বাংলাদেশে নিরীহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত করুন: লন্ডনে পার্লামেন্ট স্কয়ারে সেইভ বাংলাদেশ

লন্ডন থেকে হাসান ফেরদৌস : বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাসীদের নির্যাতন, তাদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-, গুম ও নিপীড়নের প্রতিবাদে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট স্কয়ারে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক নাগরিক সংগঠন সেইভ বাংলাদেশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বাংলাদেশে নিরীহ সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও তাদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়াকে মানবতাবিরোধী বীভৎসতা উল্লেখ করে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় মদদে ক্ষমতাসীন সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনী নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে নিপীড়ন চালাচ্ছে সেটার জন্য একদিন তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। বক্তারা বলেন বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়ি-ঘর পুড়াচ্ছে, ভেঙ্গে দিয়ে সহায় সম্পদ লুটপাট করছে কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আটক দূরে থাক, বরং প্রতিটি স্থানে সহযোগিতা করার পাশাপাশি এর দায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে চরম হয়রানি করছে। বক্তারা অবিলম্বে সংখ্যালঘু নিযার্তনের ঘটনার জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানান।
বক্তারা ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, ঘর থেকে জলজ্যান্ত মানুষ ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে ক্রসফায়ার বলে প্রচার করা হচ্ছে। যারা এর সাথে জড়িত এবং যারা এ জুলুমকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন তাদের সবাইকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
সেইভ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লার পরিচালনায় বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান। প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন জমিয়তে উলামা ইউরোপের আমীর আল্লামা মুফতি শাহ ছদর উদ্দিন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড কুরবান হোসাইন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান, যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এম এ মালেক, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আজমল মশুরুর, খেলাফত মজলিস ইউকের আমীর প্রফেসর আব্দুল কাদির সালেহ।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নান, মাওলানা মাসুক আহমদ, মাওলানা আবুল হাসনাত চৌধুরী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, আনোয়ার আলী, সোহেল আহমদ, মাওলানা সাইফুদ্দিন, ফেরদৌস হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মপ্রাণ। বাংলাদেশের কোন সাধারণ জনগণ, ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ভিন্ন ধর্মের মানুষকে নির্যাতন দূরে থাক, নূন্যতম অসম্মানজনক কোন কথা বলে না। পাঁচ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ দেশে যে চরম সন্ত্রাস, নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলো সেটা ঢাকতে অতীতের মতো সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধোঁয়া তুলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, যারা হিন্দু-বৌদ্ধ ভাইদের বাড়িতে হামলা চালায় এরা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী। অসংখ্যবার হাতে নাতে ধরা পড়ার পরও আইনের কাছে তারা নিরপরাধ। তিনি অবিলম্বে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের প্রতি যদি এর পরও অবিচার হয়, তবে একদিন এর বিচার হবে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড কুরবান হোসাইন বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বাংলাদেশে সখালঘুদের ওপর যেভাবে অত্যাচার নির্যাতন চালানো হচ্ছে সেটা কোন অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। এ ধরনের ঘটনার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তদন্তের পরিবর্তে সরকারি দল বিরোধী দলকে দোষারোপ করে দায় এড়াতে চাইছে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন যদি বলা হয়, তবে এটা কোন অবস্থাতেই চলতে পারে না। তিনি ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখালঘু এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর যেভাবে দমন-নিপীড়ন চলছে সেটার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান বলেন, বাংলাদেশে আইনের শাসনের নামে ক্রসফায়ারে যেভাবে নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে সেটা ভয়াবহ। প্রতিদিন রাজনৈতিক কর্মীদের ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারে দেয়া হচ্ছে। টবি ক্যাডম্যান এ ব্যাপারে বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন থাকবে কি না সন্দেহ রয়েছে। তিনি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, এদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সকলের দায়িত্ব।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে জমিয়তে উলামা ইউরোপের আমীর আল্লামা মুফতি শাহ ছদর উদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেই সংখ্যালঘু নির্যাতন, জঙ্গিবাদ এবং তালেবানী রাষ্ট্রে শ্লোগান শোনা যায়। অথচ হিন্দুদের জায়গা জমি দখল, ঘরবাড়ি ভাংচুর, জ্বালানো-পুড়ানোতে সব সময় আওয়ামী লীগের লোকেরাই ধরা খেয়েছে। সম্প্রতি যা ঘটেছে এর সাথেও জড়িত অনেকেই হাতে নাতে ধরা খেয়েছে যারা সরকারি দলের লোক। কিন্তু ক্ষমতার দ্বম্ভে আওয়ামী লীগ এর দায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর চালিয়ে দিচ্ছে। তিনি অবিলম্বে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ খুন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, না হয় একদিন কঠিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এম এ মালেক বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য নিরীহ হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে এর দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চালিয়ে দিচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এ নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, যদি ক্রসফায়ারের নামে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের হত্যাকা- বন্ধ না করা হয়, সংখ্যালঘুদের ক্ষতিপূরণ প্রদান না করা হয়, তবে আজ যারা ক্ষমতায় রয়েছেন একদিন তাদের পরিণতি শুভকর হবে না।
খেলাফত মজলিস ইউকের আমীর প্রফেসর আব্দুল কাদির সালেহ বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘু ট্রামকার্ড ব্যবহার করে দেশের মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। অবিলম্বে হামলা এবং ক্রসফায়ারের নামে গণহত্যা বন্ধ না হলে সরকারকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ব্যরিস্টার নজরুল ইসলাম সংখ্যালঘুদের ওপর আওয়ামী লীগের হামলাকে শতাব্দীর ভয়ানক ঘৃণিত অত্যাচারের নমুনা উল্লেখ করে বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আওয়ামী লীগ নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করছে। তিনি অবিলম্বে হিন্দু সম্প্রদায়ের হামলার ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ঘৃণ্য রাজনৈতিক খেলা বেরিয়ে আসবে। ব্যারিস্টার নজরুল ক্রসফায়ারের নামে রাজনৈতিক হত্যাকান্ড- বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, যারা এমন মানবতাবিরোধী কাজ করছেন তাদের মনে রাখা উচিত একদিন তাদের এজন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

!-- Composite Start -->
Loading...
মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.