কাজী আরেফ আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

0
96

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া।।
কাজী আরেফ আহমেদ আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নাম। যদিও এ নামটি আজকের প্রজন্মের কাছে অচেনা এবং ব্যক্তিটিকে আজ অনেকেই চেনেন না। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে আজ অনেকেই তাকে চিনলেও তা প্রকাশ করতে চান না। স্বাধীনতা-পূর্ব কাজী আরেফ আহমেদকে চিনতে বা জানতে হলে আমাদের ‘নিউক্লিয়াসকে’ জানতে হবে।

কাজী আরেফ আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াসের সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রূপকারদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের সমন্বয়ক ও বিএলএফ-এর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি জাসদের কৃষক ফ্রন্ট জাতীয় কৃষক লীগের সভাপতি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন।

কাজী আরেফের পৈত্রিক নিবাস কুষ্টিয়া জেলার মীরপুর উপজেলার খয়েরপুর গ্রামে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বাবার সাথে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬০ সালে পুরান ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। পরে জগন্নাথ কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৬৬ সালে বি এস-সি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। পাকিস্তান সরকার বিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি কালো তালিকাভুক্ত হন। ফলে তাকে স্নাতকোত্তর চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

কাজী আরেফ আহমেদ ১৯৬০ সালে জগন্নাথ কলেজের ছাত্রাবস্থায় রাজনীতিতে জড়িত হন। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরেুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এ বছরই তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও আরেফ ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ গঠন করেন। পরবর্তীতে শাখাটি ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তিন সদস্য বিশিষ্ট পরিষদটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে যাবতীয় নীতি-কৌশল প্রনয়ণের কাজে নিয়োজিত হয়। ১৯৬৪ সালে আরেফের পৈত্রিক নিবাস পুরনো ঢাকার ১৪/৩ অভয় দাস লেনের বাড়িতে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন স্থাপন করা হয়। এ মেশিনে মূদ্রিত ‘জয়বাংলা’ ও ‘বিপ্লবী বাংলা’নামে স্বাধীনতার ইশতেহার প্রচার করা হতো।

কাজী আরেফ আহমেদবাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর জাসদ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাসদের মুখপত্র গণকণ্ঠ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৮ সালে জাসদের কৃষক সংগঠন জাতীয় কৃষক লীগের সভাপতি এবং ১৯৭৯ সালে জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাসদ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়ামের সদস্য নির্বাচিত হন। এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সময় গ্রেফতার হন এবং ১৯৮৮ সালের ৩১ মার্চ মুক্তি পান। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কাজী আরেফ ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার কালিদাসপুরে একটি জনসভায় বক্তব্যরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্রে যে কজন ছিলেন কাজী আরিফ আহমেদ তাদেরই একজন ছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রচণ্ড সাহসের সাথে যারা নতুন রাষ্ট্রটিকে সঠিক ঠিকানায় পৌঁছাতে চেয়েছিলেন তাদের মাঝে তিনি অন্যতম। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে কাজী আরিফের অনন্য ভূমিকা রয়েছে। তার হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। যদিও কোনো হত্যাই হয় না পরিকল্পনাকারী ছাড়া। কাজী আরেফ আহমেদ মূলত একজন জনদরদি, আত্মমর্যাদাশীল, নির্লোভ মানুষ ছিলেন। রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়ন প্রশ্নে তিনি ছিলেন একরোখা ও জেদি।

কাজী আরেফ আহমেদকে রাষ্ট্র যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় বীর কাজি আরেফ আহমেদকে সঠিক মূল্যায়ন করাটা জরুরি। তার কথা তরুণ প্রজন্মকে জানাতে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে রাজনীতিতে যে দুর্বৃত্তায়ন চলছে, এই দুর্বৃত্তায়ন থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করতে এই সময়ে কাজী আরেফ আহমদের বেশী প্রয়োজন ছিল।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামের বীর সেনানী, জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা।

[ লেখক: মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, কৃষক-শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন ]