উপাচার্য কলিমউল্লাহর দুর্নীতির ‘হাওয়া ভবন’

0
89

ঢাকা, ১২ মার্চ – বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) সব ধরনের অবকাঠামো সুবিধা থাকার পরও উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়াই ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিস চালু করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকরা। সাত জন শিক্ষক শিক্ষামন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগে বলেছেন, ঢাকায় অফিস খুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজ করার নামে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অপকর্ম করা হচ্ছে। প্রায় ৪ বছর লিয়াজোঁ অফিস চালু করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।

এদিকে উপাচার্য কলিমউল্লাহর দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে আগামী রবিবার (১৪ মার্চ) ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্রের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ক্যাম্পাসে আসছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

সাত শিক্ষকের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই ঢাকার মোহাম্মদপুরে আফরোজা গার্ডেন নামে একটি বাসার দোতলায় এই লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে উপাচার্যের নিজস্ব শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেধ। সেখানে বসেই উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, ভাউচার বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্যসহ সব অপকর্মের প্ল্যান করেন। শিক্ষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘কলিমউল্লাহর দুর্নীতির হাওয়া ভবন।

অভিযোগে জানা যায়, উপাচার্য কলিমউল্লাহ নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে সব ধরনের সভা করেন ঢাকা অফিসে। অর্থ কমিটির সভা, সিন্ডিকেট সভা, শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড, কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ বোর্ড, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের আপগ্রেডেশন, প্রমোশন বোর্ড এবং ড. ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সব ধরনের সভা; গবেষণারত শিক্ষার্থীর ক্লাস, সেমিনার, কনফারেন্স লিয়াজোঁ অফিসে করা হচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার জন্য শত শত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সেখানে যেতে বাধ্য করছেন উপাচার্য। এ খাতে অতিরিক্ত কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

আরও পড়ুন : প্রতারণা মামলায় স্বর্ণার জামিন নামঞ্জুর, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ

অতিরিক্ত ব্যয় না করে উপাচার্যকে এসব কর্মকাণ্ড ক্যাম্পাসে সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে ২০১৯ সালের ১৬ মে ইউজিসির অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালক মো. রেজাউল করিম হাওলাদার স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সভা ঢাকা লিয়াজোঁ অফিসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ডিএ/টিএ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এই ব্যয় কমানোর অনুরোধ জানানো হলো।’ কিন্তু ইউজিসির এই নির্দেশনা মানেননি উপাচার্য। পরে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০২০ সালের ১৩ মে ইউজিসির অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচারক মো. শাহ আলম স্বাক্ষরিত পর্যবেক্ষণে ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসে অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর জন্য পুনরায় উপাচার্যকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু উপাচার্য তা উপেক্ষা করেন।

লিখিত অভিযোগে আরও জানা গেছে, উপাচার্য একাধারে ঢাকায় অবস্থান করলেও তিন দিনের ব্যবধানে রংপুর থেকে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে রংপুরে যাতায়াতের বিল উত্তোলন দেখিয়েছেন প্রায় ৩৮ লাখ টাকার মতো। শুধু তাই নয়, তিনি অগ্রিম ডিএ/টিএ উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগে জানা গেছে।

‘মা-কে নিয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠন করেন উপাচার্য’

অভিযোগ করা হয়, উপাচার্য ও তার মা-দুজন মিলে বোর্ড দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ এবং জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান উপাচার্য নিজেই। ওই অনুষদের ডিন হিসেবেও তিনি নিয়োগ বোর্ডের সদস্য। অপরদিকে, তার মাকে দেখানো হয়েছে বিশেষজ্ঞ সদস্য। ফলে ওই দুই বিভাগের ক্ষেত্রে উপাচার্য এবং তার মা-দুজন নিয়ে বোর্ড দেখিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন অধ্যাপক কলিমউল্লাহ।

‘বহিরাগত এক শিক্ষক ১০ নিয়োগ বোর্ডের সদস্য’

শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি বিভাগের মধ্যে অধিকাংশ বিভাগেই নিয়োগ বোর্ডে সদস্য করা হয়েছে উপাচার্যের আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) এর বর্তমান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল কাশেম মজুমদারকে ১০টি নিয়োগ বোর্ডের সদস্য করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিষয় সংশ্লিষ্টতা দেখা হয়নি। যেমন অধ্যাপক আবুল কাশেম মজুমদারকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, পরিসংখ্যান, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগসহ তার বিষয়-সংশ্লিষ্ট নয় এমন বোর্ডেও সদস্য রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতি বোর্ডেরও সদস্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. শুচিতা শারমিনকে চারটি বিভাগের নিয়োগ বোর্ডের সদস্য রাখা হয়েছে।

‘ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের নামে কোটি টাকা অপচয়’

‘উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দায়িত্ব নেওয়ার পর ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শতাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার পর ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের নামে ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসে মাসের পর মাস থাকতে বাধ্য করে প্রায় কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। অথচ ইউজিসি ফাউন্ডেশন ট্রেনিং বন্ধ করার জন্য বার বার তাকে চিঠি দিয়ে নিষেধ করেছেন’—অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।

‘অভিনব পদ্ধতিতে নিয়োগ বাণিজ্য’

অভিযোগে জানা যায়, উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ এ পর্যন্ত শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। এর বিজ্ঞপ্তি প্রদান করেছেন তিনি নিজেই। রংপুরে আসে না এমন একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা এবং একটি বাংলা দৈনিকে সার্কুলার দেওয়া হয়। পত্রিকা দুটির সার্কুলেশন একেবারেই কম। বহুল প্রচারিত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিলে আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়বে, এ কারণে কৌশলে সবগুলো নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি এই পত্রিকা দুটিতেই প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, আগেই তাদের আবেদনপত্র নিয়ে নেওয়া হতো। তার পরেও জানাজানি হয়ে গেলে কৌশলে সেই আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ের নামে বাদ দেওয়া হতো অথবা আবেদনপত্র গায়েব করা হতো। এসব করতো উপাচার্যের সিন্ডিকেটের চার সদস্য। এভাবে নিয়োগ দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

‘মার্কেটিং বিভাগে একজন সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ওই পদের জন্য একজন আবেদনকারীকে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। আরেকজন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি আপগ্রেডেশনের জন্য আবেদন করেন। ফলে সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে একজনকেই ডাকা হয় এবং তাকেই পরীক্ষায় প্রথম দেখিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। অপরদিকে, অভ্যন্তরীণ প্রার্থীকে ওই বোর্ডেই আপগ্রেডেশন দেওয়া হয়। অথচ তিন জনের কম প্রার্থী উপস্থিত থাকলে নিয়োগ দেওয়ার কোনও নজির কোথাও নেই’—অভিযোগ শিক্ষকদের।

উপাচার্যের একান্ত সচিব পিএস আমিনুর রহমানের ভাইরা একেএম মাহমুদুল হককে ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ আছে। আবার নিয়োগ দেওয়ার এক বছর পার না হতেই তাকে সহকারী অধ্যাপক পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়।’

উপাচার্য তার ব্যক্তিগত সহকারীর (ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে সিন্ডিকেট কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত) স্ত্রী নূর নাহার বেগমকে সিনিয়র সেমিনার সহকারী পদে, মামাতো ভাই গোরাপ মিয়া ও বন্ধুর ছোটভাই হযরত আলীকে এমএলএসএস পদে এবং ফুফাতো ভাই কাওসার হোসেনকে সেমিনার সহকারী পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়োগের নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগকারীদের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, ‘আমরা ৪৫ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটের দালিলিক প্রমাণসহ অভিযোগ করেছি। ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসকে উপাচার্য অনিয়মের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। সেখানে সুইপার থেকে শুরু করে সব পদমর্যাদার শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তার স্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শাড়ি কিনতে বাধ্য করেছেন। তার নির্ধারণ করা দোকান থেকে কোর্ট, জামা, টাই, জুতা এবং তার লেখা জার্নাল কিনতে বাধ্য করেছেন। নয়া নিয়োগ পাওয়া ওই সব শিক্ষক- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একই কালারের পোশাক পরতেও বাধ্য করেন তিনি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ তদন্ত চাই, তার সব অপকর্মের দালিলিক প্রমাণ তদন্ত কমিটির কাছে প্রদান করবো।’

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
এন এইচ, ১২ মার্চ

Source link