চট্টগ্রাম কারাগারে রমরমা ইয়াবা ও মাদক বানিজ্য, নীরব কারা প্রশাসন

রাজিব শর্মা, চট্টগ্রাম : বাংলাদেশ কারা কর্তৃপক্ষের স্লোগান, ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’। যার মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে বন্দিদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সমাজে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামসহ দেশের কারাগারগুলোতে ইয়াবাসহ কারারক্ষী ও হাজতি আটকের ঘটনায় সংস্থাটির ভিশন-মিশন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেরিয়ে আসছে কারাগারে ইয়াবার রমরমা কারবারের কাহিনি।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম কারাগারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন যুবলীগ ক্যাডার ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী। সেই মামলার প্রধান আসামি রিপন নাথ গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, তিনি কারাগারেই টাকার বিনিময়ে ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের সুযোগ পেতেন। খুনি রিপন নাথের এ স্বীকারোক্তির পরপরই কারাগারের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

!-- Composite Start -->
Loading...

ওই রেশ না কাটতেই গত শনিবার নগরের কদমতলী ফ্লাইওভার থেকে ৫০টি ইয়াবাসহ আটক হন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষী সাইফুল ইসলাম (২২)। সেই সূত্রে বেরিয়ে আসে চট্টগ্রাম কারাগারে বসেই ২০ মামলার আসামি হামকা নূর আলমের মাদক কারবারের কাহিনি। সর্বশেষ রোববার (১৬ জুন) নুর মোহাম্মদ (১৯) নামের এক হাজতির পায়ুপথ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৫০ পিস ইয়াবা।

কারাগারে হামকার ইয়াবা কারবার

একসময় হামকা নূর আলম ও তার বিশাল বাহিনী ছিল নগরবাসীর কাছে আতঙ্কের কারণ। ২০১১ সালে রুবি গেট এলাকায় দুটি অস্ত্র ও গুলিসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন হামকা আলম। সেই থেকে কারাগারেই আছেন তিনি। দুর্ধর্ষ হামকা কারাগারে থাকায় বেশ স্বস্তিতে ছিলেন নগরবাসী ও পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু শনিবার ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার কারারক্ষী সাইফুল ইসলামের দেয়া তথ্য ঘুম কেড়ে নিয়েছে পুলিশের। হামকা নূর আলম কারাগারে বসেই চালিয়ে যাচ্ছেন ইয়াবা ও গাঁজার কারবার। তার সহযোগী হিসেবে আছেন খোদ কারারক্ষীরা!

হামকা নূর আলমের নেতৃত্বেই চলছে চট্টগ্রাম কারাগারে ইয়াবার কারবার

গত শনিবার রাতে নগরের কদমতলী এলাকায় সাইফুল ইসলাম (২২) নামের এক কারারক্ষীকে ৫০ পিস ইয়াবা বড়িসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশির সময় সাইফুল আটক হন। এ সময় তার মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। সেই ফোনকলের সূত্রে পুলিশ জানতে পারে, এক ব্যক্তি সাইফুলের কাছে আসছেন গাঁজা সরবরাহ করতে। পুলিশ কৌশলে আজিজুল ইসলাম জালাল নামের ওই ব্যক্তিকেও আটক করেন। এরপর সাইফুলের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার দিদারুল আলম মাসুম ওরফে আবু তাহের মাসুম ও আলো আক্তার নামের আরও দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। এরপরই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে পড়ে থলের বিড়াল।

আটক ওই তিনজন পুলিশকে জানান, হামকা আলমের চাহিদা অনুসারে ওই ৫০ পিস ইয়াবা বহন করে কারাগারে যাচ্ছিলেন সাইফুল। এর আগে কোতোয়ালি থানার বয়লার মাঠ এলাকার আলো নামে এক নারী ইয়াবা বিক্রেতার কাছ থেকে ওই ৫০ পিস ইয়াবা কেনা হয়। সেখান থেকে হামকা আলমের চাহিদা মতো হালিশরের বন্ধু মাসুমের কাছে দুই হাজার টাকার জন্য সিএনজি নিয়ে রওনা হন। পথিমধ্যে পুলিশের হাতে বন্দি হন কারারক্ষী সাইফুল।

তারা আরও জানান, গত দুই বছর ধরে নূর আলম কারাগারে বসেই ইয়াবা সংগ্রহ, বিক্রি ও মাদকের দাম পরিশোধ করতেন। শুধু হামকা আলমই নন, আরও অনেকেই আছেন এ কারবারে। পুলিশ জানায়, হামকা আলমের ইয়াবা কারবার অনেক আগে থেকেই। ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে তার কাছে ৪০০ পিস ইয়াবা ও তিন কেজি গাঁজা পাওয়া যায়।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘আটক কারারক্ষী সাইফুল কারাগারের বিশাল ইয়াবা নেটওয়ার্কের তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন। একে একে এ চক্রের চারজনকে আটক করেছি। মূলত হামকা আলমই কারাগারের মাদক নিয়ন্ত্রণকারী। সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।’

>>>কারাগারে ইয়াবা মেলে ৪০০ টাকায়<<<

রাজনৈতিক মামলায় দীর্ঘ এক বছর কারাগারে থেকে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন একটি ছাত্র সংগঠনের চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের নেতা যুবায়ের (ছদ্মনাম)। চট্টগ্রাম কারাগারের পরিবেশ সম্পর্কে তিনি জাগো নিউজকে জানান, একসময় কারাগারে রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যাপক প্রভাব থাকলেও বর্তমানে সেই জায়গা দখলে নিয়েছেন ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। মূলত বাইরে রেখে যাওয়া তাদের বিশাল সম্পদ ও টাকার জোরেই সবকিছু সম্ভব হচ্ছে।

নুর মোহাম্মদ নামের এ হাজতির পায়ুপথ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৫০ পিস ইয়াবা

যুবায়ের বলেন, চট্টগ্রাম কারাগারের নয় হাজার বন্দির ৭০ শতাংশই মাদকের কারবারি ও মাদকসেবী। এ সুযোগ নিচ্ছেন মাদক ব্যবসায়ীরা। কারাগারে এখন বেশির ভাগ ইয়াবার কারবারি নিজেদের মতো পরিবেশ তৈরি করে নিয়েছেন। তাদের ইচ্ছা মতো খাওয়া-দাওয়া, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় মুখরোচক খাওয়া, থাকার জন্য বিশেষ স্থান নির্ধারণ, এমনকি ইচ্ছামতো ঘোরাঘুরি, যেকোনো মুহূর্তে তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ-সাক্ষাৎ এবং কারা হাসপাতালে থাকাসহ সব মিলিয়ে অনেকটা রাজকীয় জীবন-যাপন করছেন ইয়াবার কারবারিরা।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, চট্টগ্রাম কারাগারের ৩২ নম্বর সেলের ৩ নম্বর কারাকক্ষে রাখা হয়েছে হামকা নূর আলমকে। ইয়াবা কারবারের অর্থে কারাগারে বসেই সুবিধা নিচ্ছেন তিনি। সেখান থেকেই তিনি কারাগারের ভেতর ও বাইরে ইয়াবা কেনা-বেচা করে আসছেন। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ছিঁচকে হাজতি থেকে কারারক্ষীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কারাগারের ভেতরে এক পিস ইয়াবা বিক্রি হয় ৪০০ টাকায়। তিন পিস একসঙ্গে কিনলে দাম নেয়া হয় এক হাজার টাকা। ১০০ টাকা থেকে শুরু হয় গাঁজার পুটলির দাম।

অভিনব কৌশলে ইয়াবা ঢুকছে কারাগারেঃ

গতকাল রোববার (১৬ জুন) নুর মোহাম্মদ নামের এক হাজতির পায়ুপথ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩৫০ পিস ইয়াবা। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার কামাল হোসেন জানান, নুর মোহাম্মদ নামের ওই হাজতি সাতটি ছোট পুটলা বানিয়ে ইয়াবাগুলো নিয়ে আসে। তাকে সন্দেহ হলে টয়লেটে নিয়ে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়।

এভাবে কারাগারে বিভিন্ন উপায়ে ঢুকছে ইয়াবা। কারাগারের ভেতর ও বাইরের একটি সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে সেখানে রমরমা কারবার চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আকারে ছোট হওয়ায় অনেক আসামি কৌশলে এসব ইয়াবা ভেতরে পাচার করছেন। পরে সেখানে মাদকাসক্তদের কাছে এসব চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

ইয়াবাসহ আটক কারারক্ষী সাইফুল, তার বন্ধু মাসুম ও সহযোগী আজিজ

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কারাগারের ভেতরে এখন ইয়াবার বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট আছে, যারা ইয়াবা কারবারে জড়িত। মূলত আসামিদের যখন আদালতে আনা হয়, তখন কৌশলে তাদের হাতে ইয়াবা গুঁজে দেয়া হয়। আসামিরা বিভিন্ন কৌশলে এসব লুকিয়ে রাখেন। সাধারণত ২০ থেকে ৪০ পিস ইয়াবা অনায়াসে শরীরের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা যায়। এছাড়া লুঙ্গির সেলাই কিংবা শার্টের কলারে বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করে কারাগারে ঢুকছে ইয়াবা। এসব ইয়াবার একেকটি চালান ভেতরে নিয়ে যেতে পারলে এক হাজার টাকা পাওয়া যায়। সঙ্গে কয়েকটি বড়িও মেলে। এমন লোভে মূলত কারাগারে বন্দি মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কাজটি করেন। এসব কাজে সহায়তা করেন অসাধু কারারক্ষীরা।

কারাগার-ফেরত বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করে জানান, কারাগারের ভেতরে প্রতি পিস ইয়াবা বিক্রি হয় ৪০০ থেকে এক হাজার টাকায়। এর সঙ্গে কয়েকজন কারারক্ষীও জড়িত। মূলত সিন্ডিকেটের চিহ্নিত লোকজন কারাগারে ঢোকার সময় খুব একটা তল্লাশির মুখোমুখি হন না।

চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. কামাল হোসেন এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, কারা প্রশাসন ইয়াবার কারবারে সহায়তা করছে- বিষয়টি এমন নয়। টাকার লোভে কেউ কেউ হয়তো অসৎ পথে পা বাড়াচ্ছে। আটক কারারক্ষী সাইফুলের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

অপরাধের সঙ্গে জড়িত কেউ-ই ছাড় পাবে না, বলেও জানান তিনি।

মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.