমন একটা অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথটি!

এরপর কী হয় জানেন? সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার মৃত্যুর কারণটা খুঁজতে!

মানুষটা চলে যাবার পর কেন আমরা তার চলে যাবার কারণ খুঁজতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠি? সে যখন যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছিল, তখন আমরা কোথায় ছিলাম? কারও জন্য কাঁদতে হলে সে মরার আগেই কাঁদতে হয়, মরার পরে নয়। সন্তোষ সেনগুপ্তর গানের লাইন মনে পড়ে যাচ্ছে—জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল? মুখপানে যার কভু চাওনি ফিরে, কেন তারি লাগি আঁখি অশ্রুসজল

খোঁজ নিন আপনার কাছের মানুষটির। কিংবা আশেপাশের কোনও বন্ধুর বা স্বজনের। হয়তো আপনার খুব কাছেই ঘুরছে ফিরছে হাসছে এমন কেউ, যে তার কথাগুলো, ব্যথাগুলো বলার মতো কাউকে পাচ্ছে না। কেউ তাকে বুঝতে চায় না, শুনতে চায় না। হয়তো সে ভেবেও রেখেছে,…কাল, পরশু বা তার সুবিধেমতো কোনও এক জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে কিংবা ভাতফোটা ভোরে কিংবা আগুনেপোকাশোভিত সন্ধেয়…সেও তার পূর্বসূরিদের অনুসরণ করে চিরমুক্তির পথে পা বাড়াবে খুব সন্তর্পণে। তখন যেন আবার বলে বেড়াবেন না—সে আত্মহত্যা করেছে, অতএব সে একজন পাপী! কেউ শখ করে নিজেকে মেরে ফেলে না। নিজেকে আর বাঁচিয়ে রাখতে না-পারা যদি পাপ হয়, তবে যার বা যাদের কারণে বা অবহেলায় মানুষ নিজেকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, সে-ই বা তারাই—সেই পাপের একমাত্র পাপী! সময় হলে…সময়ই এর সাক্ষ্য দেবে, সময়ই এর বিচার করবে!

কেউ খিলখিল করে হাসছে, তার হাসিতে সুদূর ঝরনার জলের কলকল ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, যশ খ্যাতি বিত্ত প্রতিষ্ঠা প্রতিপত্তি ইত্যাদিতে সে ঠাসা রয়েছে—এর মানেই সে একজন সুখী মানুষ, অন্তত আমার আপনার চাইতে ঢের বেশি, এমনটা না-ও হতে পারে। সুখ বরাবরই দুঃখের মতোই একটি আপেক্ষিক বিষয়। বিষণ্ণতা বরাবরই ক্যানসারের মতোই ধীরে ধীরে ক্ষয় করে ফেলে। এসব মেনে নিন। হ্যাঁ, এসব পুরনো গৎবাঁধা বুলি, আমরা সবাই এসব কমবেশি জানি। আর জানি বলেই মানি না কিংবা মানতে ভুলে যাই। দেরি হয়ে যাবার আগেই নিজের মনের যত্ন নিন, নিজেকে যে-কোনও মূল্যে ভালো রাখুন। কে কী বলল বা ভাবল, তার চাইতে হাজার গুণ গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের মতো করে, বেঁচে অন্তত থাকা। এই পৃথিবীতে, কোনওমতে হলেও, বেঁচে-থাকার চাইতে বড়ো সাফল্য বা ঐশ্বর্য আর একটিও নেই।

একই সাথে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত আপনার প্রিয় মানুষটির কথা শুনুন। একদম চুপ হয়ে শুনুন। কোনও মতামত তার উপর চাপিয়ে দেবেন না। সে হয়তো প্রতিবাদ করবে না, নীরবে চলে যাবে। সেদিন কান্না পেলেও-বা কী হবে? পাবেন আর মানুষটাকে ফিরে? আজ মানুষটাকে বলার সুযোগ দিন। তার ব্যথার কথা শুনুন—মন দিয়ে, সময় নিয়ে। নইলে একদিন শত চাইলেও তার কথা আর শুনতে পারবেন না। তার উপর কোনও যুক্তি ফলাতে যাবেন না যেন ভুলেও! জীবন যুক্তিতর্কে চলে না। জীবন চলে বিশ্বাসে, আবেগে, আর মানবিকতায়। নিজের সমস্ত ইগো, বিশ্বাস, চেতনা, বুদ্ধি ঝেড়ে ফেলে তাকে তার মনের মতো করে সময় দিন। হয়তো আপনার কাছ থেকে এই সামান্য সহানুভূতিটুকু পেলে বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠে সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। শুধু আপনার কারণে এই পৃথিবীতে একটি প্রাণ বেঁচে আছে—এর চাইতে আনন্দের কিছু আর কী হতে পারে!