কালো মেয়ে বলে কি পুরস্কার পাবো না স্যারঃ রাজিব শর্মা

লেখকের কলম থেকেঃ লেখালেখি প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। কি আর হবে লিখে? এই ঘুনে ধরা সমাজ, রাষ্ট্র, প্রথা, ধর্মগুলো নিয়ম কানুন দেখলে ইচ্ছে করে বলি, আদিম, উলঙ্গ ব্যবস্থাপনা প্রথাগুলো টিকে থাকুক আজীবন। আজ যে আধুনিকতা, বিজ্ঞানের নামে যা নোংরামিতে ভরপুর মনে হচ্ছে কোন শিক্ষাবিভাগ খুব শীঘ্রই বলে বসবে একে, বিকে, সিকে এই সংস্কৃতির জন্য পুরস্কার দেওয়া হল। আর কেউ কেউ গর্বে গর্বিত হয়ে বলবে আমি এতটা পুরস্কার, আর কেউ বলবে আমি নাঁচে সেরা, আর কেউ বলবে আমি ফ্যাশনে সেরা, আর কেউ হঠাৎ বলে উটবে আমি চেহারা দেখিয়ে উচ্চতম ডিগ্রী নিয়ে আসলাম। আজ সন্ধ্যেয় এক লেখকের জোরাজুরিতে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন মডেল হান্টার নামক অনুষ্টানে গেলাম। বিচারকদের দেখে হাসি চাপিয়ে রাখতে পারলাম না কারণ তাদের অতীত জীবনী সবার অজানা নয়। চেয়ারে বসে আছি অনেক ধৈর্য নিয়ে। ফ্যাশনে একেক পরীরা আসছে তাদের নিজেদের উপস্থাপন করতে। সেখানে এক কালো মেয়ে যোগ দিল। তাকে দেখার সাথে সাথেই সবার অট্টহাসি। চিন্তা করলাম বাংলাদেশ তো এমন হওয়ার কথা নই। ‘ঘুনে ধরা প্রথা ও ধর্ম’ আমার এক লেখা মনে পড়ার সাথে সাথেই নীরব হয়ে বসে আছি। রেজাল্টে ফাস্ট হলো এক নেতার বোন। আর ১ পয়েন্ট পেল কালো মেয়েটা। বিচারককে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হল, কোন কোন বিষয়ে পড়াশোনা করছে! কিন্তু না করে নীরবে চলে আসি। কালো মেয়েটার জন্য মায়া হলো অনেক। রাগও উটল কেন মুখে এত ক্রীম, এই সেই মাখলো না, তাহলে তো ১ পয়েন্ট পেতে হতো না। অনুষ্টানের শেষে আয়োজিত হান্টার অনুষ্টানের পরিচালককে ফোন দিয়ে অনুরোধ করলাম, ভাই আপনাদের এই অনুষ্টানের সবচেয়ে কম পয়েন্ট পেল যে মেয়ে তার সাথে একটু কথা বলা যাবে। সে বলেন, স্যার অবশ্যই। বললাম একটু ডাকুন। সে আসলে তাকে বলি, কেমন আছেন আপনি? সে নীরব, টলমল করছে দু-চোখ। আমি আর কথা না বাড়িয়ে তাকে বলি, এই বইটা আপনার জন্য(আমার লেখা একটি ছোট বই ধরিয়ে দিলাম, অটোগ্রাফে লিখে দিলাম, ক্লাসের শেষ বেঞ্চের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কিছু আশা করা যায়, ফাস্ট বেঞ্চ থেকে নই)। সে সেটা নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এসে বলল, স্যার আপনি কেন এই লাইন লিখলেন? আমি বলি, আপনি কোন বিষয়ে পড়ছেন? বলল ফিজিক্সে। তাকে বললাম, এই নোংরা প্রথা, রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা, নৃত্যের নামে অশ্লীল নাচ, এসব আপনার জন্য নই বরং ফিজিক্স নিয়ে পড়ুন। এসব প্রথাগত পুরস্কার তারায় পায় যারা বর্তমানের এই মিথ্যে প্রথাতে মিশতে পারছেন। এই রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, প্রথা সব তাদের অধিকারে। তাদের শেকলে আমি আপনার মত কালোরা বন্দী। সে বলেন, স্যার, আমি এখানে আসতে চাইনি, আমাকে জনৈক শিক্ষক ‘চ’ আনলো। বললাম শিক্ষক ‘চ’ এর চারজন বউ। তবু তিনি এই সমাজের সংস্কৃতি জগতের অন্যতম ব্যক্তি। আমার চোখে সে একজন প্রতারক সংস্কৃতিবিদ, যিনি ২জন মেয়েকে ডিভোর্স বর্তমানে ‘ক’ ম্যাডামকে এই সংস্কৃতির ব্রেনে ডুকিয়ে বিয়ে করবেন। এসব নিম্নমানের খেলা সে ভালো পারেন। মেয়েটা নীরবে দাড়িয়ে রইলো, আমি তাকে বলি আমি সংস্কৃতিবান নই, এখানে এক পত্রিকার মালিক নিয়ে আসলো,সে বলল, স্যার আমি জীবনেও এসব “শরীর” দেখানো অনুষ্টান নামক ফ্যাশন শো তে অংশগ্রহণ করব না। সরি স্যার। আমি তার কথা শুনে হা করে চেয়ে রইছি। সে চলে গেলে, আমি তার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলাম। মনে মনে বলি, হায়রে সমাজের বিচারক! তোমরা আজীবন নষ্টদের সুযোগ দিবেন, চালিয়ে যান আপনাদের প্রথাগত শিক্ষা-সংস্কৃতির নামে অপ-সংস্কৃতির দেহ দেখার কৌশল ব্যবসা আর বিনিময়ে দিবেন বড় বড় সংবর্ধনা। দারুণ। যাক মূলে চলে আসি।

আজকের লেখার প্রসঙ্গ হল চিন্তা এবং নিজেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আপনি আয়নায় দাঁড়িয়ে যদি দেখেন একটা মোটা কিংবা কালো মুখে কালচে দাগ, কিংবা চোখের নিচে কালি পড়া একটা কুৎসিত মানুষ তবে এই লেখা আপনার জন্য। সাইকোলজিতে একটা কথা আছে ‘থটস আর অনলি থটস নট ফ্যাক্টস”। এর মানে হল , চিন্তা বিষয়টা মস্তিষ্কের নিউরোনগুলোর তড়িৎরাসায়নিক সংকেতগুলো ছাড়া আসলে আর কিছু না। চিন্তা মানেই বিষয়টা সত্যি এমন না, আর এই চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে আমরা যা দেখি তা আসলে সত্যি না।
আজকের বিষয় মিডিয়া ম্যানুপুলেশন না।কিন্তু এর সাথে মিডিয়া ম্যানুপুলেশন জড়িত বলে প্রথমে মিডিয়া ম্যানুপুলেশন নিয়ে আলোচনা করা জরুরী । মিডিয়া ম্যানুপুলেশন সাথে হয়ত অনেকেই পরিচিত, সহজ করে বললে, এর মানে হল আমাদের চিন্তা এবং মন এই মিডিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উদাহরণ দেই, এই যে মেয়েদের শরীরের এর শেপ ৩৬-২৪-৩৬ হলে সেটা পারফেক্ট বডি, এই কনসেপ্ট আপনি অবশ্যই জানেন, কিন্তু আপনি কিভাবে জানেন? আপনার মাথায় কি করে এল,কে এই মিজারমেন্ট করল আর কেন করল সেটা ভেবেছেন?

উত্তর দিচ্ছি, তার আগেএকটু ইতিহাস এর দিকে তাকাই, এই নারী শরীর নিয়ন্ত্রণের কনসেপ্ট নতুন না। চীনে মেয়েদের পা এর আঁকার ছোট করা, মিশরে সমস্ত চুল ফেলে দিয়ে পরচুল ব্যবহার, গলার উচ্চতা বাড়ানোর জন্য করেন উপজাতিদের রিং এর ব্যবহার, সবই নারী শরীর নিয়ন্ত্রেনের উদাহরণ। কেউ ধর্ম, কেউ রীতি কিংবা কেউ সৌন্দর্যের নামে নারী শরীরের এই পরিবর্তন কে জায়েজ করেছে।

ব্রিটিশ ও ইউরোপিয়ান সম্ভ্রান্ত নারীরা লম্বা গাউনের নিচে এক ধরনের শক্ত অন্তর্বাস এবং বডি শেইপার ব্যবহার করতেন যাতে তাদের স্তন্য, কোমর এবং নিতম্বের আঁকার পরিবর্তিত হত। যেহেতু ক্ষমতাধর এলিট সোসাইটি ঘাস খেলে সেটাই হয় স্ট্যান্ডার্ড তাই পরবর্তীতে সাধারণ নারীরা ঐ সব নারীদের কে অনুকরণ করতে বডি শেইপিং শুরু করে।
আর বর্তমানে বডি অপ্সেশনের কনসেপ্ট লুফে নিয়েছে ক্যাপিটালিজম। ৩৬-২৪-৩৬ কনসেপ্ট হল, এই বডি অপ্সেশন কে কাজে লাগিয়ে ক্যাপিটালিজম প্রসারের ঠিকাদার মিডিয়ার উগড়ে দেয়া জঙ্গাল। জঙ্গাল বলার কারন, ২৪ কোমর মানে অস্বাভাবিক রকম সরু কোমর, মেডিক্যাল সাইন্স এর ভাষ্য অনুযায়ী এই কোমর শরীরের উপরের ভাগের সমস্ত ভার বহন করার জন্য মোটেও হেলদি না।
কিন্তু প্লেবয় ম্যাগাজিন এই কনসেপ্ট সারা পৃথিবীতে এমন ভাবে ছড়িয়েছে যে, নারী শরীর এর জন্য এটাই স্ট্যান্ডার্ড যৌনাবেদনাময়ী শরীর কিংবা পারফেক্ট শরীর। আর এই শরীর পাবার জন্য সারা পৃথিবীটিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রডাক্ট বিক্রি হচ্ছে। প্লেবয়ের বদৌলতে পাড়ার সদ্য গোঁফ গজানো ছেলেটা জানে নারী শরীর এর পারফেক্ট সাইজ হল ৩৬-২৪-৩৬! আর সদ্য বেণি দুলিয়ে হাই স্কুল পেরোন মেয়েটা জানে ফোমের অন্তবাস না পরলে তার শরীর কুৎসিত লাগবে!
এবার আসি আজকের লেখার প্রসঙ্গে, লেখার শুরুতেই বলেছিলাম আজকের লেখার প্রসঙ্গ হল চিন্তা তথা নিজেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আপনি আসলে আয়নায় নিজেকে দেখেন না, দেখেন আপনার মাথায় বহুদিন ধরে যে কনসেপ্টগুলো ঢুকানো হয়েছে সেই স্ট্যান্ডার্ড এর সাথে মেলে এমন মানুষটাকে, যখন মেলে না তখন নিজেকে কুৎসিত ভাবতে শুরু করেন।

আপনি জেনেছেন কালো দাগ মানে কুৎসিত তাহলে কালো টিপ কেন পরেন ? ওটাও তো দাগ তাই না ? কালো রঙ মানে কুৎসিত তাহলে কালো কাজল কেন পরেন ? শরীরে প্রচুর পশম মানে কুৎসিত তাহলে মাথায় সেই পশম মানে চুল না থাকলে সেটা কুৎসিত কেন ? এই যে শরীরে মেদ জমা কুৎসিত কিন্তু স্তন্যে কিংবা নিতম্বে মেদ কেন সুন্দর ? কিংবা ভ্রু প্লাক অথবা বর্তমানে প্লাক করা ভ্রু একে মোটা করা কেন?
কারন আপনি নিজেকে যখন আয়নায় দেখেন তখন চারপশের মাধ্যমগুলো থেকে শেখা সৌন্দর্যের মাপকাঠিগুলো দিয়ে নিজেকে বিচার করতে বসেন। দীপিকা সুন্দর কিন্তু তার স্তন্য ৩৬ না অথচ আপনার হয়ত স্তন্য ভরাট কিন্তু আপনি সুন্দর না । বিষয়টা খুব উদ্ভট না ? প্লেবয় এর মডেলরা শুকনা পাঠকাঠি অথচ আপনি শুকনা বলে রীতিমত কুৎসিত ভাবেন নিজেকে! কিন্তু কেন ?
প্রত্যেকটা মানুষ এর শরীর আলাদা, কেউ শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকার জন্য শরীর চর্চা করে সেটা আলদা বিষয় কিন্তু এর সাথে রঙ, শরীরের গঠন, আঁকার , সাইজ এর কোন সম্পর্ক নেই পুরাটাই দেখার দৃষ্টি ভঙ্গি ।

এই কারনে সন্তানের কোন খুঁৎ মায়ের চোখে পড়ে না। এই কথা নিজের জন্য প্রযোজ্য। নিজেকে ভালবাসলে আয়নার সামনের মেয়েটাকে মনে হবে সব চেয়ে সুন্দর মেয়ে, যার চোখে প্রচণ্ড মায়া আর হাসলে গালে আনন্দ ভাঁজ হয়ে লেগে থাকে ।
জাস্ট নিজেকে সুন্দর ভাবতে শুরু করুন, তারপর মাথা থেকে ঐ যে সুন্দরের ফালতু কনসেপ্টগুলো ফেলে দিন এবং আয়নায় দাঁড়ান । দেখবেন আপনি নিজে আপনার প্রেমে পড়েছেন।

Writer : Mr. Rajib Sharma (M.Div), Journalist, Crime Investigator of The Crime, Crime Patrol and Ediroial Asst. of The Bdnewstimes.com

অনুগ্রহপূর্বক এই লেখা লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশকের অনুমতিব্যতীত কোথাও প্রকাশ না করার বিশেষভাবে অনুরোধ রইল।

মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.