‘আমাদের সামনে একটাই পথ— আন্দোলন, আন্দোলন এবং আন্দোলন’

80


স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে বাধ্য করতে আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ দেখছে না বিএনপি।

সোমবার (২২ নভেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত সমাবেশে দলটির শীর্ষ নেতারা বলেছেন, ‘আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকারকে বাধ্য করতে হবে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।’

‘আমাদের সামনে একটাই পথ— আন্দোলন, আন্দোলন এবং আন্দোলন’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু, কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন, খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, কেন্দ্রীয় নেতা নাজিম উদ্দীন আলম, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, শিরিন সুলতানা, ঢাকা মহানর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু, উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ‘আজকের সমাবেশ প্রমাণ করেছে- বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের নয়নের মণি, গণতন্ত্রের মাতা, বারবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আজকে বক্তব্যের কোনো অবকাশ নেই। আজকের এই সমাবেশ প্রমাণ করেছে এই সরকার কী ভয়ংকরভাবে আমাদের অধিকারগুলো কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের একটা সমাবেশের জায়গা পর্যন্ত দেওয়া হয় না। সমস্ত জায়গা ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। আমাদের সামনে একটাই পথ- আন্দোলন, আন্দোলন এবং আন্দোলন। আন্দোলনকে আরও তীব্র করতে হবে, আরও বেগবান করতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, দলের ভাই-বোনদের বলতে চাই, হঠকারিতা করবেন না। অতীতে হঠকারিতার জন্য আমাদেরকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে আমাদের দেশনেত্রীকে মুক্ত করব এবং দেশের বাইরে পাঠাব।’

‘আমি অন্যন্যা সকল রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন এক সঙ্গে দেশনেত্রীকে মুক্ত করে গণতন্ত্রকে মুক্ত করি এবং আগামী দিনে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করি’- বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের একটাই কথা- আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। তিনি মুক্তি পেলে আমরা তার চিকিৎসা করাতে পারব। এই চিকিৎসায় সরকারের বাঁধা অনৈতিক, এই চিকিৎসায় বাধা সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ, এই চিকিৎসায় বাঁধা বেগম খালেদা জিয়াকে তীলে তীলে মারার একটা চক্রান্ত। এই চক্রান্ত রোখার জন্য আমরা ধারাবাহিক আন্দোলন করব।’

তিনি বলেন, ‘আইনের যারা ব্যাখ্যা দেয়, তারা বে-আইনিভাবে ক্ষমতায় আছে। বাংলাদেশে সংবিধান মতে এই সরকারের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই।’

‘খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার কোনো সুযোগ নাই’- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের জবাবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব, আপনারও ক্ষমতায় থাকার কোনো সুযোগ নাই। কারণ, আপনারা বেআইনিভাবে ক্ষমতায় আছেন। আপনারা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেন নি। আপনারা নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছেন, গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করেছেন। তাই আপনাদের মুখে আইনি ব্যাখ্যা বেমানান। তাই আমরা বলব, ন্যায় পথে চলেন, আইনের পথে চলেন। বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন, আপনাদের কোনো হিংসা-বিদ্বেষ খালেদা জিয়ার প্রতি নেই।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘ডাক্তাররা বলছেন- এখানে তার (খালেদা জিয়া) চিকিৎসা সম্ভব না। আইনজীবীরা বলছেন- চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে আইনের কোনো বাধা নেই। কিন্তু আইনমন্ত্রী বলছেন, ‘‘পারা যায় না। বিএনপি অসন্তুষ্ট হলেও কিছু করার নেই।’

আইনমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘যিনি চাকরির মায়া বেশি করেন, তার কাছে আইনের কোনো গুরুত্ব নেই। তার চোখের সামনে দিয়ে ফাঁসির আসামি মুক্তি পেয়ে যায়, আজীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামিরা মুক্ত হয়ে যায়, তখন উনার আইনের কোনো প্রবলেম হয় না। প্রবলেম হয় বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠাতে।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া কেবল আমাদের নেত্রী নন, তিনি আমাদের মা। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ তাকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করে। কাজেই তার জন্য যে কোনো দায়িত্ব নিতে আমরা রাজি আছি। মনে রাখবেন আমাদের সেই ক্ষমতা আছে। একটা চিকন সুতা যে কেউ ছিঁড়ে ফেলতে পারে। কিন্তু যখন হাজার সুতা একত্র হয়, তখন দড়ি হয়ে যায়, দড়ি ছেঁড়া যায় না। বরং দড়ি দিয়ে অন্যকে বাধা যায়। আমাদেরকেও ছিঁড়তে পারবেন না। আমরা এর আগে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছি, একদলীয় স্বৈরাচার নিপাত করেছি, গণতন্ত্র কায়েম করেছি, ১/১১ সরকারকে বাধ্য করেছি জরুরি অবস্থা বাতিল করতে। কাজেই আমরাই পারব দেশে আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে, আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।’

সকাল ১০ টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ৯টার মধ্যে প্রেসক্লাবের সামনে কয়েক হাজার নেতাকর্মী জড়ো হন। সকাল ১০ টার মধ্যে দলের শীর্ষ নেতারাও হাজির হন সমাবেশস্থলে। সকাল সাড়ে ১০ টা নাগাদ সমাবেশ স্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। লিখিত অনুমতি না থাকায় দ্রুত সমাবেশ শেষ করে বিএনপি।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে সম্ভব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেস ক্লাব এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীরাও কাজ করেছে।

গুরুতর অসুস্থ বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর এবছর এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত টানা ৫৪ দিন হাসপাতালে ছিলেন তিনি। খালেদা জিয়া বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।

দুর্নীতির মামলায় দণ্ড নিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান। দেশে করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছর ২৫ মার্চ ‘মানবিক বিবেচনায়’ তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয় সরকার। তখন থেকে তিনি গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজা’য় রয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে বেশ কয়েকবার আবেদন করেছে তার পরিবার। কিন্তু সরকার সেই আবেদন আমলে নেয়নি। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য হলো- সাময়িক মুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাকে দেশে রেখেই চিকিৎসা দিতে হবে। বিদেশে যেতে হলে কারাগারে ফিরে আবেদন করতে হবে।

সারাবাংলা/এজেড/একে





Source link