‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পুরস্কার হিসেবে জিয়া সেনাপ্রধান’

90


সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমি মনে করি, মোশতাক-জিয়ারা জড়িত না থাকলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সম্ভব ছিল না। এজন্যই পুরস্কার হিসেবে জিয়া সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

মঙ্গলবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘স্মরণে শ্রদ্ধায় ৭৫’ শিরোনামে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক উপ-কমিটির উদ্যোগে শোকানুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। পরে স্মরণ-শ্রদ্ধা, বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত রচিত কবিতা থেকে আবৃত্তি এবং অভিশপ্ত আগস্ট নামে একটি নাটক পরিবেশন করা হয়।

ডা. নুজহাত চৌধুরীর সঞ্চালনায় এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে সভাপতির শোক-সম্ভাষণ দেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান মঞ্চসারথি আতাউর রহমান।

‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পুরস্কার হিসেবে জিয়া সেনাপ্রধান’

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরের দিন মুক্তির দূত শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। ক্যাম্পাস উচ্ছ্বসিত। বারবার মনে পড়ছে, প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বঙ্গবন্ধুর জন্য ভালোবাসার পুষ্পের পাপড়ি নিয়ে। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগেই ভালোবাসার পুষ্পগুলো রক্তাক্ত হয়ে গেল। বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি রক্তের সমুদ্র হয়ে গেল। ইতিহাসের সবচেয়ে কালিমালিপ্ত অধ্যায়ের জন্ম নিল বত্রিশ নম্বরে। বেতার হয়ে গেল রেডিও, জয় বাংলা হয়ে গেল জিন্দাবাদ। বিপ্লবের বিপরীতে প্রতিবিপ্লব ঘটে গেল। ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘যার শ্রম, ঘাম ও নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা রচিত হলো, তারই রক্তে রঞ্জিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সপরিবারে। আমি মনে করি মোশতাক-জিয়ারা জড়িত না থাকলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সম্ভব ছিল না। এজন্যই পুরস্কার হিসেবে জিয়া সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।’

ওবায়দুল কাদের বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মোশতাকের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনী এনে কে সংসদে পাস করিয়েছিল? কে বিচার বন্ধ রেখেছিল? কে খুনিদের দূতাবাসে চাকরি ও প্রমোশন দিয়েছিল?— জবাব দিন ফখরুল সাহেব।’

‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পুরস্কার হিসেবে জিয়া সেনাপ্রধান’

তিনি আরও প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণস্থলে শিশু পার্ক কে বানিয়েছিল? জয় বাংলা কেন নির্বাসনে ছিল? কেন ৭ই মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ ছিল? কেন মহানায়ক নির্বাসিত ছিলেন? ৩২ নম্বর ও টুঙ্গিপাড়া কেন নিষিদ্ধ ছিল? ঘোষণার পাঠককে কেন ঘোষক বানানো হয়েছিল? ফুটনোটকে বানানো হলো মহানায়ক। কেন এসব হয়েছিল— জবাব দিন ফখরুল সাহেব।’

তিনি বলেন, ‘পঁচাত্তরের পরে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছিল সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। এরপরে ইতিহাসের বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৮১ সালে মুজিবকন্যা স্বদেশে ফিরলেন। তখন থেকেই শক্তিশালীভাবে উচ্চারিত হতে শুরু করে জাতির পিতা হারানোর বেদনার কথা, সেই বেদনা থেকে উৎসারিত হয় ক্ষোভ। ক্ষোভের অগ্নিমশাল ইতিহাস খুঁড়ে সত্য বের করে আনে।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শেখ হাসিনা জেগে আছেন বলেই বাংলাদেশ শান্তিতে আছে। তিনিই আমাদের সংস্কৃতির পুরোধা এবং অভিভাবক। ৭৫-৯৬ এই একুশ বছর আমাদের সংস্কৃতির অনেক কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যতদিন বাংলায় চন্দ্র, সূর্য উদয় হবে, যতদিন বাংলা নামের দেশ থাকবে বিশ্ব মানচিত্রে, ততদিন বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার ক্ষমতা কারও নাই।’

সভাপতির শোক সম্ভাষণে আতাউর রহমান বলেন, ‘বিশ্ব ইতিহাসে বহু রাষ্ট্রনেতা ও জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের নজির আছে। কিন্তু আমাদের জাতির পিতার মতো সপরিবারে নৃশংস হত্যার শিকারের নজির দ্বিতীয়টি নেই।’

সংস্কৃতিবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সচিব অসীম কুমার উকিল এমপি তার অনানুষ্ঠানিক প্রারম্ভিকতায় ১৫ আগস্টের সকল শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘একদিন যদি বাংলাদেশ নামক দেশটি সাগরতলে বিলীনও হয়ে যায়, যদি একজন বাঙালি জীবিতও না থাকে, পৃথিবীর চলমান সভ্যতার ধারাবাহিকতা যদি বহাল থাকে, যদি পৃথিবীর কোনো প্রান্তে ভূগোল পড়ানো হয় কিংবা যদি একজন ছাত্রও বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস পাঠ করে, তাহলেও সভ্যতা নামক সময়কে ধারণ করা ইতিহাসের পাতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার প্রধানতম পুরুষ হিসেবে শেখ মুজিবের কথা পড়তে হবে। বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কথা পড়তে হবে।’

‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পুরস্কার হিসেবে জিয়া সেনাপ্রধান’

তিনি বলেন, ‘বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমাদের জাতির পিতা পৃথিবীর সভ্যতার সাথে পাল্লা দিয়ে আলোচিত হবেন, চর্চিত হবেন দুনিয়া জুড়ে। রক্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাদের এই সভ্যতাকে বাধ্য করে গেছেন তাকে অবনত মস্তকে স্মরণ করতে, শ্রদ্ধা করতে এবং তার জন্য অশ্রু বিসর্জন দিতে।’

স্বনামধন্য কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘শেখ মুজিব ১৯৭৫’ কবিতা থেকে তুলে ধরেন—

‘আমার সমস্ত শ্রদ্ধা একটি নামের মধ্যে, বাংলাদেশ
আমার সমস্ত রক্ত একটি অভীষ্ট জ্ঞানে, স্বাধীনতা
আমার সমস্ত অগ্নি একটি পরম সত্যে, ভালোবাসা
আমার সমস্ত ঘৃণা প্রতিশোধে অবিরাম যুদ্ধরত
আমার সমস্ত শক্তি একটি নতুন অস্ত্রে, শেখ মুজিব।’

তিনি বলেন, ‘আগস্ট এলেই মনে হয় এই বুঝি এলো হায়েনার দল, শকুনের দল। তারা আসেও বারবার। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক এবং রক্তের উত্তরাধিকার বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে।’ কবি আবু বকর সিদ্দিকের ‘রক্তের পতাকা’ কবিতার ভাষায় নির্মলেন্দু গুণ বলেন-

‘দস্যুরা এখনো সোচ্চার
রুখো তাদের উদ্ধত খঞ্জর
জয় বাংলা, জয় বাংলা বলে
শক্ত হাতে ধরো রক্তের পতাকা।’

‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পুরস্কার হিসেবে জিয়া সেনাপ্রধান’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন আসাদুজ্জামান নূর, ডালিয়া আহমেদ ও শিমুল মুস্তাফা। সর্বশেষে বাংলাদেশ পুলিশ নাট্যদলের অভিনীত অভিশপ্ত আগস্ট নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। নাটকটি রচনা করেছেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান এবং পরিচালনা ও অভিনয়ে ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, উপ-দফতর সম্পাদক সায়েম খান, সদস্য অ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন এমপি, অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার, সাহাবুদ্দিন ফরাজী, সৈয়দ আবদুল আওয়াল শামীম, আজিজুস সামাদ আজাদ ডন।

এছাড়াও ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ, সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আফজালুর রহমান বাবু, যুব মহিলা লীগ সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপিকা অপু উকিল, কৃষক লীগের সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ, মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি লায়ন সাইদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর লস্কর। এর বাইরেও সংস্কৃতিবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্যরাসহ সমাজের বিশিষ্ট নাগরিকেরা শোকানুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সারাবাংলা/এনআর/পিটিএম





Source link