উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ অনুযায়ী মর্যাদা বাড়েনি

71


স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৫২ বছরে এসে দেশের উন্নয়নের সকল স্তরে নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হলেও নারীর অংশগ্রহণের সঙ্গে তার অধিকার ও মর্যাদার দিকটি এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। নারীর প্রতি সমাজের অধঃস্তন ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ এখনো একটি মৌলিক সমস্যা হিসেবেই আছে। নারীর অংশগ্রহণের সঙ্গে অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন হবে না।

শনিবার (৯ এপ্রিল) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ৫২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে পেশাজীবী নারীদের সঙ্গে অনলাইনে আলোচনায় এ কথা বলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ‘বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করি, সমতার চেতনা প্রতিষ্ঠা করি’- প্রতিপাদ্যে অনলাইন আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন সাংগঠনিক সম্পদক উম্মে সালমা বেগম এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম।

এ সময় সীমা মোসলেম বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও গৃহীত কর্মসূচিগুলো তুলে ধরে বলেন, একটি স্বেচ্ছাসেবী গণনারী সংগঠন হিসেবে নারীমুক্তি, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বহুমুখী পদ্ধতিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে সংগঠনটি। বৈষম্য দূর করতে প্রত্যেককে নিজ নিজ ক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করার পাশাপাশি মূলধারার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

আয়োজনে মূল আলোচনা করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও আবৃত্তি শিল্পী শারমিন লাকী। তিনি বলেন, যত দিন না নারীরা মর্যাদা পাবে, নারীদের মানুষ হিসেবে ভাবা হবে ততদিন বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য নারীকেও সচেতনভাবে এগোতে হবে। পরিবার থেকেই এই বৈষম্য দূরের কাজ শুরু করতে হবে।

এ সময় তিনি নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে বাংলাদেশের মহিলা পরিষদের সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরেন ও তাদের কাজের প্রশংসা করেন।

তরুণ প্রজন্মের বিভিন্ন পেশাজীবী নারীদের মধ্যে আরো আলোচনা করেন থিংকস্পেস ইন্টেরিয়র স্টুডিওর ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্ট এবং সহ প্রতিষ্ঠাতা লাভা বিশ্বাস নন্দিনী, দয়ীতার সত্ত্বাধিকারী সাইদা সুলতানা মিলি, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার কর্মী ও নৃত্যশিল্পী সঞ্জীবনী, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার (উইমেন রাইটস এন্ড জেন্ডার ইকুয়ালিটি) ফৌজিয়া আফরোজ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের অ্যাডিশনাল ডেপুটি পুলিশ কমিশনার লায়লা ফেরদৌসী, কোডিজাইন সফটওয়ার ডেভেলপমেন্টের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হৈমন্তী খান, এবং দলিত নারী ফোরামের প্রোগ্রাম অফিসার তামান্না সিং বারাইক।

আলোচকরা বলেন, গোটা কয়েক নারীর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও আশেপাশের ঘটনা থেকে বোঝা যায় বেশির ভাগ নারী এখনও অনেক বৈষম্যের শিকার। একটি বৈষম্যের সঙ্গে অন্য একটি বৈষম্যের জোরাল সম্পর্ক থাকে। গতানুগতিক পেশার বাইরে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় একটা মেয়ে চিরাচরিত নানান বাধার সম্মুখীন হয়। নারী আসলেই কাজ পারবে কী না এমন প্রশ্নসূচক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের মধ্যে দেখা যায়। প্রযুক্তিগত কাজের ক্ষেত্রে এখনো পুরুষের আধিপত্যই আছে। নারীর উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বে থাকা অনেক পুরুষই মেনে নিতে পারে না। মতামত নেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। দৈনন্দিন জীবনযাপনে অনেক রকমের বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয় যাকে বৈষম্যকারীরা সহজাত বলে মনে করে।

তারা আরও বলেন, সমতা ও সাম্য এর ধারণা স্পষ্ট করতে হবে। পরিবারে, সমাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে এবং কর্মক্ষেত্রে ট্রান্সজেন্ডারদের জেন্ডার আইডেন্টিটি নিয়ে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অন্যদিকে, দলিত জনগোষ্ঠী প্রায় ২০০ বছর ধরে বৈষম্যের শিকার, যা ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী চাপিয়ে দিয়েছে। এর ফলে, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য এখনও আন্দোলন করতে হয়। নারীর ক্ষমতায়ন, সম্মান, সমানাধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে ৫০ বছর আগে যে বৈষম্যমূলক মনোভাব ছিলো তার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি বলে উল্লেখ করেন তারা।

অবস্থার উত্তরণের জন্য সকল শ্রেণির নারী-পুরুষসহ প্রত্যেকের জন্য সমান সুযোগ তৈরি, সবার নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য নারীদের আত্মনির্ভরশীলতার উপর জোর দেন বক্তারা।
দলিতদের সঠিক পরিসংখ্যান তৈরি, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি নারী আন্দোলনের সঙ্গে তরুণদের যুক্ত করতে হবে। অন্যায় ও অসমতার প্রশ্নে প্রতিবাদ করতে হবে, বৈষম্যকারীদের ভুল ধরিয়ে দিতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে।

সভার শুরুতে সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম বলেন, জন্মসূত্রে সকল মানুষ স্বাধীন এবং সমমর্যাদা লাভের অধিকারী-সর্বজনীন মানবাধিকারের এই দর্শনকে ধারণ করে ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে সংগ্রামী তরুণীদের উদ্যোগে গঠিত হয় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। প্রতিষ্ঠাকালীন নারীমুক্তি, নারী সমাজকে অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রতিরোধ, যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের জন্য আন্দোলন করেছে। সাংগঠনিক কাজে সব সময় তরুণদের অর্ন্তভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয় সংগঠন। প্রতিষ্ঠার সময় থেকে জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে তরুণী ছাত্রী নেত্রীরা যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আজকের তরুণীরাও তেমনি দৃঢ় সাহস আর মনোবল নিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করাসহ নারী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, কাজের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে বৈষম্যের বিষয়ে একেক গোষ্ঠীর নারীদের একেক রকম চিন্তাধারা এখনও আছে। এর পরিবর্তন ঘটাতে হবে। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র শ্বাশত ধ্রুব সত্য নয়, প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। নারীর অগ্রগতি নানা ধরণের হচ্ছে। এক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কর্মসূচি গ্রহণ করে। নারীদের মধ্যে নতুন আত্ম জাগরণের সৃষ্টি জাতীয় ও বৈশ্বিক নারী আন্দোলনের একটি অর্জন। আজ নারী তার দক্ষতার পরিচয় দিয়ে সকল ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করে রাষ্ট্র ও সমাজকে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বৈষম্য দূর করে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়তে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা দিতে হবে এবং তরুণদের সকল সংগ্রামে যুক্ত হয়ে নিজ নিজ পরিকল্পনার সমন্বয় করে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হবে।

আলোচনা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন সঙ্গীত শিল্পী সৃষ্টি সেজুঁতি হালদার। সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করেন আফিয়া আখতার, লাবিবা ইবনাত সুপ্রভা ও সারাফ ওয়ামিয়া সুপ্রীতি। কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তি শিল্পী শুক্লা দাস গুপ্ত ও অন্বেষণা বণিক শ্রুতি এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, সম্পত্তিতে সমঅধিকার, যৌন হয়রানি প্রতিরোধের উপর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের টিভিসি প্রদর্শন করা হয়।

অনলাইন আলোচনা সভায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, জাতীয় পরিষদ সদস্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক ও সংগঠনের কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান।

সারাবাংলা/আরএফ/একেএম





Source link