করোনা ভাইরাস মানবদেহের কোথায় কোথায় আক্রমণ করে?

0
279

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসে ইতোমধ্যে ৭ হাজার ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৮২ হাজার ৫৫০ জন। এছাড়া সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৯ হাজার ৮৮১ জন। তবে বিশ্বব্যাপী এত মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরেও মানবদেহের ঠিক কোথায় করোনা ভাইরাস আক্রমণ করে এবং কিভাবে কাজ করে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোন ধারণা এখনো আমরা পাইনি।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণের মধ্যে রায়েছে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও সাধারণ ফ্লু-তে আক্রান্ত হওয়ার কিছু শারিরীক দুর্বলতা। তবে সাধারণত ঠান্ডা লাগলেও এসব উপসর্গ মানুষের মধ্যে দেখা দেয়। ফলে উপসর্গ দেখে ঠিক বোঝা যাবে না যে এটা করোনার লক্ষণ নাকি সাধারণ ফ্লু।

করোনা ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?
সাধারণত কাশি, হাঁচির মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে থাকা মানুষের এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। মানবদেহের নাক, মুখ ও চোখকে বলা হয় জীবাণুর প্রবেশদ্বার। করোনা ভাইরাসও আমাদের দেহে নাক, মুখ ও চোখের মাধ্যমে প্রবেশ করে। বিভিন্ন কণিকার মাধ্যমে নাসারন্ধ্রে প্রবেশের পর খুব দ্রুতই এ ভাইরাস মানুষের গলায় প্রবেশ করে। এরপর করোনা ভাইরাসের বহিরাবরণে আমিষের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং তার জেনেটিক গঠন পরিবর্তন করে মানব কোষে প্রবেশের উপযুক্ত হয়।

টেনেসির ন্যাশভিলের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. উইলিয়াম শ্যাফনার বলেন, প্রবেশের পর করোনা ভাইরাস মানব কোষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং নিজের বংশ বৃদ্ধি করে।

ভাইরাস বংশ বৃদ্ধি করে এবার তার পাশের কোষগুলোকে আক্রমণ করে। এ প্রক্রিয়া শুরু হলে গলা ব্যাথা অনুভূত হয় এবং শুকনা কাশি শুরু হয়। এরপর করোনা ভাইরাস শ্বাসনালীতে অবস্থান করে ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামতে থাকে, যোগ করেন ডা. উইলিয়াম শ্যাফনার।

যখন এ ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসে পৌঁছায় তখন শ্লেষ্মা ঝিল্লী যেন আরও উদ্দীপ্ত হয়। এ সময় ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে এ ভাইরাস। এ অস্থায় করোনা ভাইরাস ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেখানে পুঁজ ও মৃত কোষ বিস্তার করে। এছাড়া নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। এ অবস্থায় কারও কারও প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ফুসফুস একপ্রকার তরলে পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার পরিস্থিতি থাকে না। এ পরিস্থিতিতে ওই রোগীর মৃত্যু হয়।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শু-ইউয়ান জিয়াও চীনে করোনা আক্রান্ত রোগীদের প্যাথলজি প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখেছেন। তিনি বলেন, ভাইরাস আক্রান্ত এলাকা থেকে ফুসফুসের উভয় পাশেই বিস্তার করে। সেখান থেকে উচ্চ শ্বাসনালী, শ্বাসনালী ও কেন্দ্রীয় শ্বাসনালীতে পৌঁছতে কিছুটা সময় নেয়।

তবে করোনা আক্রান্তের শুরুতে এ বিষয়টি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারনা না থাকায় চিকিৎসকরা ধরতে পারেন নি। ফলে প্রথমদিকে উহানে আক্রান্ত অনেককেই চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এর ফলে তাদের মাধ্যমে তাদের পরিবার ও আশপাশে ভাইরাস ছড়ায়।

শুধুমাত্র ফুসফুসেই কি এ ভাইরাস আক্রমণ করে?
শুধুমাত্র ফুসফুসই নয় কারও কারও আন্ত্রিকতন্ত্রে আক্রমণ করতে পারে। এক্ষেত্রে ওই রোগীর ডায়রিয়া এবং বদহজম হতে পারে। এছাড়া মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন অঞ্চলেও করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, জানাচ্ছিলেন ডা. শ্যাফনার।

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রসমূহ জানাচ্ছে, মানুষের রক্ত ও মলে করোনা ভাইরাসের আরএনএ শনাক্ত হয়েছে। তবে এটা স্পষ্ট নয় এর মাধ্যমে করোনা বিস্তার করছে কি না।

ওয়াশিংটনের এভারেটের প্রভিডেন্স রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান ডা. জর্জ ডিয়াজ জানান, অস্থি-মজ্জা এবং বিভিন্ন অঙ্গ যেমন যকৃতে করোনা সংক্রমণ দেখা গেছে। এছাড়া ক্ষুদ্র রক্তনালীতেও করোনার প্রদাহ লক্ষ্য করা গেছে। এর ধরন অনেকটা ২০০২ এর সার্স ভাইরাসের সাথে মিল রয়েছে।

ডা. শাফনার আরও বলেন, এ ভাইরাস মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গে অবস্থান করতে পারে। যেমন- কিডনি, যকৃত, হৃদপিন্ড। অনেকসময় করোনা এসব অঙ্গ অকেজো করে দেয়। এছাড়া এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে। ফলে আক্রান্ত অঙ্গ দ্রুতই ক্ষতির দিকে ধাবিত হয়। এরফলে অনেক রোগী শুধু করোনার আক্রমণের জন্য নয়, নিজের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংশের কারণে ক্ষতির দিকে ধাবিত হয়।

করোনা ভাইরাস মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম কিনা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনো নিশ্চিত নন। তবে সার্স ভাইরাস কারও কারও মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটিয়েছিল। যেহেতু সার্স এবং করোনার অনেক মিল রয়েছে, ফলে অনেকেই মনে করছেন এটা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে, করোনা আক্রান্তদের ৮০ ভাগই অল্পতেই সেরে ওঠেন। তবে ২০ ভাগ আবার মারাত্বক আকার ধারণ করে। মূলতঃ যারা আগে থেকেই ফুসফুস জনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন, তাদের জন্য এটি মারাত্বক আকার ধারণ করে। এক্ষেত্রে বয়স্ক ব্যক্তিরা অধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত যেহেতেু এ ভাইরাস প্রতিরোধী কোন টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, ফলে সচেতনতার মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত থাকাটাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।

সূত্র: দ্য স্ট্রেটস টাইমস

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে