ইভিএমেও ফল প্রকাশে দেরি হওয়ায় প্রশ্ন

0
254

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমে ভোটগ্রহণের যান্ত্রিক পদ্ধতি। দ্রুত এবং সহজে ভোট গ্রহণ করা যায়। একই সাথে দ্রুত ফলাফল প্রকাশের কথা জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সদ্যসমাপ্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রায় ১১ ঘণ্টা পর ফল ঘোষণা করা হয়। আর কাউন্সিলরদের ফল পেতে অপেক্ষা করতে হয় পুরো একদিন। আধুনিক যন্ত্রে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফল প্রকাশের আশার কথা শোনালেও বাস্তবে তা হয়নি। ফলে জনমনে ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং নানা কথা উঠছে নির্বাচনের ফল নিয়েও।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ইভিএমে ফল প্রকাশে তো এত সময় লাগার কথা না। তারা (নির্বাচন কমিশন বা ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা) কী করার চেষ্টা করছিলেন, বুঝতে পারছি না! তারা কি যোগ করতে পারছিলেন না? তিনি বলেন, আইনে বলা আছে, কেন্দ্রে ফল ঘোষণার পর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনী মালামাল নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেবেন। ভোট হয়েছে ঢাকার মধ্যে। কেন্দ্র থেকে সরাসরি নিয়ে এলেও তো এত সময় লাগার কথা না। জনমনে প্রশ্ন তো তারাই তৈরি করেছেন। তারা এমন করেন বলেই জনমনে শঙ্কা-সন্দেহ তৈরি হয়; মানুষ ভোট দিতে যেতে চান না।

সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোটের আগে তারা (ইসি কর্তৃপক্ষ) বলেছেন, আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টার মধ্যে ফল প্রকাশ করা হবে। এখন কেন পারলেন না, তা ইসিরই উচিত পরিষ্কার করা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ব্যালটে অনুষ্ঠিত অনেক আসনের ফল ঘোষণার পর ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছিল।

গত ৩০ জানুয়ারি সিটি নির্বাচনের ‘ইভিএমে মক ভোটদান প্রদর্শনী অনুষ্ঠান’ পরিদর্শন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বলেছিলেন, প্রথমবার (একাদশ জাতীয় নির্বাচনে) ইভিএমে অনেক ত্রুটি ছিল। এবার আমরা আগের ভুলগুলো সংশোধন করে দক্ষতার সঙ্গে প্রস্তুতি নিয়েছি। এবার ঢাকা সিটির ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের তরফে বলা হয়েছিল, ইভিএমে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হবে। অথচ দক্ষিণ সিটির ফল প্রকাশে লেগেছে ১০ ঘণ্টা, উত্তরে আরও এক ঘণ্টা বেশি।

ফল ঘোষণায় দেরির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটির রিটার্নিং অফিসার আবুল কাসেম বলেন, ইভিএমের ফল ভোটের আধা ঘণ্টার মধ্যেই হয়ে গেছে। কিন্তু পথে আসতে দেরি হয়েছে। পরবর্তীতে দেরি হয়েছে আমাদের কিছু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। ফল প্রকাশে বিলম্বের জন্য তিনি বলেন, আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

আবুল কাসেম আরও বলেন, সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে কেন্দ্রে ইভিএমের ফল হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এলাকা অনেক বড়Ñ সেই সাঁতারকুল, বেরাইদ পর্যন্ত। ওখানে আমাদের নেট ছিল ধীর গতির। এ কারণে দেরি হয়েছে। ট্যাবের মাধ্যমে আমরা যে ফল নিয়েছি, ওখানকার নেটওয়ার্কে বা আমাদের কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটির কারণে ফল দিতে বিলম্ব হয়েছে।

দক্ষিণের রিটার্নিং অফিসার আবদুল বাতেন বলেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে ফল প্রকাশে দেরি হয়। প্রিসাইডিং অফিসাররা ট্যাবে রেজাল্ট পাঠাতে ভুল করেছেন, অনেকে ম্যানুয়ালি পাঠিয়েছেন। যারা ভুল করেছেন, তাদের আলাদা আলাদাভাবে কল করে আমরা ম্যানুয়ালি রেজাল্ট নিয়েছি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাধারণ ওয়ার্ড ৩১ নম্বরের নির্বাচনী ফল ঘোষণায় কেন্দ্রের ভোটের ফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আলমগীর। ১ ফেব্রুয়ারি রাতে দক্ষিণ সিটির ফল ঘোষণায় টিফিন ক্যারিয়ার প্রতীকের প্রার্থী জুবায়ের আদেলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এ ফলের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আলমগীর রিটার্নিং অফিসারের কাছে তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরুষ ভোটকেন্দ্রে ঘুড়ি প্রতীকের প্রার্থী ইরোজ আহমেদ পেয়েছেন ২০২ ভোট আর মোহাম্মদ আলমগীর পেয়েছেন ৪৩৯ ভোট। কিন্তু ফল ঘোষণায় দেখা যায়, ঘুড়ি প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন ৪৩৯ ভোট আর মোহাম্মদ আলমগীর পেয়েছেন ২০২ ভোট। তাই তাকে ১৭ ভোটে পরাজিত দেখানো হয়েছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ভোটগ্রহণের পরদিন, গত রবিবার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ‘নির্বাচনী ফল ঘোষণা’ স্থগিতের ঘোষণা দেন রিটার্নিং অফিসার। স্থগিতের গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা ২০১০-এর বিধি ৪২(১) অনুসারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাধারণ ওয়ার্ড ৩১ নম্বরের নির্বাচনী ফল ঘোষণা অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হলো।’

ইসি কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনী ফল একীভূত করে প্রকাশ করার জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছিল। ট্যাবে ফল পাঠানো এবং সেই সফটওয়্যারে সমস্যার কারণে ফল প্রকাশে বিলম্ব হয়।

ভোটগ্রহণের আগে ইসির ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামাল উদ্দিন বলেছিলেন, ভোট শেষে প্রিসাইডিং অফিসাররা ট্যাবের মাধ্যমে অনলাইনে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফল পাঠিয়ে দেবেন। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে তা ঘোষণা করা হবে। এ জন্য প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং, পোলিং অফিসারদের ‘যথেষ্ট প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হয়েছে।

গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটিতে ২৪০০ এর বেশি কেন্দ্রের সব কটিতে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হয়। ভোটগ্রহণ বিকাল ৪টায় শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা পরই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আসা ফল ঘোষণা শুরু করেছিলেন দুই রিটার্নিং অফিসার। ঢাকা দক্ষিণের ১১৫০টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৭৫টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণার পর রাত পৌনে ১১টায় ফল ঘোষণা আটকে যায়। এর পর রাত সাড়ে ১২টায় সব কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার।

এর তিন ঘণ্টারও বেশি সময় পরে উত্তর সিটির ১৩১৮টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণা হয়। অর্থাৎ প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ভোটের ফল আসে। এর আগে, ব্যালটের ক্ষেত্রেও একই সময় লেগেছিল। এবারের নির্বাচনে উত্তর সিটিতে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ২৯ দশমিক ০২ শতাংশ ভোট পড়েছিল।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে