করোনায় ফুসফুস কিডনি হার্টের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে

0
233

করোনা ভাইরাসের জেরে প্রতিদিনই গোটা বিশ্বে বেড়ে চলেছে প্রাণহানি। যদিও এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই কিছু দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে কোভিড চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, যেসব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়, তার মধ্যে মোটামুটি ৪৫ শতাংশ বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরও কিছু চিকিৎসা লাগে। ৪ শতাংশ মানুষকে কিছু দিন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে রেখে চিকিৎসা করলে ভালো হয়। আর মাত্র এক শতাংশ মানুষকে কোভিডের জের বয়ে বেড়াতে হয় জীবনভর।

ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জোসেফ ব্রেনান বলেন, ‘আরও ছয় মাস না গেলে কোভিডের ক্ষতি সম্পর্কে একেবারে সঠিকভাবে বলা যাবে না। তবে করোনা ভাইরাসের যে দুই সহোদরের পরিচয় আমরা পেয়েছি, সেই সার্স ও মার্স মহামারীর দৌলতে অনেক কিছুই বলা সম্ভব এবং সেসব পূর্বাভাসের অনেকগুলোই মিলে যাচ্ছে।

ব্রেনান বলছেন, কিছু রোগী আছেন, সেরে ওঠার দেড়-দু’মাস পরও যাদের শুকনো কাশি থেকে গিয়েছে। রয়ে গেছে বুকে জ্বালাধরা ভাব, গভীরভাবে শ্বাস টানা ও ছাড়তে না পারার সমস্যা। কারণ সংক্রমণ ও প্রদাহের ফলে ফুসফুসের কিছু অংশের স্থায়ী ক্ষতি। যত নিউমোনিয়ার বাড়াবাড়ি হয়েছে, ক্ষতি হয়েছে ততই। সিটি স্ক্যানে ধরা পড়েছে ধূসর প্যাঁচ, যাকে বলে গ্রাউন্ড গ্লাস ওপাসিটি।

চীনে হওয়া এক সমীক্ষা

থেকে জানা যায়, জটিল রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশের সিটি স্ক্যানে এ চিহ্ন রয়েছে। রেডিওলজি জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি সমীক্ষায় জানা যায়, চীনের হাসপাতালে ভর্তি থাকা ৭০ জন গুরুতর রোগীর মধ্যে ৬৬ জনের ফুসফুসের ক্ষতি হয়েছে এবং তার অর্ধেকের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে ধূসর প্যাঁচ। এমনকি উপসর্গহীন কোভিড রোগীদের মধ্যেও এ সমস্যা দেখা গেছে এবং তার কিছু দিন পর জাঁকিয়ে বসেছে রোগ।

এ ক্ষতি যে সহজে সারার নয়, তার প্রমাণ আছে অতীতেও। নেচার জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে বিজ্ঞানীরা জানান, ২০০৩-২০১৮ পর্যন্ত ৭১ জন সার্স রোগীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এর তিন ভাগের এক ভাগের মধ্যে ফুসফুসের ক্ষত চিহ্ন থেকে গেছে এবং তার হাত ধরে পরিশ্রম করার ক্ষমতা কমেছে তাদের। ৩৬ জন সার্স রোগীকে পর্যবেক্ষণ করেও এই একই তথ্য পাওয়া গেছে। তাও এ দুই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল একটি ফুসফুস। কিন্তু কোভিডে সংক্রমণ হচ্ছে দুটি ফুসফুসেই।

ভারতের ক্রিটিকাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ সৌতিক পা-া বলেন, ‘কোভিডে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা আরও বেশি হবে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এটুকু বলা যায় যে, জটিল নিউমোনিয়া বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোমে ভুগে উঠলে ফুসফুসের যে ক্ষতি হয়, তা সারতে কম করে ৬-১২ মাস সময় লাগবে। তারপরও পুরোপুরি ঠিক হবে কিনা বলা যায় না? এর ওপর কারও যদি হাঁপানি, সিওপিডি বা ইন্টারস্টিসিয়াল লাং ডিজিজ ইত্যাদি থাকে, কার্যকারিতা ফিরে আসবে বড়জোর ৬০-৭০ শতাংশ।’

শুধু ফুসফুস নয় কোভিড থেকে রক্ষা নেই হৃদযন্ত্রেরও। টেক্সাস হেল্থ সায়েন্সের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আইসিইউতে ভর্তি কোভিড রোগীদের মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশের হার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে হার্ট ফেইলিওর, অ্যারিদমিয়া, হার্ট অ্যাটাক, সবই হতে পারে। আগে থেকে হার্টের রোগ থাকলে তো কথাই নেই। এ সমস্যার রেশ থেকে যায় সেরে ওঠার পরও। ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। বাড়ে কার্ডিওমায়োপ্যাথির আশঙ্কাও। অর্থাৎ হার্টের পেশি দুর্বল হয়ে শরীরে রক্ত সরবরাহের ঘাটতি হয়। ফলে আগের মতো দৌড়ঝাঁপের জীবন ফিরে আসে না অনেক সময়ই।

সৌতিক পা-া বলেন, ‘ভাইরাসের প্রভাবে যাদের হার্টের পেশিতে সরাসরি প্রদাহ হয়, যাকে বলে ভাইরাল মায়োকার্ডাইটিস, তাদের সেই ক্ষতের দাগ থেকে যেতে পারে দীর্ঘদিন। পেশি দুর্বল হয়ে রক্ত সরবরাহের ব্যাঘাত হয়। নিয়মিত ওষুধপত্র খাওয়ার সঙ্গে ধূমপান ও মদ্যপান ছেড়ে দিলে ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পরিশ্রমের কাজ না করলে ৬-৮ সপ্তাহে অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়।’

কোভিডের জটিল পর্যায়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিডনি ও লিভার। সৌতিক পা-া বলেন, ‘কোভিড আক্রান্তের পর কিডনি ও লিভার স্বাভাবিক হতেও সময় লাগে বেশি, কম করে ৩-৪ সপ্তাহ। কখনো পুরো স্বাভাবিক হয়ও না। বিশেষ করে যদি আগে থেকে কোনো সমস্যা থাকে। কারও হয়তো সামান্য কিডনির সমস্যা ছিল, তার রোগ এক ধাক্কায় বেশ খানিকটা বেড়ে যেতে পারে। কারও হয়তো এমন পরিস্থিতি ছিল যে, বছর দুয়েক বাদে ডায়ালিসিস করলেও চলত, কোভিডের ধাক্কায় সেই সময়টা এগিয়ে আসতে পারে। খবর আনন্দবাজারের।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে