ইট-পাথরের আগ্রাসনে অশোক-বকুল, কতদিন বাঁচবে প্রাকৃতিক হাসপাতাল?

106


রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: প্রাণ-প্রকৃতির শহর চট্টগ্রাম। ফুল, লতাপাতা, বৃক্ষরাজির সমাহার শহরের বুকে মাথা ‍উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোতে। নগর বলতেই যাদের মনে ভেসে আসে ইট-পাথরের বড় বড় দালান আর যন্ত্রচালিত যানের ধোঁয়া-শব্দ, তারা দু’দণ্ড শান্তি আর বৈচিত্র্য খুঁজে পান প্রকৃতির অপার দানের এই শহরে।

ইট-পাথরের আগ্রাসনে নগরীতে প্রকৃতির সেই নান্দনিকতা প্রায় হারাতে বসেছে। পিচঢালা সড়কের পাশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে লতা-গুল্ম, শীতের সকালে সেখানে কুয়াশাবিন্দু আশ্রয় নেওয়ার চিত্র এখন আর চোখে পড়ে না। অব্যাহতভাবে কাটা হচ্ছে পাহাড়। বাণিজ্যের থাবায় ক্ষয়িঞ্চু হতে হতে প্রকৃতি থেকে বিদায় নিচ্ছে ঔষধি গাছ। বকুল-শিমুলের ডালে বসে পাখির কূজনও হয়তো অচিরেই ঠাঁই পাবে বইয়ের পাতায়। ক্রমশ চট্টগ্রাম শহরও পরিণত হচ্ছে ইট-পাথরের এক মস্তবড় খাঁচায়, মানুষ যেন এখানে ‘নগরবন্দী’।

সেই প্রেক্ষাপটেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে একটি দল নগরীর বিভিন্ন পাহাড় ও এলাকায় ঘুরে তুলে এনেছেন নগরীর উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজির তথ্য। চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে পরিচালিত প্রথম এই গবেষণায় উঠে এসেছে, নগরজুড়ে রয়েছে প্রায় ৪৯৫ প্রজাতির উদ্ভিদের বসতি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আছে ঔষধি উদ্ভিদ। আর সে কারণেই চট্টগ্রাম শহরকে গবেষকরা বলছেন ‘প্রাকৃতিক হাসপাতাল’, যদিও সেই ভাণ্ডার আর কত দিন টিকে থাকবে— তা নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন!

গবেষকদের লক্ষ্য, ক্ষয়িঞ্চু অবস্থায়ও এই নগরে বিপুল উদ্ভিদের সমাহারের তথ্য সবার সামনে উন্মুক্ত করে সেগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো। অর্থাৎ চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার তাগিদ দেওয়া। ঠিক যে মুহূর্তে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত সিআরবি রক্ষায়, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বানিয়ে টাইগারপাস ঢেকে ফেলার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন চট্টগ্রামের নাগরিকরা, সেই সময়েই প্রকাশ হচ্ছে এই প্রাসঙ্গিক গবেষণামূলক তথ্য।

ইট-পাথরের আগ্রাসনে অশোক-বকুল, কতদিন বাঁচবে প্রাকৃতিক হাসপাতাল?

প্রাণ-প্রকৃতি গবেষক মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘গবেষণা করতে গিয়ে গত প্রায় ছয় মাস ধরে আমরা চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন পাহাড়ে ঘুরেছি। অনেক পাহাড় কাটার চিত্র দেখেছি। টিলা কেটে সমান করে ফেলা হচ্ছে। পাহাড়-টিলা কাটা মানে তো কেবল মাটি কেটে ফেলে দেওয়া নয়, এর সঙ্গে লতা-গুল্ম, উদ্ভিদ, গাছপালাও কাটা হয়। প্রকৃতির বৈচিত্র্য নষ্ট করে ফেলা হয়। আমরা গবেষণার মাধ্যমে বেশকিছু উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করেছি যেগুলো পাহাড় ধ্বংসের কারণে বিপণ্নপ্রায় হয়ে পড়েছে। হয়তো কয়েক বছর পর সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব আমরা আর চট্টগ্রাম শহরে পাব না।’

‘আবার গত এক দশকে চট্টগ্রাম শহরে আরেক ধরনের কর্মকাণ্ড আমরা দেখছি। প্রাকৃতিকভাবে যেসব গাছপালা আমাদের আছে, যেগুলো আমাদের দেশীয় উদ্ভিদ— সেগুলো কেটে ফেলে বিদেশি বিভিন্ন গাছ, ফলের গাছ লাগানো হচ্ছে। আমাদের মাটির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ উদ্ভিদ বৈচিত্র্য এভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ যেসব গাছ কাটা হচ্ছে সেখানে মানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী ঔষধি উদ্ভিদও আছে। গাছপালা কেটে বহুতল ভবন বানিয়ে ছাদে কৃত্রিম বাগান করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চট্টগ্রাম শহর উদ্ভিদশূন্য হয়ে পড়বে। আমরা গবেষণার মধ্য দিয়ে এই বার্তাটা সবার কাছে দিতে চাই,’— বলেন ওমর ফারুক রাসেল।

বেসরকারি সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপেইনিয়নের (ইকো) উদ্যোগে এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। গবেষণা দলে আরও ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী খন্দকার রাজিউর রহমান, ইমাম হোসেন, সজীব রুদ্র, আরিফ হোসাইন, সনাতন চন্দ্র বর্মন, মো. মোস্তাকিম এবং ইকরামুল হাসান।

 

চট্টগ্রাম নগরীর ২০টি স্পটে জরিপের মাধ্যমে উদ্ভিদ শনাক্ত করে গবেষণার মাধ্যমে আটটি শ্রেণিতে এদের ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বড় বৃক্ষ, গুল্ম জাতীয়, বীরুৎ জাতীয়, লতা জাতীয় ও ঔষধি উদ্ভিদ। এছাড়া বিপণ্ন প্রজাতি, ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হবে এমন এবং এখনো শনাক্ত করা যায়নি এমন প্রজাতিও আছে।

ইট-পাথরের আগ্রাসনে অশোক-বকুল, কতদিন বাঁচবে প্রাকৃতিক হাসপাতাল?

গবেষণায় শনাক্ত মোট ৪৯৫ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে ১৭৭ প্রজাতির বড় বৃক্ষ, ৮৬ প্রজাতির গুল্ম জাতীয়, ১৭৯ প্রজাতির বীরুৎ জাতীয় ও ৫৩ প্রজাতির লতা জাতীয় উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। আবার এর মধ্যে ৩৬৬ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া গেছে যেগুলো ঔষধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বিপণ্নপ্রায় ১৩টি এবং ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হতে পারে এমন প্রজাতি পাওয়া গেছে ১৩৭টিরও বেশি। ৩০টির বেশি প্রজাতি পাওয়া গেছে যেগুলো শনাক্ত করতে পারেনি গবেষক দল। বিস্তারিত গবেষণায় সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এতে আরও বলা হয়েছে, শনাক্ত মোট ৪৯৫ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে ৩৫৪টি দেশীয় প্রজাতির। বাকি ১৪১টি বিদেশি প্রজাতির।

উদ্ভিদের সমাহার বাটালিসিআরবিতে, ঐতিহ্য হারাচ্ছে প্রবর্তক

গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০টি স্পটের মধ্যে নগরীর খুলশী থানার ওয়্যারলেস মুরগির ফার্ম এলাকার আশপাশে সবচেয়ে বেশি উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। সেখানে ২৩৫ ধরনের উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে। ঔষধি উদ্ভিদ পাওয়া গেছে ১৯৩ প্রজাতির। পাঁচ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে যেগুলো দেশে বিপণ্নন্নপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত। ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে— এমন উদ্ভিদ আছে ৬৬ ধরনের।

এরপর নগরীর বাটালি পাহাড়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২২৪টি প্রজাতি ও সিআরবি এলাকায় তৃতীয় সর্বোচ্চ ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। বাটালি পাহাড়ের ২২৪টি প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে ঔষধি উদ্ভিদই ১৮৪ প্রজাতির। পাঁচ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে যেগুলো দেশে বিপণ্নপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে— এমন ৬৫ প্রজাতির ‍উদ্ভিদ আছে বাটালি পাহাড়ে।

গত জুনে পরিচালিত এক জরিপে সিআরবি এলাকায় ১৯৭ ধরনের উদ্ভিদ শনাক্ত করেছিলেন গবেষক ওমর ফারুক রাসেল। গত দুই মাসে আরও বিস্তারিত জরিপে পাওয়া গেছে মোট ২২৩ ধরনের উদ্ভিদ। এর মধ্যে ঔষধি আছে ১৮৩ ধরনের, বিপণ্নপ্রায় আছে ৯ ধরনের এবং বিলুপ্ত হওয়ার পথে আছে ৬৬ ধরনের গাছগাছালি।

ইট-পাথরের আগ্রাসনে অশোক-বকুল, কতদিন বাঁচবে প্রাকৃতিক হাসপাতাল?

 

গবেষক ওমর ফারুক রাসেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিআরবিতে যদি হাসপাতাল নির্মাণ হয়, তাহলে সব উদ্ভিদই ধ্বংস হয়ে যাবে। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ধ্বংস করা না হলেও টিকে থাকতে না পেরে সেগুলো আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যেমন— সিআরবিতে লজ্জাবতী, টোনা, নিসিন্দাপাতার মতো ঔষধি গাছ আছে। এর মধ্যে অনেকগুলো বিপণ্ন ও বিলুপ্তপ্রায়। এসব গাছ তো আর থাকবে না। বাটালি হিল, মুরগির ফার্ম এলাকায়ও এ ধরনের গাছ পেয়েছি। বাটালি হিল কেটে বসতি নির্মাণের খবর আমরা পত্রপত্রিকায় দেখি। মুরগির ফার্ম এলাকায়ও অবকাঠামো নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। এ অবস্থায় সেখানে কয়েক দশক পর আদৌ কোনো উদ্ভিদ থাকবে কি না— তা নিয়েই সংশয় রয়েছে।’

সবুজ গাছ, লতাপাতায় ঘেরা নগরীর প্রবর্তক পাহাড় একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যপিপাসী মানুষের দৃষ্টি কাড়ত। সেখানে বিভিন্ন বহুতল ভবন, মন্দির, ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণ হয়েছে। বিভিন্ন সময় পাহাড় কাটার সংবাদও এসেছে গণমাধ্যমে। গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রবর্তক পাহাড়ের হতশ্রী অবস্থা। সেই পাহাড়ে উদ্ভিদ পাওয়া গেছে মাত্র ১১৬ ধরনের। এর মধ্যে ৯৮টি ঔষধি, তিনটি বিপণ্নপ্রায় এবং ৩৭টি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির উদ্ভিদের দেখা মিলেছে।

একসময়ের সবুজ চট্টগ্রাম শহরে এখন সড়কের পাশে মাত্র ৫৩ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪৭ প্রজাতি ঔষধি, বিপণ্নপ্রায় একটি এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি রয়েছে ১৯টি।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকায় ২০১ প্রজাতি, নগরীর ডিসি হিলে ১৩২ প্রজাতি, ওয়ার সিমিট্রিতে ৯১ প্রজাতি, টাইগারপাসে ২১০ প্রজাতি, রেলওয়ে সেগুন বাগান এলাকায় ৪৯ প্রজাতি, কানন ধারা আবাসিক এলাকায় ১৩৫ প্রজাতি, গোলপাহাড় এলাকায় ১২৭ প্রজাতি, ডাকবাংলো পাহাড়ে ১০৬ প্রজাতি, ডানকান পাহাড়ে ১৮১ প্রজাতি, গোলাপ মিয়া পাহাড়ে ১৫৯ প্রজাতি, বায়োজিদ-ভাটিয়ারি লিংক রোডে ২১৬ প্রজাতি, জয় পাহাড়ে ২০৭ প্রজাতি, মতিঝর্ণা এলাকায় ১৯৯ প্রজাতি, মেরিন ড্রাইভে ৪৫ প্রজাতি এবং ওমরগণি এমইএস কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ে ১৩০ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করা হয়েছে।

গবেষক ওমর ফারুক রাসেল বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য এবং প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে আমাদের গবেষণা এখানেই শেষ নয়। আমরা আরও বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা করে জানার চেষ্টা করব শহরে আরও কত প্রজাতির উদ্ভিদ আছে, এর মধ্যে বিপণ্ন ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের সংখ্যা কত। এরপর আমরা বিস্তারিত গবেষণা স্বীকৃতি জার্নালে প্রকাশের জন্য পাঠাব।’

ইকো’র সভাপতি সরওয়ার আলম চৌধুরী মণি সারাবাংলাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের অনেক পাহাড়, জঙ্গল, গাছপালা হারিয়ে গেছে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেগুলো গবেষণাধর্মী কাজের মাধ্যমে সবার সামনে আনার চেষ্টা করে যাবে ইকো। চট্টগ্রামের প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার তাগিদ থেকে ইকো এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।’

প্রাকৃতিক হাসপাতাল’ চট্টগ্রাম শহর

গবেষণায় চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন পাহাড়-জঙ্গলে ছড়িয়ে থাকা ৩৬৬ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে যেগুলোর ঔষধি গুণ আছে। গবেষক ওমর ফারুক রাসেল জানিয়েছেন, এমন উদ্ভিদ নগরীতে আছে যেগুলো ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগেও ব্যবহার হয়। জন্ডিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগে প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে— এমন উদ্ভিদও আছে। সাপের বিষ নিষ্ক্রিয়করণ, মানসিক রোগের চিকিৎসায় কাজ করে— এমন উদ্ভিদও আছে এই শহরে।

সিআরবি এলাকায় যেসব ঔষধি গাছ পাওয়া গেছে, তার মধ্যে টোনা (Oroxylum indicum), অর্জুন (Terminamia arjuna), লজ্জাবতী (Mimosa pudica), আপাং (Achyranthus aspera), নিসিন্দা (Vitex nikundu), টগর (Tabernaemontana divericata), সজনে (Moringa oliefera), দেবকাঞ্চন (Bauhinia purpuria), মাটমিন্দা (Tacca intigrifolia), সর্পগন্ধা (Rauvolfia tetraphylla), বকুল (Mimusops elengi), শিমুল (Bombax ceiba), পিতরাজ (Aphanamixis polystachya), দুধকুরুস (Wrightia arborea), বাকা গুলঞ্ছ (Tinospora erispa), সোনাতলা (Diploclasia glaucescens), দুরন্ত (Duranta erecta) উল্লেখযোগ্য।

ইট-পাথরের আগ্রাসনে অশোক-বকুল, কতদিন বাঁচবে প্রাকৃতিক হাসপাতাল?

 

গবেষণা প্রতিবেদনে এসব উদ্ভিদের গুণাগুণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, টোনা ক্যানসার রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জন্ডিস, শরীর ব্যথা, পেট ব্যথা, ডায়ারিয়া, আমাশয়, বাত, শ্বেতী রোগের চিকিৎসাতেও এই উদ্ভিদ ব্যবহার হয়। অন্যদিকে ডায়ারিয়া, আমাশয়, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, দাঁত ব্যথা, শরীর ব্যথা, হাঁপানি ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় অর্জুন গাছ।

এদিকে, লজ্জাবতীর মূল, কাণ্ড, পাতা, ফুল— সবকিছুরই ভেষজ গুণাগুণ রয়েছে। ফোলা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, অর্শ, কফ-কাশি, ফোড়া, জন্ডিস ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় লজ্জাবতী ব্যবহৃত হয়। নিসিন্দাপাতা নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে দাদ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। লজ্জাবতী, নিসিন্দা, সর্পগন্ধা সাপের বিষ নিষ্ক্রিয়করণে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া জ্বর, ম্যালেরিয়া, লিভারের রোগ, লিউকেরিয়া, চুলকানি, ফোঁড়া— এসব রোগেও প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হয়।

লজ্জাবতী, নিসিন্দা, স্বর্পগন্ধা— সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে এই তিন প্রজাতির উদ্ভিদেরই ব্যবহার রয়েছে। আপাংয়ের শেকড় ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। লিউকোরিয়া, টিউমার, দাঁত ব্যথা, কিডনিতে পাথর, ঠান্ডা, জ্বর, নিউমোনিয়া, পেটব্যথার চিকিৎসাতেও আপাংয়ের ব্যবহার রয়েছে।

টগর জন্ডিস, ফোঁড়া, জ্বর, বদহজম, প্লীহা, লিভারের রোগ, বাত ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। টনিক হিসেবেও এর ব্যবহার আছে। শেকড়, কাণ্ড, পাতা, ফুল ও ফল দারুণ পুষ্টিসমৃদ্ধ হওয়ায় আবার সজনেকে বলা হয় ‘ম্যাজিক গাছ’। এর রয়েছে নানাবিধ ভেষজ গুণাগুণ। প্লীহা ও লিভারের রোগ, জ্বর, ফোলা, পক্ষাঘাত, পেটের রোগ, মৃগী রোগের চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা হয়।

দেবকাঞ্চন রক্তক্ষরণ বন্ধ, বাত, খিঁচুনি, ডায়ারিয়া, ব্যথা, আলসার ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও দেবকাঞ্চনের ব্যবহার আছে। মাটমিন্দাপাতা হিস্টেরিয়া, অস্বাভাবিক আচরণ, কুষ্ঠ, রক্তক্ষরণ বন্ধ, চর্মরোগে ব্যবহার হয়।

এমন নানা ধরনের আরও ঔষধি গাছ ছড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন পাহাড়ে, এমনকি রাস্তার ধারেও। প্রতিবেদনে রোগের নাম উল্লেখ করে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হয় এমন উদ্ভিদের নাম যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে— চর্মরোগের জন্য চালমুগড়া (Hydnocarpus kurzii), মিঠা আলু (Ipomoea batatas), পাতি লতা ফার্ন (Lygodium microphyllum), ঝুমকো লতা (Passiflora foetida), জংলী বাদাম (Sterculia foetida), কাঠ বাদাম (Terminalia catappa), নিশিন্দা (Vitex negundo) ব্যবহার হয়। আলসারের জন্য বন আলু (Dioscorea bulbifera), গেজিয়া শাক (Elephantopus scaber), পাকুড় (Ficus benjamina), আমলকি (Phyllanthus emblica), গোল মরিচ (Piper nigrum) প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।

ডায়াবেটিস রোগের জন্য মদন মোস্তা (Actinodaphne angustifolia), বিদ্যা পাতা (Adiantum caudatum), দেশি ছোট এলাচ (Alpinia calcarata), নটি শাক (Amaranthus viridis), বন শিমুল (Bombax insigne), ছোট আকন্দ (Calotropis procera),বরুনা (Vitex peduncularis) ব্যবহৃত হয়। জন্ডিসের জন্য বন শিমুল (Bombax insigne), কুকুরচিতা (Litsea glutinosa), গোল মরিচ (Piper nigrum), ললনা (Premna esculenta), হরিনা (Vitex peduncularis) ব্যবহার হয়। যক্ষ্মার জন্য মুক্তাঝুড়ি (Acalypha indica), ডাবেরক্রেপি (Crassocephalum crepidioides), ডাঘ্নো মদি (Desmodium dichotomum), কালো তুলসি (Ocimum tenuiflorum), গন্ধ বাডালী (Paederia foetida), ধারমারা (Stereospermum colais) প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া মানসিক বিভিন্ন উপসর্গের জন্য সাদা কাঞ্চন (Bauhinia acuminate), ভাটিয়া লতা (Cissus adnate), সোনাতল (Diploclisia glaucescens), চালমুগড়া (Hydnocarpus kurzii), কেড়োগেথিস (Lepidagathis incurve), লতা ঢেকি (Lygodium flexuosum), গন্ধলি (Ophiorrhiza mungos), ভেরেন্ডা (Ricinus communis) ভেষজ হিসেবে কাজ করে।

ইট-পাথরের আগ্রাসনে অশোক-বকুল, কতদিন বাঁচবে প্রাকৃতিক হাসপাতাল?

 

বাত রোগের জন্য ঝুনঝুনি (Crotalaria pallida), শিলাঝড়া (Elatostema papillosum), কুকুরচিতা (Litsea glutinosa), হরিনা (Vitex peduncularis), ছাতিম (Alstonia scholaris), বিষলতা (Hedyotis scandens), আমাশয় রোগের জন্য- বাংলা বট (Ficus benghalensis), ঝজ্ঞা ডুমুর (Ficus racemose), কুরচি (Holarrhena antidysenterica), কুকুরচিতা (Litsea glutinosa), অশোক (Saraca asoca), রঙ্গন (Ixora coccinea), হাঁপানি রোগের জন্য ন্যাটা সাইকাস (Cycas pectinate), ঝজ্ঞা ডুমুর (Ficus racemose), কুকুরচিতা (Litsea glutinosa), বন পান (Piper sylvaticum), শিয়াল মুত্র (Vernonia patula), উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে উলট কম্বল (Abroma augusta), ধতুরা (Datura metel), মেস্তা (Hibiscus sabdariffa), সজনে (Moringa oleifera), বহেড়া (Terminalia bellirica) ব্যবহার হয়।

ব্রংকাইটিস রোগের জন্য অগ্নি গাছ (Cymbopogon citratus), কেশরাজ (Eclipta prostrata), ঝজ্ঞা ডুমুর (Ficus racemose), কলমি শাক (Ipomoea aquatic), বন পান (Piper sylvaticum), দাদমর্দন (Senna alata) এবং পাইলস রোগের জন্য দুর্বা ঘাস (Cynodon dactylon), শালপানি (Desmodium gangeticum), চুপড়ি আলু (Dioscorea alata), গামারি (Gmelina arborea), লাল ভেরেন্ডা (Jatropha gossypifolia) প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হয়।

ওমর ফারুক রাসেল বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে এত ঔষধি উদ্ভিদ পেয়ে আমরাও বিস্মিত। আমরা এসব উদ্ভিদকে সামনে এনেছি মানুষকে এটা জানানোর জন্য যে এই শহরই একটি প্রাকৃতিক হাসপাতাল। তবে আশঙ্কার কথা— অধিকাংশ ঔষধি উদ্ভিদই ভবিষ্যতে বিলুপ্তির আশঙ্কা আছে।’

বিপণ্নবিলুপ্তির পথে বকুলশিমুলঅশোক

গবেষণা প্রতিবেদনে বিপণ্নপ্রায় ১৩ প্রজাতির উদ্ভিদের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— হলদে বেত (Dypsis lutescens), নাটা সাইকাস (Cycas pactinata), শীতশাল (Dalbergia latifolia), গর্জন (Dipterocurpus alatus), লম্বু (Khaya anthotheca), শ্বেতচন্দন (Santalum album), অশোক (Saraca asoca), ঢাকিজাম (Syzygium firmum), দুধকুরুস (Wrightia arborea), বাকা গুলঞ্চ (Tinospora erispa), সোনাতলা (Diploclasia glaucescens), গুলঞ্চ (Tinospora cordifolia) এবং নিমাহুক (Aglaonema hookerianum)।

এছাড়া ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হতে পারে এমন উদ্ভিদের মধ্যে আছে— মেঞ্জিয়াম (Acacia mangium), হারগোজা (Acanthus ilicifolius ), টাইগার ফার্ন (Acrosticum aureum), কঞ্চি এলাচ (Alpinia conchigera), ছাতিম (Alstonia scholaris), বেত (Calamus tenuis), বড় ডুমুর (Ficus auriculata), যজ্ঞ ডুমুর (Ficus racemosa ), কুরুজ (Holarrhena pubescens), কুকুরা (Leea indica), পিটালি (Mallotus nudiflorus), হরিতকি (Terminalia chebula), স্বর্পগন্ধা (Rauvolfia tetraphylla), বকুল (Mimusops elengi), শিমুল( Bombax ceiba), পিতরাজ (Aphanamixis polystachya) এবং দুরন্ত (Duranta erecta)।

সংগঠনটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এস এম আবু ইউসুফ সোহেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা শেষ হলে ইকোর পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক আরও তথ্য আবারও উপস্থাপন করা হবে। এই গবেষণার মধ্য দিয়ে আমরা শুধু নগরবাসীকে আহ্বান জানাতে চাই, আপনারা চট্টগ্রাম শহরের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার হোন। এত সুন্দর শহর আমরা ধ্বংস হতে দিতে পারি না।’

ছবি: শ্যামল নন্দী

সারাবাংলা/আরডি/টিআর





Source link