পরিচ্ছন্নতা এবং উপলব্ধিবোধ জাগ্রত করার প্লাটফর্ম হিসেবে BD Clean

4934


ছোটবেলা থেকে পাঠ্যপুস্তকে আমাদের পরিবেশ এবং আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ঠিক কতোটা মেনেছি আমরা? আমাদের মধ্যে সেই চিন্তাধারা জাগ্রত করার প্রয়াস থেকেই BD Clean এর যাত্রা শুরু এবং আজ এটি অনেক বড় একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। 

ইয়ুথ স্কুল ফর সোশ্যাল এন্ট্রেপ্রেনারস (ওয়াইএসএসই) আয়োজিত বহুল আলোচিত অনুষ্ঠান “বিহাইন্ড দা জার্নি”র ৫৪তম এপিসোডে একজন বিশেষ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, বিডি ক্লিনের ফাউন্ডার এবং প্রতিষ্ঠাতা ফরিদ উদ্দিন। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন ওয়াইএসএসই এর অপারেশনস ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট এর ইন্টার্ন রাইসা রিয়াজ

ওয়াইএসএসই একটি সামাজিক সংস্থা যা দেশের তরুণ তরুণীদের যাবতীয় উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তা এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজের ওপর লক্ষ্য রেখেই ওয়াইএসএসই এর এই যাত্রা শুরু। বিডি ক্লিন এর মধ্যে অন্যতম।

করোনাকালীন সময়:

অনুষ্ঠানের শুরুতেই অতিথি ফরিদ উদ্দিন স্যার কে জিজ্ঞেস করা হয় তার লকডাউনকালীন সময়ের কথা। এর উত্তর সাধারণ মানুষের উত্তর থেকে একটু আলাদা। কেননা তার ভাষ্যমতে, লকডাউন বলে তাদের কিছু ছিলো না। এটিকে একধরণের “এক্সট্রা টাইম” হিসেবে ধরেছেন তিনি যেখানে বিভিন্ন জেলায় গরীব দুঃখীদের পাশে দাঁড়িয়ে দিন রাত করে গেছেন তিনি এবং বিডি ক্লিন টিম।

কুরবাণীর ঈদ এবং বর্জ্য নিষ্কাসন:

আমাদের দেশে কুরবাণীর ঈদের সময়ে প্রচুর পরিমাণ ময়লা আবর্জনা তৈরি হয়। পশুর মাংস, চামড়া, হাড্ডি, তেল-চর্বি এবং রক্তে একাকার হয়ে থাকে রাস্তাঘাট। এক্ষেত্রে পরিষ্কার পরিচ্ছণতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে বিডি ক্লিন এর সদস্যরা কীভাবে কাজ করেছেন প্রশ্নের জবাবে অতিথি জানান, বিডি ক্লিনের সদস্যরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। অন্যের জন্য হোক বা নিজের জন্য, কুরবাণীর সময় অনেককেই বিডি ক্লিনের টিশার্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। কুরবাণী শেষে তা পরিষ্কার হওয়া অব্দি সদস্যরা সেখানেই উপস্থিত থাকে যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

কুরবাণীর যেসব এলাকা এখনো পরিষ্কার হয়নি, তাদের নিয়ে অতিথি কিছু অসাধারণ উপদেশ দিয়েছেন। যেহেতু পশুর মাংস পঁচে যাওয়া মাংস গন্ধযুক্ত হয়, তাই ১ম দিন ই সেই বর্জ্য পরিষ্কার করা ভালো। পলিথিনে পলিবদ্ধ করে এবং পানি দিয়ে ভালো মতোন পরিষ্কার করা যেতে পারে। এছাড়াও গ্রাম এলাকায়, ময়লাগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা যেতে পারে। আগামী ঈদগুলোর জন্য সবার কাছে ফরিদ উদ্দিন স্যারের এ আহবান ই থাকবে।

পেছনের গল্পটি:

বিহাইন্ড দা জার্নি- পর্ব-৫৪: পরিচ্ছনতা এবং উপলব্ধিবোধ জাগ্রত করার প্লাটফর্ম হিসেবে BD Clean

বিহাইন্ড দা জার্নি- পর্ব-৫৪: পরিচ্ছনতা এবং উপলব্ধিবোধ জাগ্রত করার প্লাটফর্ম হিসেবে BD Clean

বিডি ক্লিন প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্পটিকে তিনি এক লাইনে ছোট করে তুলে ধরেছিলেন-

“উপলব্ধিবোধ ও ডাস্টবিন সমন্বয় ঘটানো”

অতিথি আরো জানান, ২০১৬ সালে ঢাকার রাস্তায় যখন ডাস্টবিন বসানো হয়েছিলো, তখন কেউ ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতো না। অনেকেই ব্যাপারটিকে উপেক্ষা করে চলে যেতো। মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্ন একটি শহরের উপলব্ধিবোধ জাগ্রত করার জন্য ২০১৬ সালে ৩ জুন বিডি ক্লিনের যাত্রা শুরু হয়। রাত ১২টায় শুরু করে সারা রাত শাহবাগ থেকে এ পরিচ্ছন্ন মিশন শুরু হয়। পরের দিন সকালবেলা তৈরি করা হয় ফেসবুক পেজ এবং কাজের ছবিগুলো তৎক্ষণাৎ সেখানে আপলোড হয়ে যায়। তবে, তখন শুধু ঢাকা পরিষ্কারের ইচ্ছা পোষণ করে বিডি ক্লিনের নাম ছিলো “ঢাকা ক্লিন”। কিন্তু অন্য জেলার মানুষের উৎসাহে ১ম বিভাগ বিডি ক্লিন বরিশাল এবং ১ম জেলা বিডি ক্লিন গোপালগঞ্জ খোলা হয়। সে থেকে এখন পর্যন্ত যাত্রাটি অত্যন্ত সফল। বর্তমানে প্রায় সারাদেশে ৫৩টি জেলায়, ১০৯টি উপজেলায় বিডি ক্লিন টিম কাজ করছে। 

বিডি ক্লিন এবং সিটি কর্পোরেশন:

সিটি কর্পোরেশন এর কাজের বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, দেশের পরিষ্কার পরিচ্ছনতা বজায় রাখতে সিটি কর্পোরেশন কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষের মানসিকতায় কোন পরিবর্তন আসছে না। বিডি ক্লিন এখানেই কাজ করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে তিনি সিটি কর্পোরেশন কর্মীদের স্যালুট জানিয়ে বলেছেন, তাদের কাজ কঠিন এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরী।

প্রশ্নোত্তর:

অনুষ্ঠানের কিছু অংশে উপস্থাপিকা দর্শকদের প্রশ্নগুলো নিয়ে থাকেন এবং অতিথি জবাব দিয়ে থাকেন।

প্রশ্ন-১:

বৈশ্বিক উষ্ঞায়ন মোকাবিলায় বিডি ক্লিন এর ভূমিকা কী?

উত্তর: পরিষ্কার পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তন এ ভূমিকা রাখে। এরই উদ্দেশ্যে এ বছর বিডি ক্লিনের বার্ষিকীতে প্রতি সদস্য ৫টি করে গাছ লাগিয়েছেন। এভাবে লাখ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। এছাড়াও, বিডি ক্লিনের কোন সদস্য তাদের জন্মদিনে কেক কাটেন না। এর পরিবর্তে তারা দেশ ও জাতির উদ্দেশ্যে কাজ করেন। এর মধ্যে গাছ লাগানো অন্যতম।

প্রশ্ন-২:

বিডি ক্লিনে কাজ করতে গিয়ে আপনি কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?

উত্তর: বিডি ক্লিন চলাকালীন সময়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ লক্ষ্য করা গেছে। তরুণদের এ বয়সটি অনেকটা খামখেয়ালী এবং নাছোড়বান্দা। বিডি ক্লিনের কিছু পলিসি আছে যা তরুণদের দিয়ে মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হয়েছে। কিন্তু দিনশেষে সবাই মেনে নিয়েছে এবং দেশের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রশ্ন-৩: বিডি ক্লিন কী দেশ পরিষ্কার করেই থেমে যাবে?

উত্তর: এখন যেহেতু মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, পরবর্তীতেও একই ইচ্ছা থাকবে বিডি ক্লিনের। এক্ষেত্রে অল্প অল্প করে সব সমস্যার সমাধান বের করা হবে।

প্রশ্ন-৪: পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের কীভাবে সচেতন হতে হবে?

উত্তর: সবার আগে যেখানে সেখানে ময়লা যত্রতত্র ফেলানো বন্ধ করতে হবে। একটি পলিথিনে করে ময়লা ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিজেকে সচেতন হতে হবে এবং অন্যকে সচেতন করতে হবে।

প্রশ্ন-৫: শুধু স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েই কী একটি জাতিকে পরিবর্তন করা সম্ভব?

উত্তর: বিডি ক্লিন স্বেচ্ছাসেবা প্রদান করে না। এ কাজের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের মানসিকতার পরিবর্তন এনে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই বিডি ক্লিনের কাজ। 

বিডি ক্লিন এবং তরুণ সমাজ:

বিডি ক্লিনের কার্যক্রমে তরুণ সমাজের ভূমিক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অতিথি জানান, তরুণদের নিয়েই বিডি ক্লিনের যাত্রা শুরু হয়েছিলো এবং তারাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে এ কাজে। এটি একটি তরুণদের প্লাটফর্ম এবং তারাই পারবে revolution ঘটাতে। তাদের দ্বারা তাদের পরিবারও সচেতন হচ্ছে। 

যোগ দেয়ার পদ্ধতি:

বিহাইন্ড দা জার্নি- পর্ব-৫৪: পরিচ্ছনতা এবং উপলব্ধিবোধ জাগ্রত করার প্লাটফর্ম হিসেবে BD Clean

বিহাইন্ড দা জার্নি- পর্ব-৫৪: পরিচ্ছনতা এবং উপলব্ধিবোধ জাগ্রত করার প্লাটফর্ম হিসেবে BD Clean

বিডি ক্লিনে সব বয়সী সব পেশার মানুষ অংশগ্রহণ কর‍তে পারবে। এটি একটি উন্মুক্ত প্লাটফর্ম। তবে একজন পার্মানেন্ট সদস্য হওয়ার জন্য অবশ্যই বিডি ক্লিনের কিছু রুলস আছে যা তাদের মেনে নিতে হবে। যোগদানের পদ্ধতি হিসেবে উৎসাহী যেই জেলার মানুষ, সেই জেলার বিডি ক্লিনের পেজে একটি মেসেজ দিতে হবে এবং তাকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়া হবে বলে জানান অতিথি। এক্ষেত্রে, তার দায়িত্বশীলতা অনেক বড় প্রায়োরিটি।

র‍্যাপিড ফায়ার রাউন্ড:

(১) নিজেকে টি শব্দে বর্ণনা করুন-

= Dedicated, ধৈর্যশীল এবং self conscious।

(২) আপনার কাছে সফলতার সূচক কোনটি?

= লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন।

(৩) বিডি ক্লিন প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা-

= পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ

(৪) সমাজে কোন পরিবর্তন আনতে চাইলে সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি?

= নাগরিক অসচেতনতা।

(৫) প্রিয় ব্যক্তিত্ব-

= আমার বাবা।

(৬) জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা-

= ৩০২৪৬ জন মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছি।

(৭) দেশে কোন পরিবর্তন আনতে চান?

= উপলব্ধিবোধ জাগ্রত করা।

(৮) প্রিয় উক্তি-

“সরকার বা প্রশাসন নয়, নাগরিক সচেতনতাই পারে পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।”

“মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন

মানুষ হইতে হবে” — এই তার পণ,”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:

বিডি ক্লিনের লক্ষ্য একটাই। পরিষ্কার সমাজ এবং জাগ্রত মানসিকতা। এ লক্ষ্য অর্জন করে শীঘ্রই বাংলাদেশ ও দেশের নাগরিকদের সারা বিশ্বের কাছে মূল্যবান করে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় ভবিষৎের প্লান বলে জানিয়েছেন ফরিদ উদ্দিন স্যার।

দেশের তরুণদের প্রতি মেসেজ হিসেবে অতিথি জানান, বিডি ক্লিনের সাথে একসাথে যেকোন প্লাটফর্ম এ এসে যুক্ত হয়ে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশ ও দশের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। কারণ তরুণ রাই পারবে দেশ ও জাতিকে সচেতন করতে এবং যেকোন সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করতে।

সাম্প্রতিক এওয়ার্ড:

বিডি ক্লিন সম্প্রতি রোটারি স্পিরিট এওয়ার্ডভুক্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে অতিথির মনোভাব জানতে চাওয়ায় তিনি জানান, তাদের কোন ধারণাই ছিলো না তারা এ এওয়ার্ড এর জন্য মনোণিত হয়েছেন। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনে এ এওয়ার্ডটি অবশ্যই সবাইকে নতুনভাবে ভালো মতোন কাজ করার উৎসাহ প্রদান করেছে।

শেষ কথা:

অনুষ্ঠানের শেষে অতিথি ওয়াইএসএসই এর কার্যক্রম নিয়ে প্রশংসা করেন এবং দর্শক দের উদ্দেশ্যে বলেন, উদ্যোগ নিলেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। Determination এবং ধৈর্য হতে হবে মূল শক্তি। এর মধ্যেই আমাদের দেশের বেকারত্বের সমস্যার নিস্তার পাওয়ারও সমাধান আছে বলে জানান তিনি। এছাড়াও, দর্শকদের কাছে ধন্যবাদ জানিয়ে করোনাকালীন সময়ে মাস্ক পড়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি তার কথা শেষ করেন। 

পরিশেষে, ওয়াইএসএসই পরিবার বিডি ক্লিন এবং ফরিদ উদ্দিন স্যার কে সাধুবাদ এবং ভবিষ্যৎ এর জন্য শুভকামনা জানায়। 

 

সাবিকুন্নাহার আফরা

ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট

YSSE 



Source link