টানা দরপতনে দেশের শেয়ারবাজার

0
402

দেশের শেয়ারবাজারে চলছে টানা দরপতন। বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে। খোয়া যাচ্ছে মূলধন। এতে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে লেনদেন নেমেছে চরম খরা। এতে বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি লোকসানে পড়েছে মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউস এবং খোদ স্টক এক্সচেঞ্জও।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের শেয়ারবাজার খাদের কিনারায় নেমেছে। এর প্রতিবাদে মুখে কালো কাপড় বেঁধে স্টক এক্সচেঞ্জর সামনে কর্মসূচি পালন করে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদ।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে মন্দা থাকায় প্রায় সব শেয়ারের দর এখন তলানিতে। এমন সঙ্গিন অবস্থার মধ্যেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির দায়িত্বশীলরা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটের কারণেই দরপতন হচ্ছে। তা ছাড়া গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির বড় অঙ্কের পাওনা দাবির প্রেক্ষাপটে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপ আরেকটি বড় কারণ। পিপলস লিজিং অবসায়নের সিদ্ধান্তও শেয়ারবাজারের দরপতনের অন্যতম কারণ।

এ বিষয়ে সম্প্রতি বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, বকেয়া ইস্যুতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং গ্রামীণফোনের দ্বন্দ্ব পুঁজিবাজারের স্ট্রাকচার (কাঠামো) ধ্বংস করেছে। যখন রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বললেন, বিনিয়োগ করতে হলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন-টিন) লাগবে, তখন থেকে পুঁজিবাজারে পতনটা শুরু

হয়েছে। আমরা যখন তার ভুল ভাঙালাম, তারপর এটি সংশোধন হলো। তার দু-তিন দিন না যেতেই গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির সমস্যা শুরু হলো। এটা শুধু বিটিআরসি বা গ্রামীণফোনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, আমার মার্কেটের স্ট্রাকচারকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশিরা যখন আসে ওরা ফান্ডামেন্টাল শেয়ার দেখে আসে। গ্রামীণফোনের পাশাপাশি ওরা অলিম্পিক, ইউনাইটেড পাওয়ার ও স্কয়ার ফার্মা কিনেছে। তারা সব বিক্রি করে যাচ্ছে। গ্রামীণফোনের সঙ্গে ওরা স্কয়ার ফার্মা, ইউনাইটেড পাওয়ার, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর শেয়ার বিক্রি করেছে।

ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা বলেন, শেয়ারের দাম অনেক কম দেখে লাভের আশায় যারা বিনিয়োগ করেছিলেন এমন অনেক বিনিয়োগকারী এখন লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাদের যে ধৈর্য ধরতে বলব, সে সাহসও আমাদের নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ জানি না, এ পতনের শেষ কোথায়। তা হলে কী করে বিনিয়োগকারীদের লোকসানে শেয়ার বিক্রি করতে বলি। তার পরও যে বলা হয় না, তা নয়। বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী এখন কারও পরামর্শ কানে তোলেন না। কেউ কেউ লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে যতটুকু পাচ্ছেন ততটুকু নিয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে চলে যাচ্ছেন।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি সপ্তাহের চার কার্যদিবসের মধ্যে তিন কার্যদিবসেই বড়পতন হয়েছে। আগের দিনের ধারাবাহিকতায় বুধবারও প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের বড় পতন ঘটেছে। এ পতনে বড় ভূমিকা রেখেছে গ্রামীণফোন। এ কোম্পানিটির নেতিবাচক প্রভাবে ২৬ পয়েন্ট কমেছে। ডিএসইর মতো চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বড় পতন হয়েছে। দিনটিতে গ্রামীণফোনের মতো অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানিরও দর কমেছে।

জানা গেছে, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২২৮ পয়েন্টে। যা ৩ বছর ৮ মাস ৬ দিন অর্থাৎ ৪৪ মাস বা ৮৯২ কার্যদিবসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৬ সালের ২ মে বুধবারের চেয়ে নিম্নে অবস্থান করছিল ডিএসইর ডিএসইএক্স সূচকটি। ওই দিন ডিএসইএক্স অবস্থান করছিল ৪ হাজার ১৭১ পয়েন্টে। ডিএসইর অপর দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহ সূচক ১৯ পয়েন্ট ও ডিএসই-৩০ সূচক ১৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৯৫৪ ও ১ হাজার ৪২১ পয়েন্টে। ডিএসইর চালু হওয়া নতুন সূচক সিডিএসইটি ১০ পয়েন্ট কমে ৮৫১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। ডিএসইতে টাকার পরিমাণে লেনদেন হয়েছে ২৭৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট। যা আগের দিন থেকে ৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা কম। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৩২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকার।

ডিএসইতে ৩৫১টি প্রতিষ্ঠান শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫১টির বা ১৫ শতাংশের শেয়ার ও ইউনিট দর বেড়েছে। দর কমেছে ২৪৯টির বা ৭১ শতাংশের এবং ৫১টি বা ১৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

টাকার অঙ্কে ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে লাফার্জহোলসিম সিমেন্টের। এদিন কোম্পানিটির ১৪ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা এডিএন টেলিকমের ১৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার এবং ১২ কোটি ৩৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে উঠে আসে স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক। ডিএসইর সার্বিক লেনদেনে উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে : ব্র্যাক ব্যাংক, খুলনা পাওয়ার, নর্দার্ন জুট, স্কয়ার ফার্মা, বিকন ফার্মা, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড এবং পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স।

অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ১২৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৮৮ পয়েন্টে। এদিন সিএসইতে হাত বদল হওয়া ২১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ৪৭টির, কমেছে ১৪৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬টির দর। সিএসইতে ১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।

দরপতনের প্রতিবাদের মুখে কালো কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ :

পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতনের প্রতিবাদে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে কালো মুখোশ পরে বিক্ষোভ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। কারসাজি করে যারা কোটি কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে তুলে নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

গতকাল বুধবার মতিঝিলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিক্ষোভ করেন বিনিয়োগকারীরা। বিক্ষোভে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, যেখানে বাজার মূলধন ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা, সেখানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার ট্রেড হয়, এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু নেই। এ মুহূর্তে সূচক নেমে এসেছে ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ তে। এগুলো সব বাজার কারসাজির কুফল।

দেশের পুঁজিবাজারের স্বার্থে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনারদের অব্যাহতির দাবি জানান বিক্ষোভকারীরা। সাধারণ বিনিয়োগকারী, ব্রোকারেজ হাউস, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে নিয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। উল্লেখ, ২০১০ সালের ধসের পর থেকেই থেমে থেমে পতন চলছে পুঁজিবাজারে। সাম্প্রতিক সময়ে এ পতন অতিমাত্রায় বেড়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে