জয়নুল হক সিকদার এবং এক কাপ চা

0
77

শংকর লাল দাশ

শংকর লাল দাশ :: লিখতে চাই শোকগাথা। কিন্তু তা পাঠযোগ্য হবে কি না, তা যেমন প্রশ্ন। তেমনই যাকে নিয়ে লিখতে চাই, তাঁকে কতটুকুই বা চিনি-জানি। আদৌ কোনদিন তাকে দেখিনি। দেখা হওয়ার সম্ভাবনা একটু উঁকি দিলেও সঙ্গত কারণে তা বাস্তব হয়নি। জানাশোনার গন্ডিও অত্যন্ত সীমিত। মাত্র একদিন কথা হয়েছিল। তাও অনেক দূর থেকে। কেবল ফোনে। এটুকু স্মৃতি  সম্বল করে আর কত লেখা যায়। তবুও লিখতে চাই মহানুভব এই মানুষটি নিয়ে। মাত্র একদিনে তিন-চার বার ফোনে কথা বলে মানুষটির মাঝে মহাসাগরের মতো বিশাল হৃদয়ের যে পরিচয় পেয়েছি, যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গিয়েছেন; এক কথায় তা অতুলনীয় এবং চিরস্মরণীয়।

বলছিলাম জয়নুল হক সিকদারের কথা। বীর মুক্তিযোদ্ধা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একান্ত সুহৃদ। শিল্পপতি।

ব্যবসায়ী। শিক্ষাণুরাগী। কত না অভিধা। তারচেয়েও বড় পরিচয়, তাঁর মহানুভবতা। প্রত্যন্ত গাঁ গেরামের এক শহীদ পরিবারের জন্য তিনি যে দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন, তা এক কথায় বিরল এবং প্রাতস্মরণীয় হয়ে থাকবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে এভাবে শহীদ পরিবারের জন্য কিছু করার মানসিকতা কেবল তাঁদেরই রয়েছে, যারা সত্যিকারের মানবিকতায় সমৃদ্ধ। জয়নুল হক সিকদার নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য হয়ে থাকবেন সেই শহীদ পরিবারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর এ মহৎ কর্মের মাধ্যমে।

ঘটনাটি এক যুগ আগের। দৈনিক জনকণ্ঠের শেষ পাতায় ফিচার হিসেবে প্রকাশিত হলো এক শহীদ পরিবারের দৃষ্টান্তনীয় করুন আখ্যান। শহীদ পরিবারটির প্রধান এক সময়ে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক বন্দরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। ছিল তার বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। একাত্তরের মে মাসের প্রথমার্ধে স্হানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা  বন্দরসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। আরও অনেকের সঙ্গে শহীদ হন ওই ব্যবসায়ী। ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃস্ব করা হয় পরিবারটিকে।

মুক্তিযুদ্ধের পরে পরিবারের হাল ধরেন সর্বস্ব হারানো শহীদের স্ত্রী। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় সরকারি খাস জমিতে। অনেকগুলো সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কাটে দিন।

মুক্তিযুদ্ধের আটত্রিশ বছর পরে এক ভর দুপুরে সেই শহীদ পরিবারের ভাঙাচোরা ঘরে নজরে পরে এক বিস্ময়কর দৃশ্য। ছোট্ট ঠাকুরঘরে দেবদেবীর সঙ্গে পূজিত হচ্ছে একজোড়া রাবারের পুরোনো জুতো আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দেয়া একখানা চিঠি। জুতো জোড়া ছিল শহীদের। আর মুক্তিযুদ্ধের পরে বঙ্গবন্ধু দুই হাজার টাকার সঙ্গে স্বামীর ত্যাগ স্বীকারের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দিয়েছিলেন ওই চিঠি। বঙ্গবন্ধুর একখানা চিঠিকে এভাবে দেবতাজ্ঞানে নিত্য পূজা করার দৃশ্য নিঃসন্দেহে বিরলতম বিষয়। যা তুলে ধরা হয়েছিল জনকণ্ঠের ওই প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের দিন সকালেই ঢাকা থাকে ফোন করেন সাইদুর রহমান। নিজেকে পরিচয় দেন ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং চ্যানেল আইয়ের সংবাদ পাঠক। একইসঙ্গে জানান তিনিও শহীদ পরিবারের সন্তান। ফরিদপুরে বাড়ি। নিজেও শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে সাইদুর রহমানকে মূহুর্তেই নিকটজন মনে হয়। তাড়া দিয়ে বলেন, চেয়ারম্যান স্যার অর্থাৎ জয়নুল হক সিকদার কথা বলবেন। বলেই কিছুক্ষণের মধ্যে ফোন ধরিয়ে দেন। দু চার কথার পরেই জয়নুল হক সিকদার বলেন, আমি এক্ষুনি প্রতিবেদনের সেই শহীদ জায়ার সঙ্গে কথা বলতে চাই। সময় দিলেন দশ মিনিট।

যে সময়ের কথা, সে সময়টাতে এখনকার মতো হাতে হাতে মোবাইল ফোন আসেনি। যোগাযোগ ব্যবস্হাও এখনকার মতো উন্নত নয়। তার ওপরে সেই শহীদ জায়া থাকেন ১০-১২ কিলোমিটার দূরের বন্দরে। কি আর করা!

ভাড়াটে মোটরসাইকেল নিয়ে দুপুরে সেই বন্দরের বাসায় গিয়ে শুনি, তিনি আরও ৫-৬ কিলোমিটার দূরের আরেক বাজারে বড় ছেলের বাসায় থাকেন। সেখানে পৌঁছে শহীদ জায়ার সঙ্গে যখন জয়নুল হক সিকদারের কথা বলিয়ে দেই, তখন প্রায় শেষ বিকেল। প্রথম সম্বোধনেই জয়নুল হক সিকদার উপস্থিতদের অবাক করে শহীদ জায়াকে মা বলে ডাকেন। যা সকলকেই অশ্রুসিক্ত করে। তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে ফোনের ওপ্রান্ত থেকে সংসারের খুটিনাটি জেনে নেন। এক পর্যায়ে জানতে চান, আপনার জন্য আমি কি করতে পারি। উত্তরে শহীদ জায়া তার ছোট ছেলের জন্য একটা চাকরি প্রার্থনা করেন। জয়নুল হক সিকদার চাকরির আশ্বাস দিয়ে ঢাকায় দেখা করতে বলেন। শহীদ পরিবারের সেই ছেলেটি আজও ন্যাশনাল ব্যাংকে কর্মরত আছেন। যা ওই পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

ফেরার পথে আবার ফোন আসে জয়নুল হক সিকদারের। প্রতিবেদনের জন্য ধন্যবাদ দেন। তুমি বলেই সম্বোধন করেন। সঙ্গে জুড়ে দেন ছোটভাই শব্দ। বলেন, ঢাকায় চায়ের দাওয়াত রইল। তোমার সঙ্গে বসে চা খাব। গল্প করবো।

দুর্ভাগ্যই বলতে হবে এরপরে দীর্ঘ এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এই মহান ব্যক্তিত্বটির সঙ্গে দেখা হয়নি। হয়নি চা খাওয়া। ইচ্ছে-আখাঙ্কা যে ছিল না, তা বলা যাবে না। অবশ্যই ছিল। কিন্তু মানুষের সব আশা কি পূরণ হয়? দেশ বিখ্যাত একজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বসে চা খাওয়া, নিঃসন্দেহে অনেক বড় পাওয়া। বিশেষত আমাদের মতো গাঁ-গেরামের মানুষের কাছে এটি বিরাট একটা স্বপ্নপূরণের মতো ব্যাপার। কিন্তু সে স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। আর এখনতো তা চিরকালের জন্য অধরা হয়ে গেল। তিনি চলে গেলেন চিরপ্রস্হানের দেশে।

তবে তাঁর মাধ্যমে একটি স্বপ্নপূরণ হয়েছে। প্রতিবেদনের কারণে একটি পরিবার সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অবলম্বন পেয়েছে, সংবাদকর্মী হিসেবে এটিও অনেক বড় পাওয়া।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ বুধবার জয়নুল হক সিকদার চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার এ বিদায়ে রইল গভীর শোক ও শ্রদ্ধার্ঘ। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। পরিবারের সদস্যদের জন্য রইল সমবেদনা। #

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক জনকণ্ঠ। গলাচিপা, পটুয়াখালী। 

Print Friendly, PDF & Email

Source link