খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভুয়া নিয়োগে সরকারি শিক্ষক তারা

0
93

খুলনা, ০৯ ফেব্রুয়ারি – ২০১১ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন পাঁচজন। সে সময় তাদের বেতন ছিল দুই হাজার টাকা। এরপর ২০১৬ সালে ওই বিদ্যালয়টি আত্তীকৃত করে সরকার। তখন খণ্ডকালীন নিয়োগকে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ দেখিয়ে তারাও বনে যান সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক।

অথচ তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু জালিয়াতি নয়, সরকারি নিয়োগবিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। নিয়োগের জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির নিয়োগ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেজুলেশন, নিয়োগ বোর্ড গঠন, মহাপরিচালকের প্রতিনিধি নিয়োগ, নিয়োগ পরীক্ষা কোনো কিছুই অনুষ্ঠিত হয়নি।

খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমন অনিয়ম এর খোঁজ পেয়েছে প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। শুধু পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ ছাড়াও ওই বিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেও সজল ব্যানার্জী আত্তীকৃত বিদ্যালয়ে কেরানি হয়ে গেছেন।

অনিয়ম করে সরকারি আত্তীকৃত শিক্ষক হয়েছেন সামাজিক বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক ইন্দ্রা রাণী হালদার, সহকারী শিক্ষক (বাংলা) আরতী রানী সাহা, রাবেয়া কবির সহকারী শিক্ষক (বাংলা), ফারজানা ইব্রাহীম সহকারী শিক্ষক (বাংলা), ফারহান দিবা সহকারী শিক্ষক (বাংলা)।

আর এসব অপকর্মে যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মো. মাহমুদ আলম। যিনি যোগ্যতা না থাকার কারণে বর্তমানে বিদ্যালয়টির সহকারী ধর্ম শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালের ২৪ মার্চ প্রথমে খন্ডকালীন গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিয়োগ পান রাবেয়া কবির। ওই বছরের এপ্রিলের ২ তারিখ যোগদান করেন। এরপর একই দিনে সামাজিক বিজ্ঞান পদে তাকে নিয়োগ দেখানো হয়। আর যোগদান দেখানো হয় ৬ এপ্রিল ২০১১। অথচ তিনি নিবন্ধন পাশ করেন ২০১৩ সালে। প্রতিবেদকের হাতে নিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় অনিয়মের তথ্য এসেছে।

আরও পড়ুন : মর্গে লাশের শরীর থেকে স্বর্ণ চুরি, ৩ ডোম আটক

ইন্দ্রা রানী হালদার রাবেয়া কবিরের মত একই দিনে খন্ডকালীন শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। যোগদানও করেন একই তারিখে। আর তার নিবন্ধন পাশ দেখানো হয়েছে ২০১২ সালের মার্চ মাসের ৪ তারিখ।

ফারজানা ইব্রাহীম খন্ডকালীন বাংলা শিক্ষক হিসেবে ২০১১ সালের ২৪ মার্চ যোগদান করেন। একই দিনে তাকেও সহকারী শিক্ষক (বাংলা) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

ফারহানা দিবা ২০১১ সালের জানুয়ারির ১ তারিখে ও আরতী রানী সাহা একই বছরের মে মাসের ৭ তারিখে খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু নিয়ম বর্হিভূতভাবে তিনিও এখন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মো. মাহমুদ আলম অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, ‘আমি ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি। আর এসব শিক্ষকের নিয়োগ দিয়েছে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি।’

অনিয়মের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই। নিয়োগে অনিয়ম কেন করা হয়েছে এটা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাই বলতে পারবেন।’

এ বিষয়ে শিক্ষক ফারহানা দিবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। নিয়োগ সংক্রান্ত জালিয়াতির প্রশ্ন শুনেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ফোন করা হয় ফারজানা ইব্রাহীমকেও। তিনিও এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দেননি। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর ‘অপরিচিত’ বলে সংযোগ কেটে দেন।

অন্যদিকে আরতী রানী সাহাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং ইন্দ্রা রানী হালদারের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে রাবেয়া কবির বলেন, ‘আপনি স্কুলে আসেন আমরা সবাই মিলে কথা বলবো।’ নিয়োগ দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বাইরে আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয়করণ করে সরকার। অনিয়ম ও দুর্নীতি করে নিয়োগপ্রাপ্ত এই পাঁচ শিক্ষকের গেজেট প্রকাশ হয় ২০১৮ সালের ১৭ মে।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জালিয়াতি করা এই নিয়োগের বিষয়টি সে সময় বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক জানতেন। যে কারণে গেজেট প্রকাশের পর তাদের বেতন ছাড় করেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ঠাকুর দেবনাথ।

খুলনা মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন সেখ বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি। কিন্তু আমার এখানে কিছুই করার নেই।’

এ বিষয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলেন, এসব শিক্ষক দুর্নীতিই শুধু করেননি তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করছেন। প্রতিমাসে এই পাঁচজন শিক্ষক ও এক কেরানি এক লাখ ৭০ হাজার সরকারি টাকা তুলছেন। অর্থাৎ সরকারি অর্থ পানিতে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক নিভা রাণী পাঠক বলেন, ‘ওই বিদ্যালয়ের জাতীয়করণের বিষয়টা সরাসরি অধিদপ্তর দেখেছে, আমি তো দায়িত্বে এসেছি পরে। বিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানাতে পারবো।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আজিজ উদ্দিন বলেন, ‘বাইরে থেকে ভাড়া করে আনা শিক্ষক অর্থাৎ খন্ডকালীন শিক্ষকদের দিয়ে সরকারিকরণ করা যায় না। যারা এ কাজ করেছে তারা মারাত্মক অপরাধ করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (বিদ্যালয়) মো. বেলাল হোসাইন বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনে দেখছি। সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘সেখানে দুর্নীতি হয়েছে আমাকে প্রমাণ দিন। অবশ্যই আমি ব্যবস্থা নেবো।’

সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল
এন এ/ ০৯ ফেব্রুয়ারি

Source link