আর্থিক অনিয়ম, ভর্তি বাণিজ্যে ক্ষত-বিক্ষত ভিকারুননিসা নূন

90


তুহিন সাইফুল ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: একসময়ের দেশসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ফের আলোচনায়। তবে একটা সময় পর্যন্ত ভালো ফলাফলের জন্য বরাবর আলোচনায় উঠে আসা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নতুন করে আলোচনায় উঠে আসার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গত কয়েক বছর ধরেই ভিকারুননিসা অধ্যক্ষের পদটিতে স্থায়ী হতে পারছেন না কেউ। বেশ কয়েকজনকে পদ ছাড়তে হয়েছে বিতর্কের মুখে। শিক্ষক নিয়োগে কারসাজি, ভর্তি বাণিজ্য, শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনাসহ নানা অভিযোগে ভিকারুননিসা সমালোচিত। সম্প্রতি কলেজের অধ্যক্ষ ও অভিভাবক ফোরামের মধ্যেকার সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে ফের আলোচনায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর গভর্নিং বডির কার্যক্রম নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

এই স্কুল অ্যান্ড কলেজটির ‘বিতর্কিত’ অধ্যক্ষদের তালিকায় সবশেষ যুক্ত হয়েছে বর্তমান অধ্যক্ষ কামরুন নাহারের নাম। তার সঙ্গে পরপর দু’টি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর তাকে নিয়ে সারাদেশেই চলছে বিস্তর আলোচনা। দুইটি ফোনালাপের একটিতে শ্রবণ অযোগ্য গালাগাল করতে শোনা গেছে এই অধ্যক্ষকে। অন্য ফোনালাপের মধ্য দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি বাণিজ্য ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কদর্য পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

এই দু’টি ফোনালাপের সূত্র ধরেই ভিকারুননিসায় চলমান অচলাবস্তার কারণ অনুসন্ধান করেছে সারাবাংলা। অনুসন্ধানে শিক্ষার্থী ভর্তিতে আর্থিক লেনদেন ও উন্নয়ন কাজের আর্থিক সুবিধা নিয়ে দু’টি পক্ষের মধ্যে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। এর একটি পক্ষ অধ্যক্ষ কামরুন নাহার, আরেক পক্ষে আছেন অভিভাবক ফোরাম ও পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভর্তি বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মে বাধা দেওয়ার কারণেই বারবার কপাল পুড়েছে ভিকারুননিসা অধ্যক্ষদের। ‘অসৎ উপায়ে’ শিক্ষার্থী ভর্তির ‘মনোপলি’ নিজেদের হাতে ধরে রাখতে না পারলেই অধ্যক্ষদের ‘বিতর্কিত’ করার মাধ্যমে সরিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছেন তারা। ঠুনকো কারণে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের দাবি তুলে অধ্যক্ষদের স্বাভাবিকভাবে কাজও করতে দেন না তারা।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের সপক্ষে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সারাবাংলার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়া দু’টি ফোনালাপের পূর্ণাঙ্গ অংশও রয়েছে সারাবাংলার হাতে।

গত দুই দিনে ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির বেশ কয়েকজন সাবেক সদস্য সারাবাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, ভিকারুননিসার অভিভাবক ফোরাম ও বর্তমান গভর্নিং কমিটির কয়েকজন সদস্য ভর্তি বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। যে অধ্যক্ষই তাদের এই কাজে বাধা দিয়েছেন, তিনিই বিতর্কিত হয়েছেন। পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ভিকারুননিসা সবার কাছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের কাছে হয়ে গেছে সম্ভাবনাময় একটি ব্যবসায়িক খাত। অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় গভর্নিং বডির সাবেক এই সদস্যরা কেউ নাম প্রকাশের ‘ঝুঁকি নিতে’ সম্মত হননি।

একই কথা বলছেন অধ্যক্ষ্য কামরুন নাহারও। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ভর্তি বাণিজ্যে বাধা দেওয়ার কারণেই আমাকে নিয়ে নানা অপপ্রচার শুরু হয়। সংবাদ সম্মেলন করে কয়েকদিন আগে আমার পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে। এরপর সুপার এডিট করে একটি মিথ্যা বানোয়াট ফোনালাপ প্রকাশ করেছে!’

অধ্যক্ষ বলেন, ‘আপনারা প্রশ্ন করুন— একজন অধ্যক্ষ্যও কেন এই প্রতিষ্ঠানে এসে শান্তিতে শিক্ষাদান করতে পারেন না? কার স্বার্থে? কলেজ পরিচালনার জন্য অভিভাবক ফোরাম নামের এমন ভূঁইফোড় সংগঠনের কোনো প্রয়োজন আছে? তাহলে তারা কিসের নেশায় বার বার কলেজের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে?’

অভিভাবক ফোরামের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে অধ্যক্ষ কামরুন নাহার বলেন, ‘শুধু ভর্তি বাণিজ্যই নয়, এসব অভিভাবক প্রতিনিধিরা কলেজ ফান্ডের টাকাও লুটপাট করতে চাচ্ছেন। কিছু দিন আগে তারা প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার ভুয়া বিল দিয়েছে। আমি এই টাকা না দেওয়ায় তারা আমার ঘরে তালা পর্যন্ত দিয়েছে। দরজায় লাথি দিয়েছে। আমি তাদের এইসব অন্যায় আবদারের কাছে মাথানত করিনি। এর প্রতিশোধ তারা আমার ওপর নেওয়ার চেষ্টা করছে।’

অধক্ষ্য অভিযোগ করে বলেন, এই কলেজটি হয়ে গেছে বিভিন্ন মানুষের আয়ের উৎস। পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমিক স্কুল শাখার অভিভাবক প্রতিনিধি সিদ্দিকী নাসির উদ্দিন তাদের একজন। উন্নয়ন কাজের জন্য কোটি টাকা নিয়েছেন, কিন্তু বিল-ভাউচার জমা দেবেন না। এই কলেজ কি মগের মুল্লুক? নাকি তারা সবাই আইনের ঊর্ধ্বে? তাদের এসব অপকর্ম দেখবেন, কিন্তু কিছু বলতে পারবেন না। কথা বললেই বিতর্ক!’

এসব অভিযোগ তদন্ত করতে অবশ্য এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। ভর্তি বাণিজ্য, উন্নয়ন কাজে আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের অশোভন আচরণের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও হয়েছে।

আরও পড়ুন:

এ বিষয়ে বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক আবু তালেব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণসহ বেশকিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এর মধ্যে ভর্তি বাণিজ্য, কলেজের উন্নয়নে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগগুলো আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনে মন্তব্য করব না।

মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক আবুল মনছুর ভূঞাকে আহ্বায়ক করে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (সনদ) হেলাল উদ্দিন ও উপ-কলেজ পরিদর্শক রবিউল আলমকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগস্টের ১ বা ২ তারিখের মধ্যেই এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতে পারে।

এছাড়াও ভিকারুননিসায় কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগটি সরেজমিনে তদন্ত করছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর (ইইডি)।
এদিকে, অধ্যক্ষের বিভিন্ন অভিযোগের বিপরীতে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে কলেজ মাঠে গরুর হাট বসানোর অভিযোগে অধ্যক্ষকেই অভিযুক্ত করেছে অভিভাবক ফোরাম। এ ঘটনায় ফোরামের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে অধ্যক্ষ কামরুন নাহারের অপসারণও দাবি করেছেন।

ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ সুজন বলেন, অধ্যক্ষকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের মাঠে ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি হাউজ অ্যান্ড ডেকোরেটর অবৈধভাবে গরু-ছাগলের হাট বসায়। পরে সেটি অভিভাবকদের নেতৃত্বে উচ্ছেদ আমরা উচ্ছেদ করি।

অধ্যক্ষ অবশ্য এ অভিযোগকে মিথ্যা বলে পশুর হাট বসানোর ঘটনায় অভিযুক্ত করছেন অভিভাবক ফোরামকেই। তিনি বলেন, আমি এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছি মাত্র এ বছর। ঈদুল আজহার আগে এখানে পশুর হাট বসে কি না, সেটি আমি জানিই না। অভিভাবক ফোরামই এখানে বাজার বসিয়েছে। আবার সেই বাজার বসানোর দায়ে আমাকে অভিযুক্ত করে সংবাদ সম্মেলন করেছে। আমি তাদের দুর্নীতি থামিয়ে দিয়েছি বলেই আমাকে থামিয়ে দিতে এসব নাটক করে বেড়াচ্ছে।

ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ এনে কামরুন নাহার বলেন, এবারের ভর্তি লটারির সময় স্কুলে ১২০টি আসন খালি রাখা হয়। সব মিলিয়ে আসন খালি ছিল প্রায় ১৫০টি। এগুলোতে অনৈতিকভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি নিতে কয়েকজন অভিভাবক সদস্য আমাকে চাপ দিয়েছেন। আমি রাজী হইনি।

তিনি বলেন, অভিভাবক ফোরাম তাদের ভর্তি বাণিজ্য চালু রাখতে চায়। আমি সহযোগিতা করলে কিন্তু কোনো সমস্যা নেই। তারা খুশি। তখন তারা বলবে আমি ভালো অধ্যক্ষ। কিন্তু আমি এই অন্যায় হতে দেবো না। আমার ক্যারিয়ারে কোনো অন্যায়ের দাগ নেই, এখনো লাগতে দেবো না।

অধ্যক্ষের কথার প্রমাণ মিলেছে তার সবশেষ ফাঁস হওয়া ফোনালাপটিতেও। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সদস্য মনিরুজ্জামান খোকন তাকে এসব আসনে ভর্তির জন্য কৌশলে চাপ প্রয়োগ করেন। ফোনালাপে খোকন বলেন, ‘…কোর্টের চিন্তা করলে ভিকারুননিসায় প্রিন্সিপালগিরি করতে পারবেন না।’ এসময় তিনি পুলিশ ও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে অধ্যক্ষকে ভর্তির জন্য কৌশলে চাপ তৈরি করেন।

মনিরুজ্জামান খোকন ওই ফোনালাপে অধ্যক্ষকে বলেন, ‘আমি কি একবারও বলেছি আমাকে দেন (শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ)? আমরা যাদের কাছে কৃতজ্ঞ, বিভিন্ন সময় যাদের কাছে আমাদের যেতে হয়, তাদের রিকোয়েস্ট রাখার সুযোগ আছে। এরা তো ভালো ফ্যামিলির বাচ্চা। এরা তো প্রতিষ্ঠানের মুখ উজ্জ্বল করবে। এটুকু দায়িত্ব যদি না নেন! আমরা তো আপনার পক্ষেই আছি। ইভেন মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে ফোন গেছে।’ এসময় খোকন বর্তমান মন্ত্রিসভার একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর প্রসঙ্গও অযাচিতভাবে টেনে আনেন।

এ বিষয়ে ফোনালাপে নাম উঠে আসা মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সারাবাংলা। তারা জানিয়েছে, মনিরুজ্জামান খোকনের এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তারাও আশা করছেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেহেতু ঘটনাটি তদন্ত করছে, সেই তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা ও অপরাধী বেরিয়ে আসবে।

অন্যদিকে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মনিরুজ্জামান খোকন সারাবাংলার সঙ্গে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আর অধ্যক্ষ্য কামরুন নাহার বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় আমি কোনো মতামত দেবো না।’

তবে এ বিষয়ে ভিকারুননিসা কলেজ শাখার পরিচালনা পর্ষদের আরেক সদস্য মনিরুজ্জামান মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘স্কুলে ফাঁকা আসন পূরণ করতে হবে— এটিই স্বাভাবিক। সেটি গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে আমরা বলেব, কিন্তু তাকে চাপ বলা যায় না। এখানে কেউ আর্থিক সুবিধাও নেন না।’

এদিকে, এই দু’টি ফাঁস হওয়া ফোনালাপ ও এতে আলোচিত ঘটনাবলির তদন্ত শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অতিরিক্তি সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) খালেদা আক্তারকে প্রধান করে এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটিও করা হয়েছে। কমিটির আরেক সদস্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ২৮ জুলাই থেকে তিন কর্মদিবস এই কমিটি তাদের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আগামী রোববার এ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ হতে পারে।

সারাবাংলা/টিএস/টিআর





Source link