ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির পরবর্তী ‘শিকার’ কে!

77


উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ময়লার গাড়ি কেড়ে নিয়েছে আরও এক প্রাণ। নটরডেম কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান বলতে গেলে মারা গেছে গাড়িতে ধাক্কার পরপরই। এর আগে এ বছরই আরও কমপক্ষে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়িতে ধাক্কা লেগেই। নিহতদের পরিবারগুলো বলছে, ময়লার গাড়ির চাকায় একের পর এক মানুষ পিষ্ট হওয়ার পরও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সিটি করপোরেশন। সেই সুযোগেই গাড়িচালকরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। আর তাতেই নিরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি।

বুধবার (২৪ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে গুলিস্তানে রাস্তা পারাপারের সময় সিটি করপোরেশনের গাড়ির ধাক্কায় ছিটকে পড়ে নিহত হয় রাজধানীর নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। মানবিক শাখার শিক্ষার্থী নাঈম ছিল মা-বাবার দুই সন্তানের মধ্যে ছোট। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে দেশের জন্য কাজ করবে। কিন্তু নির্মমভাবে তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ঘাতক ময়লার গাড়ি।

এর আগে, গত ২০ জানুয়ারি দুপুরে খালিদ ডেমরার বাসা থেকে পল্টনের অফিসে মোটরসাইকেলে করে আসছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) টেলিফোন অপারেটর খালিদ হোসেন (৫৫)। পথে রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় দয়াগঞ্জ মোড়ে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন তিনি। ট্রাফিক পুলিশ গাড়িসহ চালককে আটক করে কারাগারে পাঠালেও জামিনে বেরিয়ে আসেন চালক।

আরও পড়ুন-

ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির পরবর্তী ‘শিকার’ কে!

মাস তিনেক পর গত ১৬ এপ্রিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার বিবির বাগিচা এলাকায় সকাল ৮টার দিকে সিটি করপোরেশনের আরেক ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় অজ্ঞাতনামা এক রিকশাচালক নিহত হন। একই দুর্ঘটনায় আহত হন ওই রিকশার আরোহী হরেন্দ্র দাস (৭০)।

গত ৯ আগস্ট ফের সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি কেড়ে নেয় আরেকজনের প্রাণ। ওই দিন দিবাগত রাত ১টার দিকে রাজধানীর শ্যামপুরের ধোলাইপাড় সাবান ফ্যাকটরির গলি‌ এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় সেই ময়লার গাড়ির ধাক্কায় ফারুক হোসেন (৪০) নামে এক পোশাককর্মী নিহত হন।

নিহত ফারুকের ভাই রাজু জানান, গেণ্ডারিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন ফারুক। রাতে বাসায় ফেরার সময় ধোলাইপাড় সাবান ফ্যাকটরি গলি এলাকায় রাস্তা পার হতে গেলে সিটি করপোরেশনের একটি গাড়ি তাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বাড়ি রংপুরের কোতোয়ালি থানা এলাকায়। ধোলাইপাড় এলাকাতেই পরিবার নিয়ে থাকতেন ফারুক।

ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির পরবর্তী ‘শিকার’ কে!

এর আগে, ২০১৮ সালের ২৩ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে রাজধানীর পুরান ঢাকার বকশি বাজার এলাকাতেও সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নূরজাহান (২২) নামে এক মোটরসাইকেলআরোহীর মুত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। ওই দুর্ঘটনায় নূরজাহানের স্বামী মোটরসাইকেলচালক মো. আসিফ আহত হন।

ওই সময় আসিফ জানান, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি তাদের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিলে তারা দু’জনে রাস্তার দু’পাশে ছিটকে পড়েন। এক পর্যায়ে ময়লার গাড়িটি তার স্ত্রীর মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। স্ত্রীর মাথায় হেলমেট থাকা সত্ত্বেও হেলমেট ফেটে মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। পরে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির চালকেরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান। সন্ধ্যা নামলেই সড়কের উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি চালানো তাদের নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। তারা এমনভাবে গাড়ি চালান যেন তাদের পা ব্রেকে থাকে না। ময়লার এসব গাড়ি রীতিমতো ঘাতকে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের বুধবার রাতে সারাবাংলাকে বলেন, সিটি করপোরেশন অভিযোগের ভিত্তিতে এসব ঘটনা নিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারির ঘটনাটি নিয়ে সিটি করপোরেশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তদন্ত কমিটির সুপারিশে ওই চালককে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে এপ্রিলের ঘটনাটি নিয়ে কেউ আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। ফলে তদন্তও করা যায়নি। এছাড়া আগস্টের ঘটনাটিতেও কোনো অভিযোগকারী পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি আমাদের নজরেও আসেনি। নজরে এলে নিশ্চয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো।

ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির পরবর্তী ‘শিকার’ কে!

এবারে অবশ্য নাঈম হাসানের প্রাণহানির ঘটনায় প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর সিতওয়াত নাঈমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

আবু নাসের বলেন, মেয়র মহোদয় (ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস) এ দুর্ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। জিরো টলারেন্সের চেয়েও কঠোর কোনো অবস্থান থাকলে তিনি সেটিই নিতে বলেছেন। তার নির্দেশনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতিই কেবল নয়, আরও কোনো কঠোর শাস্তি থাকলে সেটিই নেওয়া হবে।

সন্ধ্যার পর থেকেই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলোর সড়কে উল্টো পথে চলার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসি’র এই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। তবে আপনি যেহেতু বলেছেন, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান সারাবাংলাকে বলেন, একটি ঘটনার পর সিটি করপোরেশন থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সবার আগে সেটি জানা জরুরি। যদি সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে বা চালকদের যথাযথভাবে বলা থাকে, তাহলে তো একের পর এক এরকম চাকায় পিষ্ট হওয়ার কথা না।

তিনি আরও বলেন, একটি ঘটনার পর যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার। সেই তদন্ত প্রতিবেদনে এসব ঘটনা রোধে দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার। সেটি হচ্ছে কি না, তা জানা প্রয়োজন।

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর





Source link