নিয়তি

201

আমার কাছে এই জীবন মানে কী? এই প্রশ্নটা নিজেকে কখনওই করা হয়ে ওঠেনি! গোটা একটা সুন্দর দিন পার করে, রাতের নির্জনতায় কিছু আত্মতৃপ্তি, কিছু একান্ত সুখ, কিছুটা প্রকৃতিসঙ্গে নিজেকে একটুখানি জানার নামই একসময় জীবন ভাবতাম। রাতের অন্ধকারে জোনাকপোকার নিভু নিভু আলো দেখলে মনে হতো, আমাকে একপলক দেখার জন্যই বুঝি আলো জ্বেলেছে ওরা! চাঁদটা যখন ঘুমন্ত পাতাগুলির গা চুঁইয়ে জ্যোৎস্না ঢালত, তখন মনে হতো, আমি গায়ে আলো মাখব বলেই তার এত অকাতরে বিসর্জন! বাগানের সদ্যোজাত কলিগুলো যখন প্রথমযৌবনে পা রাখত, তখন ভাবতাম, আমায় সুরভিত করার জন্যই তাদের নতুন জন্ম হয়েছে বুঝি! ভোরের ধ্রুবতারাটা যখন চাঁদের পাশে নিঃসঙ্গ এক নভোচারী, তখন আমি ভাবতাম তার দিকে চেয়ে চেয়ে, সে বোধহয় আমার সঙ্গী না হতে পারায় বড্ড বিষণ্ণ! কোকিলের কণ্ঠে বেজে-ওঠা আগমনী গান বুঝি আমায় বসন্তের ঠিকানাটা দিয়ে যাবার জন্যই ধ্বনিত হয়েছে!

এককথায় বলতে গেলে, আমি ছিলাম সত্যিকার অর্থেই ভীষণ স্বার্থপর, প্রকৃতিগত সব ঐশ্বর্য শুধুই আমার নিজের করে চাইতাম, সেখানে অন্য কারও কোনও অংশীদারিত্ব ছিল না; বলতে পারেন, হতে আমিই দিইনি

আমার জীবনে খুব বেশি মানুষের উপস্থিতি ছিল না, কোনও মোটিভেশনেরও ছিল না কোনও প্রয়োজন, হয়তো আপনাদের মনে হতে পারে, আমার এই ছোট্ট জীবনে কতটুকুই-বা এই রহস্যময় পৃথিবীকে জানা হলো! এর উত্তরে একটা কথা বলি, আমার এই জীবনে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, জীবনকে যেভাবে কাছ থেকে দেখেছি, আর যা-যা পেয়েছি, তা হয়তো অনেকের চল্লিশের ঘরে পা রেখেও হয়নি! আমার এই স্বল্পর্দৈঘ্যের জীবনে এমন কিছু মুহূর্তের, এমন কিছু ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এসেছি, তা হয়তো কারও সারাজীবনেও পাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। এক্ষেত্রে আমার জীবন ঈর্ষণীয় সৌভাগ্যের অধিকারীই বটে! তবে কী জানেন, এত অমূল্য, এত দুর্লভ কিছু যে পাব, তা আমি কখনওই ভাবিনি, আমার জীবনে চাওয়ার থেকে পাওয়ার পাল্লাটা তাই বরাবরই ভারী। যা-ই পেয়েছি, তার সিংহভাগই ঐশ্বরিকভাবে পেয়েছি, তাই সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ সবকিছুর জন্য। একটা প্রশ্ন খুব নাড়া দিচ্ছে, তাই না…এমন একটা কিছুও কি ছিল না, যেটা আমি মুখে না বললেও মনে মনে হলেও চেয়েছি? হা হা হা হা…

একটা মজার কথা বলি। আমার নিজের জীবন সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানতাম না, অতটা গহীনে হেঁটেই দেখিনি কখনও! কিন্তু একটা জিনিস আবিষ্কার করেছি…বলতে পারেন, প্রমাণও পেয়েছি প্রতিবার, তা হলো, কিছু জিনিস ছিল, যা একবার পাবার পর এতটাই ভীত ছিলাম যে দ্বিতীয়বার যেন অমন আর না হয়, তার জন্য সব রকমের চেষ্টাই করেছিলাম! তবু তা যেন আমার জন্য অবধারিতই ছিল! হতেই হবে, আসতেই হবে, রীতিমতো এমন কিছু! সেখানে আমার ভয়, শঙ্কা, না পেতে চাওয়ার কোনও স্থানই নেই! এমনও হয়েছে…আমার চাওয়ার পূর্ণ একটা সকাল যেখানে হতো, একটা প্রাণোচ্ছল দুপুর যেখানে গড়াত, যে নির্জন রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম, যেখানে আমার স্বার্থপরতার প্রখরতা সুস্পষ্ট, সেখান থেকেই কিনা সবকিছু ছেড়েছুড়ে অনেক দূরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম! ভেবেছিলাম, এই অসহ্য সুখ সইতে না পারার ভয় আর তাড়া করবে না! কত বড়ো বোকা আমি, তাই না!

এতটা যুক্তিহীন চিন্তা কোনও বোকা ছাড়া আর কে-ইবা করতে পারে! বুঝতেই পারিনি তখন, এই ছোট্ট পৃথিবীটা গোল, সে ঘুরতে ঘুরতেই কোনও-না-কোনও সময় ঠিকই চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে, আমিও এর ঊর্ধ্বে নই! ভাবছেন হয়তো, কী এমন জিনিস, কী এমন সময়, যার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আমার এত চেষ্টা? হয়তো মনে হচ্ছে,…সত্যকেই-বা কেন ভয় পেয়েছিলাম? সত্য তো শুধু সত্যই হয়! যার মাঝে মুক্তি নিহিত, সেই সত্য থেকে পালিয়ে কেন বেড়াতে চেয়েছি? সত্যিই কি সব সত্যে মুক্তি আছে?

তবু এই সত্যকে যে আমি বড্ড বেশিই ভালোবাসি, তাই না চাইতেও হারানোর ভয় যে নিয়ম মেনে আমাকে তাড়া করে ফেরে, এই সত্যে যে অসীম সুখের বাস, এত সুখ সইতেই যে পারব না আমি, এইসব ভয় নিয়ে না সত্যকে গ্রহণ করা যায়, আর না ত্যাগ করা যায়! দোটানায় জীবনযাপনমাত্রই খুবই দুর্বিষহ, অনেকটা মধ্যবিত্তের যাপিত জীবনের মতো! না গিলতে পারে, আর না উগরে দিতে পারে, জীবন এমনও তো হয়! কারও হাতে হাত রেখে একটু বিশ্বস্ততার সুরে কষ্টগুলো ভাগ করেও নিতে পারে না শত চাওয়া সত্ত্বেও,—আমার অবস্থাটা ছিল ঠিক এরকম। তখন মনে হয়েছিল, অসীম দূরত্বে চলে যাই, তাহলে হয়তো জীবনের একটা ধরনে বাঁচতে পারব!

জীবনের মোটামুটি চারটা ধরন হয়।
প্রথম ধরনে, জীবন সুখের সঙ্গী হয়, সেখানে সুখের পাল্লাটাই বেশি ভারী হয়।
দ্বিতীয় ধরনে, জীবন দুঃখের সঙ্গী হয়, যেখানে কান্না আর দীর্ঘশ্বাসের সতত বাস।
তৃতীয় ধরনে, জীবন সুখ-দুঃখের সমন্বয়ে হয়, সেখানে কখনও সুখ, কখনও দুঃখ মিলেমিশে থাকে।
চতুর্থ যে ধরনটা, সেখানে জীবন না পায় সুখ, না পায় দুঃখ, আর না থাকে সুখ-দুঃখের তেমন একটা সহাবস্থান! এই জীবনটাকে আপনারা দোটানার জীবন, শঙ্কাগ্রস্ত জীবন বা মধ্যবিত্তের জীবন যেভাবে ইচ্ছা সংজ্ঞায়িত করতে পারেন।

তাই বলি কী, জীবনে হয় অনেক ধনী হবেন না হয় দরিদ্র, মধ্যবিত্ত আদলের হাতে জীবনটাকে সমর্পিত করবেন না, ওতে বাঁচতেই বড়ো কষ্ট!

আসলে, কখনও কারও ভালোবাসা পাব, আমি কাউকে ভালোবাসব, কাউকে মনে করে আমার সকালটা শুরু হবে, কারও সাথে দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটিতে আমার বিকেল গড়াবে, কারও চোখে স্বপ্ন হয়ে রাত্রি নামবে এমন ভাবনা, অনুভূতি, চাওয়া কোনও কালেই আমার ছিল না! সেটা কীরকম, বলি…

আমার জন্য কেউ যত যা-ই করত না কেন, আমি সেটাকে সব সময়ই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতাম, কখনওই আমার প্রতি এটা কারও দুর্বলতা হিসেবে ভাবতাম না। ভালোবাসার প্রথম শর্তই হলো, অপর পাশের মানুষটার দৃষ্টিতে বা বিচারে নিজের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করা, অর্থাৎ সে আমার প্রতি দুর্বল, এমন একটা অনুভূতি তৈরি হওয়া! সেটাই আমি করতাম না কখনও! আমার হিসেবের ধরন বরাবরই সরল-সাদামাটা ছিল

বিয়ে, স্বামী, সংসার, সন্তান এসব আমার ভাবনার মধ্যে কখনও আসেনি; সত্যি বলতে, মনে মনেও চাইনি। চাওয়ার মধ্যে পড়ালেখা আর প্রকৃতিই ছিল আমার একমাত্র বিষয়বস্তু।