”কৃষিকাজ করে সফল তরুণ উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম”

0
63


একটা সময় ছিলো যখন কৃষির গুরুত্ব ছিলো সার্বজনীন। বর্তমান বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো যেমন  যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা প্রভৃতি নিঃসন্দেহে এক সময় কৃষিনির্ভর দেশ হিসেবে বহুল পরিচিত ছিল। কৃষি কর্মকাণ্ডের উন্নতির ফলশ্রুতিতে তারা আজ শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলায় এখন যে কৃষির কদর নেই তা বললেও ভুল হবে। বরং বলতে গেলে  আমাদের অর্থনীতি এখনও প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে কৃষির উপর। কিন্তু বাংলার সে ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন ব্যবস্থা আর নেই। একসময় কৃষকশ্রেণী ও শাসকশ্রেণীকে পৃথক করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী ছিল না। এমন কি ছিলনা কোন  শক্তিশালী শহুরে শ্রেণীও। কিন্তু আজকের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো অর্ধেকের বেশি কৃষির উপর নির্ভর করলেও, কদর নেই কৃষকদের। বরাবরই তাদের স্বীকার হতে হয় বঞ্চনার । তারমধ্যে যদি আপনি হন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং আপনার আয়ের উৎস  হিসেবে যদি আপনি বেছে নেন কৃষি তাহলে তো অবজ্ঞার কোন শেষই নেই। 

আজকে কথা বলবো ঠিক এমনই একজন উদ্যোক্তা এম এ জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীর। তিনি একজন মাটির মানুষ, একজন প্রকৃত কৃষিপ্রেমিক। বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায়।

জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম

করোনা মহামারীর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ায় বাড়ি চলে আসতে হয়ছে আমাদের সবাইকে। জাহাঙ্গীরও তার ব্যতিক্রম নয়। পরিবার দরিদ্র হওয়ায় ঘরে বসে থাকারও উপায় নেই তার। এই ভাবনা থেকেই তার কৃষি কাজে হাত দেয়া। জাহাঙ্গীর বলেন, ”করোনা মহামারীর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ায় বাড়ি চলে আসতে হয়। কিছুদিন অপেক্ষা করার পর বুঝতে পেরেছিলাম যে সহজে বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে না। ফলে কিছু একটা কাজ করে টাকা রোজগারের চিন্তা মাথায় ছিল। পরিবার দরিদ্র হওয়ায় বসে বসে দিন পার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্যবসা করার মতো পুঁজি ও নেই তাই কৃষি কাজ শুরু করি”।

এ কাজে জাহাঙ্গীরের অনুপ্রেরণা বলতে সেভাবে কেউ ছিলনা। গাড়িভাড়া বাঁচাতে বাবার উৎপাদিত ফসল সাইকেলে করে বাজারে নিয়ে যেতো সে। এভাবে বাবাকে সাহায্য করতে করতে কৃষির প্রতি তার ভালোবাসা জন্ম নেয় এবং শুরু হয় এক নতুন পথচল।

তার কৃষি কাজের শুরুটা ছিল বলতে গেলে এক প্রকার সেকেলে পদ্ধতিতেই। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই তিনি বুঝতে পারেন  এভাবে চললে লাভের পরিমান হবে খুবই কম। এরপর তিনি আধুনিক কৃষি নিয়ে  ধারণা নিতে থাকেন এবং সে অনুযায়ী ফসল ফলানোর চেষ্টা করতে থাকেন এবং আজ তার সফলতা আপনাদের সামনে।

কৃষিকাজ করে সফল তরুণ উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম

কৃষিকাজ করে সফল তরুণ উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলম

ভাইয়েরা মিলে বাবাকে সহায়তা করায় আলাদা কোন লোকের দরকার হয় নি তাদের কাজে। একারণে  তাদের খরচ কিছুটা কমে যায়। গত বছর নভেম্বর, অক্টোবরের  দিকে যখন সবজির দাম ছিল আকাশচুম্বী, সেসময় তাদের জমি ভরা ছিলো ফসল এবং  এতে করে তারা বেশ লাভবানও হয়েছিলো।

 তিনি জীবনে অনেক প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হয়েছেন।  তিনি খুব আক্ষেপ নিয়ে বলেন, “সবজি নিয়ে বাজারে যাওয়ার সময় অনেকে কানাঘুষা করে, সেটা বুঝতে পারি। যেটা চোখে ভাসে সেটাই বিশ্বাস করে, কথা বলে। আড়ালের গল্প তারা বুঝে না। আমার বাবা-মাও সেরকম ই ৷ আমাকে এসব করতে দিতে চাইতো না”। 

তবে তিনি কখনো দমে যাননি। তার মনে হয়েছে সারাদিন বেকার ঘুরাঘুরির চেয়ে কিছু করলে তো অন্তত সে তার হাত খরচটা চালাতে পারবে। এছাড়া সে অনেকের মতো বেকার বিরক্তিকর সময় পার করছে না সময়টাকে কাজে লাগাতে পারছে এবং সেইসাথে পরিবার ও নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করতে পারছে।

 কৃষিতে সরকারের তথাকথিত এত সহায়তার মাঝে এক মুঠো সারও সে পায় নি যদিও কৃষি কর্মকর্তারা তার বিষয়ে অবগত। তিনি বলেন, ”আমাকে যদি কেউ অল্প করে হলেও সহায়তা করতো তাহলে আমি আরো অনেক জমিতে চাষাবাদ করতে পারতাম।  অনেক সময় এরকমও হয় যে ওষুধ দিতে পারছি না, তাই ফসল নষ্ট হচ্ছে। টাকা জোগাড় করার জন্য রাজমিস্ত্রীর কাজ করি, মানুষের জমিতে ধান কাটি। টানাপোড়েনের সময় সহায়তা পাওয়াটা কঠিন হয়। সহায়তা কে কিভাবে দেয় আমার জানা নেই৷ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলেও নানান অজুহাত দেখায়, কারো রেফারেন্স নিয়ে যেতে বলে। তবে আমার মনে হয় যে, আমাকে যদি কেউ কিছু ঋণও দিতো তাহলে আমার জন্য ভালো হতো”।

কৃষি নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, ”কৃষি নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা করাটা কঠিন। কারণ এত কষ্ট করেও মানুষের সম্মান পাওয়া যায় না। মানুষ মনে করে যে কৃষক মানেই গরিব মানুষ। তবে পরিকল্পনা আছে। কৃষিতেই ভিন্নরকম কিছু করার। তবে পুঁজি এবং জমির অভাবে আপাতত পারছি না। কারণ আমার নিজের কোনো জমি নেই। মানুষের জমি চুক্তিতে নিয়ে চাষাবাদ করতে হয়। তবে আশ্বাস দিতে পারি যে কোনো একদিন কৃষি কাজটাকে সম্মানের জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করবো”।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান করে সে বলেন, “কিছু না করার চেয়ে করাটা ভালো। সেটা যে কাজই হোক। মানুষের কানাঘুষায় কান দেওয়া বোকামী৷ যখন সামনে যেমন কাজ পাওয়া যায় সেটাই করা উচিত। তাহলে তরুণরা হতাশ হবে না। পকেটে খরচের টাকা থাকলে কেউ হতাশ হয় না। সেই সাথে মনও ভালো থাকে”।

আমাদের চারপাশে জাহাঙ্গীরের মতো রয়েছে হাজারো তরুণ যারা হয়তো লোকে কি বলবে এই ভেবে কাজ না করে বেকার বসে আছে। তাদের জন্য  জাহাঙ্গীর একজন রোল মডেল।

এছাড়া তার  মতো হাজারো সাহসী উদ্যোক্তারা  নিজের ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেনা পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে। তারা পাচ্ছে না সরকার থেকে কোন সহায়তা, পাচ্ছে না ব্যাংক থেকে ঋণ। এর  কারণ কি হতে পারে আমার জানা নেই।  এ ক্ষেত্রে আপনাদের মনোভাব কেমন?

 

You can check our other blogs here:https://ysseglobal.org/blog/the-success-story-of-zoom/

শাহানা তামান্না সাথী 

ইন্টার্ন, কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট 

YSSE



Source link