জানাজায় আসতে বাধা দিলে আমাদের পিষে ফেলত, বললেন সেই ওসি

0
4407

কয়েকদিন ধরেই দেশের গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় তুঙ্গে রয়েছে খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমির মাওলানা জুবায়ের আহমেদ আনসারীর জানাজায় বিপুল জনসমাগম হওয়ার বিষয়টি। দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যেও প্রশাসন কেন জুবায়ের আনসারীর জানাজায় জনস্রোত ঠেকাতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি, সেটি নিয়েই এখন চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

গত শুক্রবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মার্কাসপাড়ায় নিজ বাড়িতে মারা যান মাওলানা জুবায়ের আহমেদ আনসারী। সেই রাতেই তার মৃত্যুর সংবাদ মাইকিং করে জানানো হয়। পাশাপাশি ফেসবুকেও প্রচার করা হয়। পরদিন শনিবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের বেড়তলা এলাকায় জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসা মাঠে জুবায়ের আহমেদ আনসারীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দেশবরেণ্য এই আলেমের জানাজা জনসমুদ্রে পরিণত হয়! মাঠে জায়গা না হওয়ায় মাদরাসা সংলগ্ন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকায় জানাজায় অংশ নেয় মানুষ।

‘পর্যাপ্ত সময়’ পেয়েও কেন আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়নি প্রশাসন, সেটি নিয়েও প্রশ্নের ডালপাল ছড়াচ্ছে। তবে আনসারীর জানাজায় এত মানুষের সমাগম হবে এমন তথ্য পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দাসহ ডিজিএফআই বা এনএসআই থানা পুলিশকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করেননি বলে দাবি করেছেন সরাইল থানার প্রত্যাহার হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাহাদাত হোসেন। জানাজার সময় ঘটনাস্থলে মাত্র ২০ জন পুলিশ সদস্য ছাড়া আর কেউ ছিলেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি। মূলত জানাজার বিষয়টিকে ‘হালকাভাবে’ নেওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পরে এ ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সরাইল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এসএসপি) মাসুদ রানা, সরাইল থানার ওসি সাহাদাত হোসেন ও পরিদর্শক (তদন্ত) নারুল হককে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হয়।

বিষয়টি নিয়ে আজ সোমবার মুঠোফোনে একটি গণমাধ্যমকে সরাইল থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি সাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এসপি স্যার আমাকে বলার পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমি মাদ্রাসায় গিয়ে কথা বলেছি। উনাদের আমরা বলেছি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং লোক বেশি জমায়েত করা যাবে না। একেবারেই সীমিতসংখ্যক লোকের ভেতরে জানাজা সম্পন্ন করতে হবে। উনারা বলেছেন, কোনো লোক আসার জন্য আমরা বলিনি। যদি লোক জমায়েত করতাম তাহলে দুপুরে জানাজার সময় দিতাম। উনারা নিশ্চয়তা দেওয়ার পর আমি চলে আসি। পরদিন সকাল সোয়া ৯টার দিকে আবার মাদ্রাসা মাঠে আমরা যাই। তখন এত লোকজন ছিল না। মাদ্রাসা মাঠ ও আশপাশে মিলিয়ে এক-দেড়শ লোক হবে। সকাল পৌনে ১০টার দিকে দেখি মানুষ চারদিক থেকে স্রোতের মতো আসছে। আমরা মানুষজনকে ঠেকানোর জন্য চেষ্টা করেছি। মাদ্রাসা মাঠের মাইক এবং আমাদের মাইক দিয়ে সবাইকে বলেছি। আমাদের অবস্থা তখন বানের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো। তখন আমরা যদি বাধা দিতাম তাহলে সেখান থেকে আমাদের লাশও আসত না। আমাদের একদম পিষে ফেলত।’

ওসি আরও বলেন, ‘আমরা মোট ২০ জন পুলিশ সদস্য সেখানে ছিলাম। যে অবস্থা ছিল পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ এখানে এলেও এই জনস্রোত ঠেকানো যেত না। ঠেকানোর চেষ্টা করলে বড় ধরনের সংঘর্ষ হতো। আমাদের কাছে কোনো গোয়েন্দা তথ্যও ছিল না। আমাদের পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) বা ডিজিএফআই, এনএসআই কোনো দিক থেকেই আমাদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। সরাইলে থাকা ডিএসবির প্রতিনিধিও এ ধরনের তথ্য দেয়নি।’

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী থানাগুলো থেকেও আমাকে কোনো বার্তা দেয়নি। এ অবস্থায় আমরা সরাইল থানার কয়জন পুলিশ ছাড়া কোনো সংস্থা, কোনো কর্তৃপক্ষ কেউ সক্রিয় ছিল না। উপজেলা প্রশাসন ও কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের সহযোগিতা আমার কাছে ছিল না। আমার ধারণা সবাই বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়ে শুধু আমার ওপরে ছেড়ে দিয়েছে। বিষয়টি এমন হয়েছে গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ মারা গেলে ওনার দাফন-কাফন হবে এটাই তো স্বাভাবিক। আমার ব্যর্থতা বা অজ্ঞতা হলো-এই হুজুর সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। কারণ আমি ওনাকে কোনোভাবেই চিনতাম না।’

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সভাপতি প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মনে হয় তারা এটিকে হালকাভাবে নিয়েছে। প্রশাসনের এটি দেখার দরকার ছিল। যখন দেখছে প্রচুর মানুষ আসছে তখনই বাধা দেওয়া দরকার ছিল।’

এ বিষয়ে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আলাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এ ধরনের কথা বলার কোনো কারণ নেই। আমরা এসপি স্যারকে রিপোর্ট করেছি। ওসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে লকডাউন এবং অন্যান্য নিয়ম কানুন নিয়ে। সে অনুযায়ী ওসি কথাও বলেছে।’

সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সালেহ মো. মুসা বলেন, ‘আমার কাছে কোনো ধরনের তথ্য ছিল না। পুলিশের পক্ষ থেকেও আমাকে কিছু জানায়নি। অন্য কোনো মাধ্যম থেকেও জানিনি এতো বড় জমায়েত সেখানে হতে যাচ্ছে। জানাজা শেষ হয়ে যাওয়ার অনেক পরে আমি জানতে পেরেছি। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হয়নি।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে