নির্বাচন এলেই বাংলাদেশে নির্যাতিত হন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ সংখ্যালঘুরা: শুনানিতে মার্কিন কংগ্রেসের হিউম্যান রাইটস

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : মার্কিন কংগ্রেসে ‘টম ল্যান্টস হিউম্যান রাইটস কমিশন’র উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে নির্বাচন এবং মানবাধিকার’ শীর্ষক এক আলোচনায় বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডে ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে বলে অভিযোগ করা হলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া এডভোকেসী ডিরেক্টর জন সিফটন অভিযোগ করেছেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। গুম-খুনের ঘটনাও ঘটছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক। বিরোধী দলের লোকজন নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে সক্ষম হচ্ছে না স্বাভাবিকভাবে। বিশেষ বাহিনীর দমন-পীড়নে ভীত-সন্ত্রস্ত অনেকে। র‌্যাব কর্তৃক বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ এবং অবিলম্বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীকে এহেন নির্দয়-নিষ্ঠুর-পৈশাচিক আচরণ থেকে বিরত করা উচিত। এমনকি গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে এমন ভয় আর ভীতি। ফলে সাংবাদিকরা ঠিকমত কাজ করতে সক্ষম হচ্ছেন না। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বাংলাদেশে একদলীয় শাসন-ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।’ ‘সাংবাদিক শহীদুল ইসলামকে অবশেষে জামিন প্রদান করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে হুমকি দেয়া হয়েছে উচ্চতর আদালতে আপিল করার’-উল্লেখ করেন সিফটন। নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতির অবসানে মার্কিন কংগ্রেসকে ভ’মিকা রাখার উদাত্ত আহবান জানিয়ে সিফটন বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে পরবর্তীতে যে সরকার ক্ষমতা নেবে তাদের বৈধতা থাকবে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর রাখতেই অবাধ-সুষ্ঠু পরিবেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই’-মন্তব্য সিফটনের। জন স্টিফটন জাতিসংঘে বাংলাদেশের ট্রুপস নিষিদ্ধ করার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘যারা প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লংঘনের সাথে জড়িত, তারা শান্তিরক্ষায় থাকা উচিত নয়।’

১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে ‘র‌্যাবার্ণ হাউজ বিল্ডিং’এর এ আলোচনায় ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের আহবানের পরিপূরক মতামত/মন্তব্যই করা হলো। হোস্ট সংস্থাটির কো-চেয়ার ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র‌্যান্ডি হাল্টগ্রেন এবং ম্যাসেচুসেট্্স অঙ্গরাজ্যের ডেমক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জেমস পি ম্যাকগভার্ণ শুনানীতে ছিলেন না। তাদের বিবৃতিতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে সজাগ হবার আহবান এবং ৮ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা রিফ্যুজিকে আশ্রয় প্রদানের জন্যে সরকারকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। এতে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে যে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড চালাচ্ছে র‌্যাব। সংবাদ সংস্থা রয়টারের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা বলেছেন, এ বছর মে থেকে আগস্টের মধ্যে ২০০ লোক নিহত হয়েছে র‌্যাবের হাতে। মাদক নির্মূলের আড়ালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির অভিযোগও করা হয়েছে।

!-- Composite Start -->
Loading...

এ সময় ঢাকা থেকে সম্প্রতি বদলি হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকেট, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, বাংলাদেশ দূতাবাসের উপ-প্রধান মাহবুব সালেহ, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের গোলাম দস্তগীর, আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট অমর ইসলাম, যুবলীগের সেক্রেটারি জাহিদ হোসেন প্রমুখ ছিলেন ফ্লোরে। এছাড়াও লন্ডন থেকে এসেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী হিসেবে খ্যাত ব্যারেস্টার টবি ক্যাডমেন প্রমুখ।

অপর আলোচক ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের পলিসি এনালিস্ট ওয়ারিস হারিস বলেন, নিকট প্রতিবেশী অন্যদেশগুলোতে ঠাঁই না পেলেও বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে রোহিঙ্গাদের, এটি অবশ্যই প্রশংনীয় একটি ঘটনা। ছোট্ট একটি দেশ, যেখানে ১৬ কোটি মানুষ বাস করছে, সেই ঘিঞ্চি অবস্থার মধ্যেই প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মহানুভবতা দেখিয়েছে তাকে অবজ্ঞার অবকাশ থাকতে পারে না।

ওয়ারিস বলেন, আমরা এখানে আলোচনা করছি, মতামত ব্যক্ত করছি, এর সাথে মার্কিন প্রশাসনের নীতি-নির্দ্ধারণের কোন যোগসূত্র নেই। আমরা স্বাধীনভাবে যা পর্যবেক্ষণ করছি তার ওপরই আলোকপাত করছি, যাতে কংগ্রেস আমাদের এ আলোচনায় কিছুটা তথ্য-উপাত্ত পায়। তবে, নির্বাচন এলেই বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিগৃহিত হন। ধর্মীয় উগ্রপন্থিরা রাজনৈতিক মতলবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের ওপর চড়াও হয়। হারিস বলেন, নির্বাচন এলেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অত্যাচার-নির্যাতন আর হুমকি-ধমকির মুখে পড়েন-এটি অনেক দিন থেকেই চলে আসছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময়েই বাংলাদেশের হিন্দু, খ্রিস্টান আন বুদ্ধরা আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের ব্যবসা, বাড়ি-ঘর লুট করা হয়েছে। সে সময়ের বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এমন বর্বরতা চালায়। তার পরিপ্রেক্ষিতেই আসন্ন নির্বাচনে যাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় সে আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। ঐক্যপরিষদের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে হারিস আরো বলেন, গত ৩ বছর ধরে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু আক্রান্তের হার কমছে। ২০১৬ সালে ছিল ১৫০০, ২০১৭ সালে ১০০০ এবং চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এ ধরনের হামলার ঘটনা ৩৮০টি ঘটেছে। আমার মনে হচ্ছে সরকার এবং নিরাপত্তা সংস্থা কর্তৃক সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনের যে জিরো টলারেন্স অবলম্বন করা হয়েছে তারই সুফল এটি।

এ আলোচনায় অংশ নিয়ে অপর প্যানেলিস্ট ওয়ার্ল্ড ভিশন ইউএসএ’র চাইল্ড প্রটেকশন এ্যান্ড এডুকেশন বিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার লোরা ব্র্যামোন বলেছেন, শিশুদের নিরাপত্তায় আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা খুব একটা নেই। বিশেষ করে বাল্য বিয়ের ঘটনা এখনও বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে ঘটেই চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা রিফ্যুজির মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশু নানাভাবে নিগৃহিত হচ্ছে। মাদক-ব্যবসার বাহনেও পরিণত করা হচ্ছে অসহায় শিশুদের। এমনকি দরিদ্র পিতা-মাতার সন্তানেরা পাচারকারির খপ্পড়ে পড়ছে। এ ব্যাপারে সরকারসহ সকল মহলের আন্তরিকতা প্রয়োজন।

লোরা বলেন, বাংলাদেশে আমরা কাজ করছি শিশু, পরিবার, সরকার এবং ধর্মীয় নেতাদের সাথে। বাড়ি, স্কুল এবং কর্মস্থলে শিশুরা যাতে নিরাপদ থাকে সে চেষ্টা করা হচ্ছে। শিশুশ্রম হ্রাসে আমাদের এই সংস্থা বিপুল অর্থে প্রকল্প পরিচালনা করছে বাংলাদেশে। ইতিমধ্যেই আমরা ৩ শতাধিক শিশুকে বিভিন্ন ফ্যাক্টরী থেকে সরিয়ে স্কুলে নিয়ে গেছি। তাদের মা-বাবাকে পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে সরকারের সাথেও সুন্দর একটি সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক সক্রিয় রয়েছে।

পুরো আলোচনার সঞ্চালনায় ছিলেন থিঙ্কট্যাংক ‘ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমক্র্যাসি’র সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মোনা দেবি। ‘তিনি তার সূচনা বক্তব্যে বাংলাদেশের নির্বাচন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যে ভাষায় সমালোচনা করেছেন তার সমর্থন তেমনভাবে পাননি ৩ আলোচকের মন্তব্যে/বক্তব্যে’-এ অভিমত পোষণ করেন ফ্লোরে থাকা গোলাম দস্তগীর। দস্তগীর আরো বলেছেন, ‘এটি ছিল জামাত-শিবিরের মদদের একটি আলোচনা বা ব্রিফিং। সেজন্যেই নিউইয়র্কের শিবিরের এক ক্যাডারের সাথে এসেছিলেন বৃটিশ ব্যারিস্টার টবি ক্যাডমেন। টবি অবশ্য প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নেননি।’

ক্স সঞ্চালক মোনা বলেন, ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় গতকালই ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে গণমাধ্যম, শিক্ষার্থী, এ্যাক্টিভিস্ট এব্ং বিরোধীদের ওপর ক্র্যাকডাউন নেমে এসেছে।’

আলোচনা শেষে বাংলাদেশ দূতাবাসের উপ-প্রধান মাহবুব সালেহ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জন সিফটনের একটি প্রসঙ্গের সংশোধনী দিয়ে বলেন যে, আসন্ন নির্বাচনে বিদেশী পর্যটকদের সবসময় সাদর আমন্ত্রণের ঘোষণা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নির্বাচনের সময় কোন বাধা প্রদানের প্রশ্নই উঠে না। এছাড়া, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন। আরেকটি সংশোধনী দিয়ে মাহবুব সালেহ বলেছেন, সুনির্দিষ্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে কারাদন্ড দিয়েছে বাংলাদেশের আদালত। আদালতের ওপর বর্তমান সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়নভাবে দন্ড প্রদানের তথ্যও ঠিক নয়। মাহবুব সালেহ শুনানীতে অংশগ্রহণকারিদের উদ্দেশ্যে আরো বলেছেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থেই সকল দলের সাথে সংলাপে বসেছে সরকার। সকলের মতামত নেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ যাদেরকে গ্রেফতার করেছে কিংবা মামলায় অভিযুক্ত করেছে, তাদের তালিকা সংগ্রহ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অন্যায়ভাবে কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল রয়েছে শতভাগ।

মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.