কোনো প্রকার ডিগ্রি ছাড়াই বাবা-ছেলে ডাক্তার!

0
200

টাঙ্গাইল, ১০ এপ্রিল – বাবা তোফাজ্জল হোসেন ছেলে মো. তাইবুর রহমান। সদর উপজেলার ছিলিমপুর ইউনিয়নের চরপাকুল্যা গ্রামে তাদের বাড়ি।

গ্রামের বাজারে একটি ওষুধের দোকান (তোফাজ্জল মেডিকেল হল) দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাবা ও ছেলে নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন।

তোফাজ্জল হোসেন একজন পল্লী চিকিৎসক এবং ছেলে তাইবুর রহমান ফার্মাসিস্ট। কিন্তু তারা রোগীদের পরিচয় দিয়ে থাকেন বাবা ও ছেলে দুইজনেই ডিগ্রিধারী ডাক্তার। এজন্য তারা দুজনেই তাদের নামের আগে ডাক্তার ব্যবহার করে থাকেন। এমনকি রোগীদের ব্যবস্থাপত্রও লিখে থাকেন তারা।

শনিবার (১০ এপ্রিল) দুপুরে পাকুল্যা বাজারে সরেজমিন তোফাজ্জল হোসেনের ফার্মেসিতে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা যায়।

সেখানে কথা হয় জোয়াহের আলী নামে একজনের সঙ্গে।

তিনি জানান, তার স্ত্রীর শরীর খুব দুর্বল। তাই এখানে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন। কিন্তু ডাক্তার তার স্ত্রীকে দেখে স্যালাইন দিয়ে রেখেছেন। তবে স্যালাইন পুশ করার আগে তার স্ত্রীকে কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়নি। পাশেই রাখা দুটি প্রেসক্রিপশনের দিকে নজর পরলে দেখা যায় রুনা ও লিমা নামে দুই নারীকে চিকিৎসাপত্র লিখে দিয়েছেন তার ছেলে মো. তাইবুর রহমান। রোগীর সমস্যা লেখা না হলেও রুনাকে ১ মাসের ৫টি ওষুধ ও লিমাকে এন্টিবায়োটিকসহ সাত দিনের ৪টি ওষুধ লিখে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন : টিকা নেয়ার দুই মাস পর করোনায় আক্রান্ত উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা

মো. তোফাজ্জল হোসেনের প্যাডে লেখা ডা. মো. তোফাজ্জল হোসেন, অভিজ্ঞ পল্লী চিকিৎসক এল এম এ এফ—ঢাকা, পাকুল্যা বাজার, টাঙ্গাইল ও মো. তাইবুর রহমানের প্যাডে লেখা ডা. মো. তাইবুর রহমান, ফার্মাসিস্ট, সিএইচডাব্লিউ টাঙ্গাইল, ডায়াবেটিক রোগ নিরাময়ে অভিজ্ঞ, পাকুল্যা বাজার টাঙ্গাইল।

কোনো প্রকার ডিগ্রি ছাড়াই নামের আগে তারা বাবা ও ছেলে দুজনেই ডাক্তার লিখেন। শুধু তাই নয়, নিজস্ব প্যাডে চিকিৎসাপত্র এবং জটিল রোগের জন্য এন্টিবায়োটিক ওষুধ লিখে দেন।

এছাড়া তাদের ফার্মেসিতেই পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই ফোড়া, গ্যাজ অপারেশন ও কাটা ছেড়ার চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে। এতে করে ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা গ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী জানান, পল্লী চিকিৎসকের সনদ নিয়ে মো. তোফাজ্জল হোসেন পাকুল্যা বাজারে তোফাজ্জল মেডিকেল হল নামের একটি ওষুধের দোকান শুরু করেন দীর্ঘ ১০/১১ বছর আগে। নিজের নামের আগে ডাক্তার লিখে ও পদবি ব্যবহার করে চিকিৎসাপত্রও ছাপিয়েছেন। সেখানে রোগীর নামসহ প্রকৃত ডাক্তারের মতো ৭দিন, ১৫ দিন ও ১ মাসের এন্টিবায়োটিকসহ নানা ওষুধ লিখে দেন। আবার তাদের দোকান থেকেই ওষুধগুলো বেশি দামে কিনে নিতে হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে তার দোকানের বাইরে তোফাজ্জল মেডিকেল হল নামে কোনো সাইনবোর্ড নেই। তবে ব্যবস্থাপত্রে তার দোকানের নাম লেখা রয়েছে। তাদের দোকানে এক কক্ষের ভেতর দুটি ভাগ করা। এক পাশে তারা দুজনেই রোগী দেখেন ও সেলফে বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ আরেক পাশে হাসপাতালের মতো বিছানা।

হাসান মিয়া নামে এক ব্যক্তি জানান, তাকে কয়েকদিন আগে তোফাজ্জল ডাক্তার সাড়ে ৫০০ টাকার ওষুধ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই ওষুধ অন্য দোকান থেকে সাড়ে তিনশ টাকায় এনেছিলাম। তারা বাবা ও ছেলে দীর্ঘদিন ধরে প্রেসক্রিপশন করে ওষুধ বিক্রি করে থাকেন।

রফিকুল ইসলাম স্বপন নামে এক পল্লী চিকিৎসক জানান, তাদের নামের আগে ডাক্তার লেখা, চিকিৎসাপত্র দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। এছাড়া অপারেশন ও অধিক দামে ওষুধ বিক্রি করাও ঠিক হয়নি। কেউ যদি করে থাকে তাহলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. তাইবুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে তোফাজ্জল হোসেন জানান, ২১ বছর ধরে এখানে তিনি ডাক্তারি করছেন। এতোদিন কেউ কিছুই বলেনি। প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রির নিয়ম নেই। এ জন্য নিজেরাই প্রেসক্রিপশন করে থাকেন। নামের আগে ডাক্তার লেখা ও প্রেসক্রিপশন করার অনুমতি তাকে জেলা পল্লী চিকিৎসক কল্যাণ সমিতির সভাপতি দিয়েছেন বলেও জানান।

টাঙ্গাইল জেলা পল্লী চিকিৎসক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল খালেক জানান, নামের আগে ডাক্তার লেখা ও চিকিৎসাপত্র দেওয়ার অনুমতি কোনো পল্লী চিকিৎসককে দেওয়া হয়নি। তোফাজ্জল হোসেন ও তার ছেলে তাইবুর রহমান যা করছেন তা অপরাধ। তারা ঠিক করছেন না।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. সাহাব উদ্দিন খান জানান, যারা এল এম এ এফ ডিগ্রি নিয়েছেন তারা হাইকোর্টে রিট করে রেখেছেন। তাদের মামলা চলমান রয়েছেন। আর যারা ফার্মাসিস্ট তারা কোনোভাবেই নামের আগে বা পরে ডাক্তার লিখতে পারেন না। খোঁজ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র : বাংলানিউজ
এন এইচ, ১০ এপ্রিল

Source link