নতুন স্বপ্ন নিয়ে লাকি ইসলাম ও তার অসাধারণ এক উদ্যোগ

46


বাংলাদেশে সর্বদাই বিভিন্ন কারণে নারীদের ছোট করে দেখা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে এখনো কার্যকর উদ্যোগে পিছিয়ে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। এক্ষেত্রে অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যাংকের অবদান মাত্র ২৩ শতাংশ। এছাড়া পরিবার ও ব্যক্তিনির্ভরতার মাধ্যমে আসছে অর্থায়নের বড় অংশ। ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রেই এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়ন টেকসই হতে বাধাগ্রস্ত করছে।  

লৈঙ্গিক সমতা শুধু নারীদের বিষয়ই নয়, এটি একটি ব্যবসাসংক্রান্ত বিষয়ও বটে। বাংলাদেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ পেলে যে অতিরিক্ত জিডিপি অর্জিত হবে, তা জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার প্রতিবছরের মোট অর্থনীতির আয়তনের সমান। কিন্তু অর্থনৈতিক অর্জনের বাইরেও নারী নেতৃত্ব সমাজের জন্য পরিবর্তন ও অগ্রগতির অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাহ্যিক বিনিয়োগ উৎস পাওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার পাশাপাশি পেশাগত ও পারিবারিক চাহিদাগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য তাঁদের প্রায়ই দ্বিগুণ কাজ করতে হয়। পুরুষদের চেয়ে নারীদের বাড়ির বাইরে গিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করার সম্ভাবনা কম, যার ফলে তাঁরা ব্যবসায়িক বৃদ্ধি ও ক্রমোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক তৈরির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

বাংলাদেশের মেয়ে লাকি ইসলামের কথাই ধরা যাক। পরিবারগত অনেক বাঁধা থাকা সত্ত্বেও একজন দক্ষ ক্লথ ডিজাইনার হিসেবে লাকি তাঁর ব্যবসার পরিসর বৃদ্ধি করে পণ্যগুলো বেশিসংখ্যক গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফেসবুকে নিজস্ব পেইজ খুলেন। অনেক শ্রম, বিচক্ষণতা আর ত্যাগের মাধ্যমে লাকি ইসলামের ইচ্ছা তার ব্যবসার অতি ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে এক মহীরুহ রূপ ধারণ করবে। আজ আমরা জানবো এই অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর জীবনের গল্প, তাঁর উদ্যোক্তা হবার পেছনের ইতিহাস এবং ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর অভিমত।

ওয়াইএসএসইঃ আপনার এই উদ্যোগের পেছনে মূল কারণ কী? 

লাকিঃ দেখুন, আমাদের দেশে নারী বলতেই মানুষ মনে করে সে পরনির্ভরশীল। সব মেয়ের পরিবার থেকেই চায় তাকে একটি ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দিতে। যদিও তারা এটি মেয়ের ভালোর জন্যেই চিন্তা করে তবে একটা মেয়েরও নিজস্ব একটি জীবন রয়েছে, স্বাধীনতা রয়েছে। কেউ এটি চিন্তা করেনা যে, একটি ছেলের যা অর্জন করার সক্ষমতা আছে তা একটি মেয়েরও আছে। আমার মধ্যে এই ধারণাটি সর্বদা বিদ্যমান ছিল। আমি চাইনি কারও অর্থের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করতে। আমার এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, আমার স্বামীর যদি তার নিজের স্বাধীন ভাবে জীবনযাপন করার সুযোগ থাকে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ থাকে আমার কেনো তা থাকবেনা? এসকল চিন্তা ও ইচ্ছাই আমার উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের মূল কারণ।

ওয়াইএসএসইঃ আপনি এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণাটি কার থেকে পেয়েছেন?

লাকিঃ সত্যি বলতে উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছাটি নিজ থেকেই আসে আমার। প্রথম দিকে তেমন কাউকেই পাশে পাইনি, বিশেষ করে পরিবার হতে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম। তবে এখন আমার স্বামী আমার অনুপ্রেরণা, সে বরাবারই আমাকে সকল ধরণের সহায়তা করে থাকে।

ওয়াইএসএসইঃ কবে শুরু করেছেন আপনার এই কাজটি ও কি ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আপনার যাত্রা শুরু?

লাকিঃ চিন্তা ভাবনা যদিও বেশ আগে থেকেই ছিল তবে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে সবকিছু গুছিয়ে কাজটি শুরু করি। প্রস্তুতি বলতে শুরুর দিকে তেমন পুঁজি ছিলনা আমার। তাই তখন অর্ডার অনুযায়ী কাজ করতাম। এখন কিছু পুঁজি থাকাতে ভালোমতো কাজ শুরু করতে পেরেছি। 

লাকি ইসলামের ব্যবসায়ের বর্তমান চিত্র

লাকি ইসলামের ব্যবসায়ের বর্তমান চিত্র

ওয়াইএসএসইঃ আপনার ব্যবসায়ের বর্তমান চিত্রটি কিরূপ?

লাকিঃ বেশ ভালোই। এখন লকডাউন চলমান তাই কিছু ভোগান্তি পোহাতে হয় তা সত্যি। এজন্য এখন ব্যবসার যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনেই সম্পন্ন করতে হয়। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও গতানুগতিক উপায়ে অর্থাৎ অফলাইনে শুরু করবো।

ওয়াইএসএসইঃ ব্যবসা নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

লাকিঃ যেহেতু এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমার কাধেই, পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন কারোর থেকে কোনো সাহায্য নিচ্ছিনা, তাই কতদূর যেতে পারব বলা মুশকিল। তবে স্বপ্ন দেখি আজ হোক কাল হোক একটি ফ্যাক্টরি গড়ে তোলার।

ওয়াইএসএসিঃ নতুন প্রজন্মের উঠতি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সফলতার জন্য কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

লাকিঃ এ যূগের তরুণ-তরুণী দের ক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয় তারা পড়ালেখা শেষ হওয়া অব্দি পরিবার থেকে দেয়া অর্থ নিয়ে চলাফেরা করে। সবার ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই প্রযোজ্য নয়। তবে আমি মনে করি সকল শিক্ষার্থীদেরই উচিত উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরেই নিজের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে নেয়া। এতে করে পরনির্ভরশীলতা ও কমবে ও এটি তাদের আত্মবিশ্বাসী হতে সহায়তা করবে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্য সুবিধার কারণে কর্মক্ষেত্রে সমতা তৈরি হচ্ছে। এটি নারী উদ্যোক্তাদের একটি নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করেছে, এমনকি একনারীকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করছে, যেগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে যোগাযোগ কমিউনিটিকে ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ফেসবুকে ক্ষুদ্র ব্যবসার একটি বড় অংশের মালিকানা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন নারীরা। জরিপকৃত ৯৫টি দেশে আমরা দেখেছি যে ফেসবুকে ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকানা বা পরিচালনায় থাকা প্রতি ১০ জন ব্যক্তির জনই নারী (৩৯ শতাংশ)। যখন নারী উদ্যোক্তারা সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনের সুবিধা পাবেন, তখন তাঁরা অর্জিত জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি সম্মিলিতভাবে ব্যবসার ভবিষ্যৎ গড়তেও সক্ষম হবেন।

আপনি আমাদের অন্যান্য ব্লগ পরার জন্য এখানে ক্লিক করুনঃ

Noushin Islam

Intern, YSSE

 

 



Source link