জনপ্রশাসনের শীর্ষে বাড়ছে নারী

0
430

নারী মুক্তি আন্দোলনের বাতিঘর বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন, ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।’ তিনি আরও লিখেছেন, প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নারী-পুরুষের সমতা অনস্বীকার্য। হ্যাঁ, একবিংশ শতাব্দীতে এসে বেগম রোকেয়ার দেখা সেই স্বপ্নের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে অবদান রেখে চলেছেন নারীরা। জনপ্রশাসনের শীর্ষ কয়েকটি পদে আসীন হওয়া ছাড়াও দিন দিন সরকারি চাকরিতে তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কসহ ৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব পদে রয়েছেন নারীরা। ৮ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে আছেন ৮ জন নারী।

আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে দিবসটি। এ উপলক্ষে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাণীসহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও জাতীয় পর্যায়ে পাঁচজন শ্রেষ্ঠ জয়িতাকে সম্মাননা জানানো হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে সচিব/সিনিয়র সচিব ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ৮২ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক পদসহ ৯টি পদে রয়েছেন নারীরা। অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ নারী প্রশাসনে সচিব পদে কাজ করছেন। এ ছাড়া গ্রেড-১ পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবেও আছেন একজন নারী।

নারীদের মধ্যে প্রথম ১৯৯৮ সালে সচিব হন জাকিয়া আক্তার চৌধুরী। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হয়েছিলেন। এরপর থেকেই মূলত প্রশাসনে নারী সচিবের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন সাবেক সচিব নাছিমা বেগম। এ ছাড়া দেশের অন্যতম বড় দুটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদেও রয়েছেন দুজন নারী।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্কার ও গবেষণা অনুবিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘স্ট্যাটেসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ-২০১৯’-এর হিসাব বলছে, দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা ১৩ লাখ ৯১ হাজার ৫৫ জন। এর মধ্যে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৭৮৭ জন নারী, যা মোট চাকরিজীবীর প্রায় ২৭ শতাংশ। ২০১০ সালে মোট চাকরিজীবীর মধ্যে নারী ছিলেন ২১ শতাংশ। সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও সাবেক তথ্য কমিশনার সুরাইয়া বেগম বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশ্বাস ও যোগ্যতা দিয়ে আস্থা রাখতে পেরেছি বলেই সরকার আমাকে সিনিয়র সচিব করেছিল। নারীরা তাদের দায়িত্ব পালনে অনেক বেশি সতর্ক থাকেন বলেও মনে করেন নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম সিনিয়র সচিব হওয়ার গৌরব অর্জনকারী সুরাইয়া বেগম।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ বলেন, মাঠপর্যায়েও মেয়েরা দায়িত্বশীল বিভিন্ন পদে আসছেন, কাজ করছেন। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিতে হবে। আমরা সচিব পর্যন্ত গিয়েছি। আমাদের সেভাবে কেউ এগিয়ে দেয়নি, কেউ এগিয়ে দেয় না। তারপরও বলব প্রশাসনে নারীদের অবস্থানটা আগের চেয়ে অনেক সুদৃঢ়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই চাকরিতে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ৬০ শতাংশ নারী নিয়োগ করা হচ্ছে বহুদিন আগে থেকেই। এসব পদক্ষেপের ফলে চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এটি নারীদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। তিনি আরও বলেন, যেসব চাকরি বদলিযোগ্য সেগুলোতে পরিবারের আগ্রহ থাকে না। কারণ আবাসন, শিশুযত্নের জন্য ‘ডে কেয়ার’ ব্যবস্থা না থাকাসহ কিছু বাস্তব কারণে নারীদের সমস্যায় পড়তে হয়। এসব বিষয় নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান রাশেদা কে চৌধুরী।

কোন দপ্তরে কোন নারী সচিব

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে দায়িত্বে আছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব জুয়েনা আজিজ। চাকরির মেয়াদ শেষে তাকে এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সচিব) পদে আছেন হোসনে আরা বেগম। ২০১৭ সালের ৩১ মে তিনি দুই বছরের জন্য এ পদে নিয়োগ পান। ২০১৯ সালের ১২ জুন তাকে এ পদে ফের দুই বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব করা হয় ফাতিমা ইয়াসমিনকে। পরিকল্পনা কমিশনে সদস্য পদে কাজ করছেন সিনিয়র সচিব শামীমা নার্গিস ও সিনিয়র সচিব সাহিন আহমেদ চৌধুরী। তথ্য মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো একজন নারী সচিব নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা কামরুন নাহারকে রাষ্ট্রপতির কোটায় সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে প্রথমে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন শেষে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হন বিসিএস অষ্টম ব্যাচের নাজমানারা খানুম। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী রওশন আক্তার। বিসিএস (প্রশাসন) সপ্তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা মাঠপ্রশাসনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন শেষে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে রেক্টর পদে দায়িত্ব পালন করেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে কিছুদিন দায়িত্ব পালনের পর ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) পদে রয়েছেন উম্মুল হাছনা।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালনকালেই সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে রেক্টর হিসেবে যোগদান করেন বদরুন নেছা। তিনি মাঠপ্রশাসন ও সচিবালয়ে বিভিন্ন পদেও দায়িত্ব পালন করেন। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে রয়েছেন পারভীন আক্তার। তিনি গ্রেড-১ পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

যেসব জেলায় নারী ডিসি

নরসিংদীর ডিসি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন (বিসিএস ২০ ব্যাচ), রাজবাড়ীতে দিলশাদ বেগম (২১ ব্যাচ), নড়াইলে আঞ্জুমান আরা (২১ ব্যাচ), শেরপুরে আনার কলি মাহবুব (২০ ব্যাচ), কুড়িগ্রামে সুলতানা পারভীন (২০ ব্যাচ), পঞ্চগড়ে সাবিনা ইয়াসমিন (২১ ব্যাচ), মৌলভীবাজারে নাজিয়া শিরিন (২০ ব্যাচ) এবং গোপালগঞ্জে শাহিদা সুলতানা (২১ ব্যাচ) ডিসির দায়িত্ব পালন করছেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে