চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার: বাংলাদেশ সঠিক পথের সন্ধানে

0
56

হীরেন পণ্ডিত: আজকাল ডাক্তার বা রেডিওলজিস্টের পক্ষে নিখুঁতভাবে জটিল রোগের সার্বিক চিত্র পাওয়া অত্যন্ত কঠিন যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে এমন সব ‘সেলফ লার্নিং সফটওয়্যার’ তৈরি করা হচ্ছে, যা চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে পারে। বিশেষ করে জটিল রোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট লক্ষণগুলো চিহ্নিত করতে চিকিৎসাবিদ্যায় হাইটেক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে চলেছে এবং গবেষকরা বলছেন এর ভালো ফল মিলছে।

ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিস্তারিত চিত্র ফুটিয়ে তোলা যাচ্ছে। ডাক্তাররা সেই ছবি বিশ্লেষণ করে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পান। আজকাল সেই সব ছবি বিশ্লেষণ করার জন্য রেডিওলজিস্টের হাতে খুব কম সময় থাকে। প্রত্যেক রোগীর জন্য বড়জোর ১০ মিনিট। অথচ তাকে ২০০ থেকে ৪০০ ছবি দেখতে হয়। অর্থাৎ নিছক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি ছবিগুলোর ওপর চোখ বোলাতে পারেন। অন্যদিকে এই সফটওয়্যার প্রতিটি ছবির প্রতিটি পিক্সেল বিশ্লেষণ করে এবং মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কাঠামোর অবস্থা তুলে ধরে।

এই সফটওয়্যারের নেপথ্যে ‘মেশিন লার্নিং’ প্রযুক্তি কাজ করে। এক অ্যালগরিদম বিশাল পরিমাণ তথ্যের মেলবন্ধন ঘটায়। সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে এক কম্পিউটার মস্তিষ্কের মাল্টিপল স্কলেরোসিস অথবা ডিমেনশিয়া শনাক্ত করতে পারে। যত বেশি ও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে, ফলাফলও তত নিখুঁত হয়। জার্মানীর এক তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি এমন এআই প্রোগ্রাম করেছে, যা এমনকি কোনো ডাক্তারের তুলনায়ও বেশি দক্ষ। এই প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি অংশ আরও বেশি করে স্বয়ংক্রিয় করে তুলছে। আরও বেশি সফটওয়্যার সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তথ্য বিশ্লেষণ করছে। সবশেষে রেডিওলজিস্ট শুধু সফটওয়্যারের নির্দিষ্ট কিছু তথ্য পরীক্ষা করেন। বাকি কাজ সফটওয়্যার করে।

কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রেও এমন সফটওয়্যার কাজে লাগানো হচ্ছে, যেগুলো সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা গ্রহণ করছে। যেমন বড় আকারে করোনা পরীক্ষার সময় এ প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। এবার এমন এক অ্যাপ আসতে চলেছে, যেটিকে প্রশ্ন করলে কারও সংক্রমণ আছে কি না, তা চটজলদি জানিয়ে দেবে। এমন দ্রুত অডিও টেস্ট মূল পরীক্ষার বিকল্প হতে না পারলেও ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নিখুঁত হতে পারে।

এবার এমন এক অ্যাপ আসতে চলেছে, যেটিকে প্রশ্ন করলে কারও সংক্রমণ আছে কিনা, তা চটজলদি জানিয়ে দেবে৷ এমন দ্রুত অডিও টেস্ট মূল পরীক্ষার বিকল্প হতে না পারলেও ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নিখুঁত হতে পারে৷ বর্তমানে যত বেশি সম্ভব মানুষের কণ্ঠ ধারণ করে সেই সফটওয়্যার অনুশীলনের কাজ চলছে৷ কাশি ও হাসির সময়ে ফুসফুসের উপর কতটা চাপ পড়ে, তা পরিমাপ করা যায়৷ সিগনাল প্রসেসিং অ্যালগোরিদমের মাধ্যমে আমরা সেটা করা সম্ভব৷ সংগৃহিত তথ্যের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অনুশীলন করানো যায়৷ করোনা পরীক্ষায় যাদের সংক্রমণ ধরা পড়েছে বা পড়ে নি অথবা যাদের করোনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাদের কণ্ঠ শুনে সফটওয়্যার শনাক্ত করতে পারবে৷

কৃত্রিম পদ্ধতিতে ফুসফুসের রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস চালানোর বড় ঝুঁকি থাকে, কারণ সে ক্ষেত্রে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে৷ এমন প্রচেষ্টার কারণে মৃত্যুর হার যথেষ্ট বেশি৷ তাই এমন এক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সৃষ্টি করেছে যার মাধ্যমে এমন রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে৷ বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফুসফুসের ডিজিটাল মডেল তৈরি করে তাতে বাতাসের প্রবেশের হার নকল করা যায়৷ এভাবে সহনীয় চাপ নির্ণয় করে ভেন্টিলেটরের মাত্রা স্থির করা যায়৷ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ডাক্তার ফুসফুসের ভেতরে উঁকি মারতে পারেন না৷ তিনি শুধু দেখতে পান, ভেন্টিলেটর উইন্ডপাইপের উপর কতটা চাপ সৃষ্টি করছে৷ আমাদের প্রযুক্তির সাহায্যে তিনি প্রথম বার ফুসফুসের মধ্যে উঁকি মেরে দেখতে পারবেন, বাতাস প্রবেশ করে ঠিক কোথায় চাপ সৃষ্টি করছে৷ শুধু তাই নয়, ডিজিটাল টুলের মাধ্যমে তিনি রোগীর কোনো ক্ষতি না করে চিকিৎসার আগেই তাঁর ফুসফুসের উপর ভারচুয়াল পদ্ধতিতে নানা রকম পরীক্ষা করতে পারবেন৷

সবার জন্য চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই কঠিন হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ফেলে দিয়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে। নাজুক এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় আইহেলথস্ক্রিন ইনকরপোরেশন ইউএস এর মাইহেলথ উদ্ভাবিত কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও অনলাইনভিত্তিক বহুমুখী উদ্ভাবন বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য সেবা কোটি মানুষের নাগালে চলে আসা এখন সময়ের ব্যাপার। এরইমধ্যে কিছু সুবিধা বাংলাদেশের মানুষ পেতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে মাইহেলথের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি নির্ণয়ে উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার বিপুল সংখ্যক মানুষকে অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মাইহেলথ টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বাংলাদেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। আর উন্নত বিশ্বে প্রচলিত ডিজিটালাইজড স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাও আনা হয়েছে বাংলাদেশে।

সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান বিজ্ঞানী ও সিইও হলেন বাংলাদেশের ড. মোঃ আলাউদ্দীন ভূঁইয়া। তিনি নিউইয়র্কের আইকান স্কুল অব মেডিসিন মাউন্ট সিনাইয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ। হার্ভাড স্কলার এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করা এই বাংলাদেশি বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। নিজ দেশে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও চিকিৎসার সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এরই মধ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আইহেলথস্ক্রিন বাংলাদেশ।

মাইহেলথ এর সেবাগুলো টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিকহেলথ রেকর্ড (ইএইচআর), ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ভিত্তিক ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, এইজ রিলেটেড ম্যাসকিউলার ডিজেনারেশন ডিজিজ (এ.এম.ডি) এবং গ্লুকোমা (অন্ধত্বের প্রধান কারণ). আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক অন্যান্য রোগ (স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিস) নির্ণয় এবং আগের থেকেই অনুমান করার ব্যবস্থা এবং রোগীর তথ্য সংরক্ষণ এবং সহজে ফাইল শেয়ারিং ও রেফারেন্স।

মাইহেলথে তথ্য সংরক্ষণ একেবারেই সুরক্ষিত একটি ব্যবস্থা। ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ডে (ইএইচআর) স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রোগীর পারিবারিক রোগ বিবরণী যেমন থাকবে, তেমনি রোগীর নিজের রোগ সম্পর্কিত সব তথ্যও সংরক্ষণ করা হবে। ফলে চিকিৎসক খুব দ্রুত ও নিখুঁতভাবে রোগীকে চিকিৎসা পরামর্শ দিতে পারবেন।

রোগী ও ডাক্তার মুখোমুখি হয়ে যেভাবে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন, পরস্পর পরস্পর দূরে থেকেও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন মিলবে মাইহেলথ সেবায়, যা সহজেই ডিভাইসে ডাউনলোড ও প্রিন্ট করা যায়।

রোগী সব ধরনের তথ্য পাবেন, চিকিৎসক চাইলে তার রোগীর তথ্য সম্বলিত ফাইলসহ মাইহেলথে নিবন্ধিত অন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করতে পারবেন।

মাইহেলথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিভিত্তিক সফটওয়্যার, যার সাহায্যে নিখুঁতভাবে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (ডিআর), এইজ রিলেটেড ম্যাসকিউলার ডিজেনারেশন ডিজিজ (এ.এম.ডি) এবং গ্লুকোমা নির্ণয় করা যাবে। দেশ-বিদেশে কয়েক কোটি মানুষ অন্ধত্ব থেকে রক্ষা পেতে পারে এ প্রক্রিয়ায়। আক্রান্ত হওয়ার আগে বা শুরুতেই প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ডিআর আক্রান্ত রোগীদের ৯০ ভাগকে অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করা যায়। অ্যাসোসিয়েশন অব রিসার্চ অ্যান্ড ভিশন (এআরভিও)-এর মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত ও অনুমোদিত এই সফটওয়্যার। নিরীক্ষণ নির্ভুলতার হার ৯৮ শতাংশ।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত, যাদের একটি বড় অংশ অন্ধত্বের হুমকির মুখে রয়েছেন। আইডিএফ-এর প্রতিবেদনে ২৯ লাখ ৭০ হাজার মানুষের রেটিনোপ্যাথি সমস্যা আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক এই রোগীর স্ক্রিনিং করার জন্য দরকার নির্ভুল, স্বয়ংক্রিয়, কার্যকরী পদ্ধতি, যা মাইহেলথের এ সফটওয়্যারে রয়েছে। বাংলাদেশে মাথাপিছু চক্ষু বিশেষজ্ঞের অনুপাত ৪:১ মিলিয়ন, চাহিদার তুলনায় খুবই কম। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সফটওয়্যার চিকিৎসকদের জন্যও বড় সুখবর। কারণ এর মাধ্যমে তারা রোগীর তথ্য, রেটিনা ইমেজের ডেটা ছাড়াও চোখের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আগাম জানতে পারবেন।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যার ব্যব্যহার করে অন্যান্য রোগেরও পুর্বানুমান সম্ভব। স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কতটুকু তা আগেই জেনে নিতে পারবেন রোগী। চিকিৎসক সে অনুযায়ী পরামর্শ দিয়ে রোগীর জীবন শঙ্কামুক্ত করতে পারবেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এমন ব্যবহারকে বেশ ইউনিক বলে মানছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে ডাক্তার-রোগী অনুপাত অসামঞ্জস্যপূর্ণ সেখানে এই সফটওয়্যার যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

লেখক-রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

Print Friendly, PDF & Email

Source link